চিকিৎসকের ওপর হামলা নয়, বিচার হোক ট্রাইব্যুনালে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চিকিৎসকের নিরাপত্তার প্রশ্নটি সামনে এলেই আমরা অনেক সময় চিকিৎসক ও রোগীকে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে ফেলি। অথচ চিকিৎসকের নিরাপত্তা এবং রোগীর অধিকার— দুটির কোনোটিই অন্যটির প্রতিপক্ষ নয়। চিকিৎসক নিরাপদ পরিবেশে কাজ করতে না পারলে রোগীও মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন না। আবার চিকিৎসকের পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রোগীর আস্থা তৈরি হবে না।
আমার মনে হয়, চিকিৎসকদের ওপর হামলা বা চিকিৎসাসেবা নিয়ে অসন্তোষের ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে সমস্যার গভীরে যাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার সম্পর্ক রয়েছে।
আমাদের স্বাস্থ্যসেবা মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সংগঠিত হয়নি। সেবাব্যবস্থা অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। অথচ মানুষের স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের ৮০-৯০ শতাংশই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পর্যায়ে মেটানো সম্ভব। কিন্তু রোগী থেকে শুরু করে চিকিৎসক— সবাই বড় হাসপাতালমুখী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সেবাকেন্দ্রগুলো কার্যকর না হওয়ায় সামান্য অসুস্থতা নিয়েও মানুষকে বিশেষায়িত হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কোনো নিম্নমানের বা কম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা নয়। ফ্যামিলি মেডিসিন কিংবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিজেই একটি বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতার ক্ষেত্র। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় এসব কাজের গুরুত্ব ও মর্যাদা যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নতুন এমবিবিএস চিকিৎসকদের অনেক সময় গ্রামাঞ্চল কিংবা শহরের বস্তি এলাকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্যবিষয়ক ওরিয়েন্টেশন, প্রশিক্ষণ ও তদারকি সবসময় থাকে না। একজন সদ্য পাস করা চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ মূলত ব্যক্তির রোগ শনাক্ত করা এবং প্রেসক্রিপশন দেওয়ার ওপর কেন্দ্রীভূত থাকে। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন বোঝা, রোগপ্রতিরোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরি এবং সীমিত সম্পদ দিয়ে সেবা পরিচালনার জন্য আলাদা প্রস্তুতি দরকার। এক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধান ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ জরুরি।
একইভাবে জেলা পর্যায়ে কিডনি, ক্যানসার, হৃদরোগসহ প্রতিটি রোগের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তোলাই সমাধান নয়; বরং জেলা পর্যায়ে বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে কার্যকর সাধারণ হাসপাতাল থাকা দরকার। যেসব জটিল রোগের জন্য উচ্চতর বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রয়োজন, সেগুলো নির্ধারিত তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে। অর্থাৎ প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চতর চিকিৎসার মধ্যে কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে, রোগীও প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা পাবেন।
চিকিৎসকদের নিরাপত্তার প্রশ্নে হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের সব জায়গায় সবার অবাধ প্রবেশাধিকার থাকা উচিত নয়। আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, প্রসূতিকক্ষের মতো সংবেদনশীল চিকিৎসা এলাকায় নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থা থাকতে হবে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যেন নির্বিঘ্নে দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করা দায়িত্ব।
অনেক ক্ষেত্রে নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংকটের কারণে রোগীর স্বজনদেরই বিভিন্ন কাজ করতে হয়। স্যালাইন শেষ হলে নার্সকে জানানো, বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনা কিংবা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র জোগাড় করার দায়িত্ব স্বজনদের ওপর পড়ে। অর্থাৎ স্বজনদের উপস্থিতির পেছনে হাসপাতালের জনবল ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও কাজ করে। শুধু নিরাপত্তারব্যবস্থা করলেই হবে না, এসব ঘাটতিও পূরণ করতে হবে।
চিকিৎসককে নিরাপদ রাখা আর রোগীর অধিকার নিশ্চিত করা— এ দুটি আলাদা কর্মসূচি নয়। একটি ছাড়া অন্যটি পূর্ণতা পায় না। পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে চিকিৎসক-রোগীর বিরোধ চলতেই থাকবে; আর তার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে
চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে আস্থা তৈরির জন্য যোগাযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসককে রোগী ও তার স্বজনদের সহজ ভাষায় জানাতে হবে— কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, কেন দেওয়া হচ্ছে, কী ঝুঁকি থাকতে পারে এবং কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। অনেক চিকিৎসক হয়তো আশঙ্কা করেন, ঝুঁকির কথা জানালে রোগী চিকিৎসা নিতে চাইবেন না বা অন্য হাসপাতালে চলে যাবেন। কিন্তু এ আশঙ্কা থেকে তথ্য গোপন করা ঠিক নয়। সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর নেওয়াই রোগীকে যথাযথভাবে অবহিত করার বিকল্প হতে পারে না।
চিকিৎসায় অবহেলা বা ভুলের অভিযোগ উঠলে রোগীর প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। প্রচলিত আইনি ব্যবস্থায় যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ অনেক সময় জানেন না কোথায় অভিযোগ করবেন, কীভাবে করবেন। আবার বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থারও ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তার ফলাফল জানানো— প্রতিটি ধাপ স্বচ্ছ হতে হবে। হাসপাতালগুলোতে অভিযোগ জানানোর ফোন নাম্বার, ইমেইল ও ঠিকানা দৃশ্যমান স্থানে প্রকাশ করা উচিত।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, চিকিৎসকের পেশাগত অবহেলা বা অসদাচরণ এবং চিকিৎসকের ওপর হামলা, এক বিষয় নয়। হাসপাতাল ভাঙচুর কিংবা শারীরিক হামলা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ। এসবের বিচার প্রচলিত আইনেই হওয়া উচিত। অন্যদিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ যাচাই করতে হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত বাস্তবতা বোঝেন— এমন ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন।
এজন্য বিশেষায়িত স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল বা আদালতের কথা ভাবা যেতে পারে, যেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষজ্ঞ থাকবেন। চিকিৎসায় ভুলের ধরন, পরিস্থিতি ও দায় নির্ধারণ করতে হবে যথাযথ পর্যালোচনার মাধ্যমে। সব ভুল ইচ্ছাকৃত অবহেলা নয়। কোথাও অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি থাকে, কোথাও প্রশিক্ষণের ঘাটতি, আবার কোথাও গুরুতর পেশাগত অবহেলা থাকতে পারে। এসবের প্রতিকারও একরকম হতে পারে না।
ধরা যাক, খতনা বা ছোট কোনো অস্ত্রোপচারের পর কোনো শিশুর মৃত্যু হলো। তখন দেখতে হবে, অস্ত্রোপচারের আগে শিশুর শারীরিক অবস্থা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, অ্যানেসথেশিয়া দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় মূল্যায়ন করা হয়েছিল কি না, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের কোনো সমস্যা শনাক্ত করার সুযোগ ছিল কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর না খুঁজে শুধু চিকিৎসককে জনসমক্ষে অপমান বা শাস্তির মুখে ঠেলে দিলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে না; বরং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর সুযোগ নষ্ট হবে।
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক। একই সঙ্গে চিকিৎসকদেরও পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার জায়গায় কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না। অভিযোগ তদন্তের নামে চিকিৎসকদের ঢালাওভাবে অপমান করা; কিংবা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করাও সমাধান নয়। এতে চিকিৎসকদের মধ্যে জটিল রোগীর চিকিৎসা করার ঝুঁকি এড়িয়ে চলার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে।
তরুণ চিকিৎসকরা সাধারণত রোগীর সবচেয়ে কাছাকাছি থেকে কাজ করেন। হাসপাতালের সামনের সারিতে তারাই থাকেন, আবার অসন্তোষ বা হামলার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও তাদের বেশি। তাদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মাধ্যমে সাময়িক দাবি আদায় হতে পারে; কিন্তু তাতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না। নিরাপত্তা, জনবল, চিকিৎসার পরিবেশ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং পেশাগত জবাবদিহি— সব বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক জায়গায় চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সেবা শক্তিশালী করতে হবে, জনবল বাড়াতে হবে, প্রয়োজনে বহির্বিভাগের সেবার সময় ও পালা বাড়াতে হবে। মানুষকেও জানতে হবে কোন সমস্যায় কোথায় যেতে হবে।
চিকিৎসককে নিরাপদ রাখা আর রোগীর অধিকার নিশ্চিত করা— এ দুটি আলাদা কর্মসূচি নয়। একটি ছাড়া অন্যটি পূর্ণতা পায় না। পারস্পরিক আস্থা ও জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে চিকিৎসক-রোগীর বিরোধ চলতেই থাকবে; আর তার মূল্য দিতে হবে পুরো সমাজকে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ




