আমরা তক্তা, তখত নই

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
মঞ্চে উঠতে ব্যাকুল সর্বস্তরের হেভিওয়েট ভ্রাতা ও ভগিনীগণ
শুভেচ্ছা জানবেন, হে ক্ষমতার ও খ্যাতির বরপুত্র ও বরকন্যাগণ। আপনাদের চরণের ধূলি পেয়ে আমি ধন্য হয়েছিলাম। কিন্তু সেই ধূলির পেছনে যে এত দীর্ঘ লাইনের ‘কিলোগ্রাম’ লুকিয়ে ছিল, তা আমার প্লাইউড ও বাঁশের শরীরে সহ্য হয়নি।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের দোহাজারীতে আপনারা ত্রাণ দিতে এসেছিলেন। বন্যায় মানুষ ভাসছে। অথচ আপনারা ভাসতে চাইলেন আমার কাঠের পাটাতনে। এটিই কি আপনাদের ‘উদারতা’? ট্র্যাজেডি হলো, বন্যার্তদের উপহার দেওয়ার আগেই আপনারা আমাকে ভেঙে একাকার করে দিলেন। আমি ভেঙে পড়েছি। আপনাদের মন্ত্রী মহোদয়, মেয়র মহোদয় অল্পের জন্য বেঁচে গেছেন। তবে আপনাদের ‘মঞ্চপ্রীতির’ জোয়ার সামলাতে না পেরে আমার কোমরটি মড়মড় করে ভেঙে গেল।
আপনারা বলেন, আপনারা নাকি সবসময় শোষিত ও দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান। কিন্তু দর্শনের ফ্যালাসিটা এখানেই— পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবার একসঙ্গে আমার মাথার ওপর চড়ার দরকারটা কী? পাশে দাঁড়ানো আর ওপরে চড়া— এ দুটির ব্যাকরণ কি এক?
মঞ্চে থাকা মানেই লাইমলাইটে থাকা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে নিজের মুখখানি একটু গলিয়ে দিতে না পারলে যেন জীবনই বৃথা
শুধু কি চন্দনাইশ? ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওবায়দুল কাদের সাহেবের বক্তব্যের সময় আপনাদের এই অতি-উৎসাহী চাপে মঞ্চটি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল। ২০১৮ সালেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কিংবা মাদারীপুরে একই দৃশ্য দেখা গেছে। আপনারা তো ইতিহাস ভালোবাসেন, তাই ইতিহাসকে বারবার ভেঙেচুরে আমাদের পিঠের ওপর ফিরিয়ে আনেন। আপনাদের কাছে মঞ্চে থাকা মানেই লাইমলাইটে থাকা। ক্যামেরার ফ্ল্যাশে নিজের মুখখানি একটু গলিয়ে দিতে না পারলে যেন জীবনই বৃথা।
এই রোগের সংক্রমণ এখন কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। আজকাল দেশের যেকোনো অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান বা সাংস্কৃতিক মঞ্চেও আপনাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, যিনি পুরস্কার পেলেন আর যিনি বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদের খুঁজে পেতে দূরবীক্ষণ যন্ত্র লাগে! পুরস্কারদাতার পেছনে দাঁড়িয়ে যারা বত্রিশটি দাঁত বের করে পোজ দেন, তাদের ভিড়ে আসল গুণী মানুষটিই হারিয়ে যান। মঞ্চ যেন তখন একটা চলন্ত লোকাল বাস!
নেতাকর্মী ও সেলিব্রেটি ভাইবোনেরা, দয়া করে আমার এই ভাঙা পিঠের আকুতি শুনুন। ক্ষমতার লোভ, পদোন্নতির আশা আর নেতার নজরে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে একটু মাটিতে নামিয়ে রাখুন। একটু মনে রাখবেন— আমি কাঠ ও বাঁশ দিয়ে তৈরি। ওহে মহিমান্বিত আরোহীগণ, আমরা কিন্তু তক্তা, তখত নই!
ইতি
ভারবাহী একটি হালকা মঞ্চ




