সম্পাদকীয়
ধুলায় ধূসর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ— আমাদের চারপাশের ব্যস্ত ফুটপাতগুলোর দিকে তাকিয়ে এই বহু পুরনো প্রবাদটি স্মরণ করলে ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হতে হয়। যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা রঙিন পাঠ্যবই, পিঠে থাকার কথা স্কুলের ব্যাগ এবং মনে থাকার কথা এক আকাশ স্বপ্ন; সেই বয়সে এক বিপুলসংখ্যক শিশুর ঠিকানা আজ ধুলোবালি আর কোলাহলে ভরা ফুটপাত; তাদের হাতে চায়ের কাপ, প্লাস্টিকের বোতল কুড়ানোর বস্তা কিংবা গাড়ি পরিষ্কারের ন্যাকড়া। কনকনে শীতের রাতে পলিথিন জড়িয়ে শিশুদের ফুটপাতে ঘুমানো কিংবা প্রখর রোদে বর্জ্য কুড়ানোর দৃশ্য আমাদের নগরজীবনের এক নির্মম ও নিয়মিত বাস্তবতা। আমাদের অবহেলা আর সামাজিক উদাসীনতার এক জীবন্ত দলিল এই ফুটপাতের পথশিশু। শুক্রবারের আগামীর সময়-এ কক্সবাজারের পথশিশুদের যাপিত জীবন নিয়ে ‘ফুটপাতেই হারাচ্ছে শৈশব’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি দেশের পথশিশুদের এই নির্মম বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে পথশিশুর সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে প্রায় ৩৪ লাখ শিশু মা-বাবার যত্নের বাইরে বা নানা কারণে রাস্তায় জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এদের একটি বড় অংশই রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল ও রংপুর— বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের ফুটপাত, রেলস্টেশন, টার্মিনাল ও ওভারব্রিজে দিনাতিপাত করে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নদীভাঙন, গ্রামীণ দারিদ্র্য, পারিবারিক কলহ এবং মা-বাবার বিবাহবিচ্ছেদের মতো কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে শহরে চলে আসে। শহরের ফুটপাতই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে এই ছিন্নমূল পরিবার ও তাদের সন্তানদের একমাত্র আশ্রয়।
পুষ্টিহীনতা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে এসব পথশিশু প্রতিনিয়ত চর্মরোগ, জন্ডিস, ডায়রিয়াসহ নানা জটিল ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। শিক্ষা তাদের কাছে স্বপ্ন। পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধনের অভাবে অনেক সরকারি সেবার আওতার বাইরেও থেকে যায় এরা। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, ফুটপাতে শৈশব কাটানো এই শিশুরা সহজেই বিভিন্ন অপরাধী চক্রের খপ্পরে পড়ে। মাদক পাচার, পকেটমার, চুরি থেকে শুরু করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিশোর গ্যাংয়ের মতো মারাত্মক সামাজিক ব্যাধির অন্যতম বড় জোগানদার হয়ে ওঠে এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা, যা সামগ্রিকভাবে সমাজকেই সংকটাপন্ন করে তোলে। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও শোচনীয়, যা সভ্য সমাজের জন্য এক চরম লজ্জার বিষয়।
একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত বা মানবিক, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রের দুর্বলতম নাগরিকের জীবনযাত্রার মান দেখে। বিপুলসংখ্যক শিশুকে ফুটপাতে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কখনোই সম্ভব নয়। এই জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা।
এজন্য পথশিশুদের পুনর্বাসনে স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা ডে-কেয়ার সেন্টারের সংখ্যা বাড়াতে হবে। তাদের জন্য বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে। এ ছাড়া শিশুশ্রম বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
ফুটপাতে শৈশব হারিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ সমস্যা নয়। এটি অনেক সামাজিক মহামারীর সূচনাবিন্দু। এসব পথশিশু যদি অন্ধকারে থাকে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশও মানবিক সংকটে পড়বে। রাষ্ট্র, সমাজ ও বিত্তবানদের চেষ্টায় এই শিশুদের ফুটপাতের ধুলোবালি থেকে তুলে এনে নিরাপদ শৈশবে ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি। ফুটপাত যেন আর কোনো শিশুর খেলার মাঠ বা শয়নকক্ষ না হয়।



