সম্পাদকীয়
রেমিট্যান্সের দাস ও ‘পাপের লাশ’

সৌদি আরবের কারাগারগুলোতে প্রায় ১৬ হাজার বাংলাদেশি প্রবাসীর চরম অনিশ্চয়তা ও বিচারিক জুলুমের শিকার হওয়ার খবর প্রকাশের ঠিক আগেই আমরা জানতে পারলাম, মক্কায় বিচারিক স্বচ্ছতার তোয়াক্কা না করে দুই বাংলাদেশি— নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আখতারের শিরশ্ছেদ করার বর্বর ঘটনা। ভিয়েনা কনভেনশনের পরিষ্কার লঙ্ঘন করে বাংলাদেশ সরকারকে অন্ধকারে রেখে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর যে চিত্র সামনে এসেছে, তা এককথায় লজ্জাজনক। এ ঘটনা শুধু সৌদি আরবের একপেশে বিচারব্যবস্থার চরম নির্মমতাই উন্মোচিত করে না; বরং বিশ্বমঞ্চে নিজের দেশের নাগরিককে অসহায় শিকার বানিয়ে রাখা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত দেউলিয়াত্ব ও নাগরিক অবমূল্যায়নের নগ্ন দলিল হয়ে সামনে দাঁড়ায়।
সৌদি বিচারব্যবস্থা যে কতটা দ্বিমুখী ও বৈষম্যমূলক, তা তাদের পরিসংখ্যানই বলে দেয়। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৪ শতাংশ বিদেশি হলেও, মাদকসহ অন্যান্য অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশই দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিক! ভাষার সীমাবদ্ধতা, দোভাষীর অভাব, আইনি সহায়তার সুযোগ না দেওয়া এবং শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘কঠিন আইনের’ খড়্গ মূলত খেটে খাওয়া নিঃস্ব শ্রমিকদের ওপরই পড়ে। ভিয়েনা কনভেনশন ছুড়ে ফেলে ঢাকার সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কনস্যুলার সহায়তা ছাড়াই দুই প্রবাসীর শিরশ্ছেদ কার্যকর করা হলো, আর ঘুমন্ত বাংলাদেশ সরকার সে খবর জানল গণমাধ্যমের বদৌলতে!
সৌদি মধ্যযুগীয় নিষ্ঠুরতার চেয়েও শতগুণ বেশি লজ্জার আমাদের নিজেদের রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অবস্থান। শ্রীলঙ্কার মতো দেশ যখন ইসলাম অবমাননার অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নিজ দেশের নাগরিককে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে সৌদি সুপ্রিম কোর্ট থেকে মুক্ত করে আনে, তখন আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ নির্বিকারভাবে এই মৃত্যুদণ্ডকে ‘আমাদের জন্য বড় শিক্ষা’ বলে প্রবাসীদেরই অভিযুক্ত করেন! তার চেয়েও ভয়াবহ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের এমপি কামরুজ্জামান রতন। টিভিতে প্রকাশ্যে তিনি বিকারগ্রস্তের মতো হাঁক ছেড়েছেন— শিরশ্ছেদের শিকার প্রবাসীদের লাশ যেন ‘পাপের লাশ’ হিসেবে দেশে না আনা হয়! পরে দুঃখপ্রকাশ করলেও তার বক্তব্যে নাগরিকের প্রতি রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গির একটি ভয়াবহ নমুনা প্রকাশ পেয়েছে।
যে প্রবাসীরা প্রতি বছর রেকর্ড হাজার হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের ঝোলা রিজার্ভ তৈরি করেন, তাদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই মন্ত্রী-এমপিদের কাছে নাগরিকের মর্যাদা নয়, প্রবাসীর অস্তিত্ব শুধুই একেকটা ‘টাকার মেশিন’। প্রশ্নটি আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে যখন সৌদি আরব থেকে প্রতিদিন গড়ে সাতজন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে ফেরার প্রসঙ্গ আসে। সৌদি মালিকের শোষণ আর আইনি জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যখন লাশ হয়ে ফিরতে হয়, তখন তা তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় নিয়তি; আর অন্যায্য বিচারে শিরশ্ছেদের শিকার হলে সেই লাশ হয়ে যায় ‘পাপের লাশ’!
সৌদি আরবের বিচারিক স্বেচ্ছাচারিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের এই নির্লজ্জ নীরবতা প্রবাসীদের রক্ত দিয়ে লেখা রেমিট্যান্সের ইতিহাসকে অপমানিত করেছে। নিজেদের নাগরিকদের রক্ষায় যে রাষ্ট্র মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না, সে রাষ্ট্র সার্বভৌমত্ব ও মানবাধিকারের কথা বলার যোগ্যতা বহুকাল আগেই হারিয়েছে।



