মাদক প্রশ্নে উল্টো রথে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক প্রবেশ করেছে বহু আগে। প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে মাদকের কেনাবেচা, বিপণন এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কারবারিরা নতুন নতুন ক্রেতা খুঁজে নিচ্ছে। একসময় যেসব মাদক নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। বিশেষ করে সিনথেটিক মাদক, ইয়াবা, আইস, ফেন্টানিল ও অন্যান্য রাসায়নিক মাদক এখন উদ্বেগের কারণ। ফলে মাদকের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের বিষয়টি অধরাই থেকে যাচ্ছে। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে হাঁকডাকে মোটেই কমতি নেই। সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬-এর মাধ্যমে সাইবার মাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, সরবরাহ বা বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বেফজুল গলদঘর্ম হওয়ার ধারায় সর্বশেষ সংযোজন, অনলাইনে মাদক কেনাবেচার দায়ে এই মৃত্যুদণ্ডের বিধান। দেখে মনে হতে পারে, বিরাট কোনো কাজ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি, বরং উন্মোচিত হয়েছে এক রকমের অরাজকতার দ্বার। অথচ সরকারের তরফ থেকে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, নতুন ধারা সংযোজিত হওয়ার ফলে মাদকের আগ্রাসন নিয়ন্ত্রিত হবে। এ ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের ফলে অ্যাসিড নিক্ষেপের বিষয়টি থমকে যাওয়ার উদাহরণ হয়তো মাথায় রেখেছেন বখেদমতে হুজুরে আলারা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মূল বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয় না। তা হচ্ছে, শুধু মৃত্যুদণ্ডের বিধানের ফলেই অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা থামেনি। এর মূল বিষয় হচ্ছে কঠিনভাবে অ্যাসিডের জোগান নিয়ন্ত্রণ করা। অ্যাসিডের সহজলভ্যতার রাশ টেনে ধরা গেছে বলেই আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংযোজনে আশাতীত ফল পাওয়া গেছে। কিন্তু মাদকের সহজলভ্যতা কি রোধ করা গেছে? যায়নি। তা হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধানে কী ফলোদয় হবে? এর অর্থ এটিও নয় যে কিছুই হবে না। আর যা হবে তাও মোটেই সুখকর হওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিরাজমান বাস্তবতায় অনলাইনে মাদক কেনাবেচায় মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। ফৌজদারি আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো, শাস্তি অপরাধের গুরুত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে মৃত্যুদণ্ড সংরক্ষিত থাকে ইচ্ছাকৃত প্রাণহানির মতো সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের জন্য। অথচ একটি অহিংস ও লেনদেনভিত্তিক অপরাধের ক্ষেত্রে একই শাস্তি প্রয়োগ করলে হত্যাকাণ্ড এবং অহিংস অপরাধের মধ্যকার মৌলিক পার্থক্য কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংঘটিত মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করতে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। যেটি মূল আইনে রয়েছে।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়াও অপরিহার্য নয়। বস্তুগত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হবে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ওপর। এটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার বা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে
সংশোধিত আইনটির উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ দমন এবং সমাজকে এর ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব ও গবেষণার আলোকে দেখলে উল্লিখিত আইনে প্রত্যাশিত ফলোদয়ের সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। কেননা শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না; এই ধারণা যেমন ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তেমনি অপরাধ প্রতিরোধেও কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও মাদক পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়। তখন বলা হয়েছিল, কঠোর শাস্তির ভয় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে আনবে। কিন্তু গত সাত বছরের বাস্তবতা এমনটা বলে না। বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা দেয়, মাদক কারবার ও পাচারের বিস্তার কমার পরিবর্তে বেড়েছে। এরপরও আইনের নতুন সংশোধনীতে সেই একই নীতির বৃত্তেই রয়ে গেছেন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা। ফৌজদারি আইনকে কয়েকটি মৌলিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হয়, যেমন— সামঞ্জস্যপূর্ণতা, প্রতিরোধমূলক কার্যকারিতা, নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ন্যায়সংগত বিচারপ্রক্রিয়া। অনলাইন মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধানের ক্ষেত্রে এই মানদণ্ডগুলোর প্রায় প্রতিটিই প্রশ্নবিদ্ধ। এদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি স্পষ্টভাবে বলেছে, মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ ‘সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ’-এর অন্তর্ভুক্ত নয়। বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক চুক্তির একটি পক্ষ। এ ছাড়া এই আইন অপরাধীদের মধ্যে প্রয়োজনীয় স্পষ্ট সীমারেখা টানে না। আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের গডফাদার এবং আসক্তির কারণে বেচাকেনায় জড়িয়ে পড়া একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় কখনোই এক হতে পারে না। এ বাস্তবতায় ইঁদুরকে হায়েনার সমতুল্য বিবেচনা করার বায়না ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এদিকে অপরাধবিজ্ঞানে সর্বসম্মত স্বীকৃত একটা বিষয় হচ্ছে, অপরাধ প্রতিরোধে শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ধরা পড়ার নিশ্চয়তা অনেক বেশি কার্যকর। সম্ভাব্য অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ডের ভয় নয়, বরং অপরাধ করলে নিশ্চিতভাবেই ধরা পড়তে হবে— এই মেসেজ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনলাইন মাদক কারবারে ঠিক এই নিশ্চয়তার বিষয়টি সবচেয়ে দুর্বল। এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও পরিচয় গোপনকারী প্রযুক্তি তদন্তকে জটিল করে তোলে। যে ব্যক্তি ধরে নেয় যে সে ধরা পড়বে না, তার কাছে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো খুব কমই প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিপুলসংখ্যক মামলার তুলনায় দণ্ডাদেশের হার, বিশেষ করে সাইবার অপরাধের সাজার হার অত্যন্ত নগণ্য। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক অপরাধে মৃত্যুদণ্ড এবং মাদক পাচার হ্রাসের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। ২০১৮ সালের পর বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও দেখায় যে প্রকৃত রাঘববোয়াল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন; শুধু চুনোপুঁটি বা নিম্নস্তরের কর্মীরাই গ্রেপ্তার হয়েছেন, যাদের শূন্যস্থান দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনলাইন মাদক-সংক্রান্ত অপরাধ প্রমাণের ধরন বাস্তব জগতের প্রচলিত মাদক উদ্ধারের মামলার তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। একটি আইপি ঠিকানা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নয়, বরং একটি ইন্টারনেট সংযোগ বা রাউটারকে শনাক্ত করে। ডিভাইস ম্যালওয়্যারে আক্রান্ত হতে পারে, ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট বা ডার্ক ওয়েব অ্যাকাউন্ট চুরি হতে পারে।
আইনে নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, মাদক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে মাদক উদ্ধার হওয়াও অপরিহার্য নয়। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বস্তুগত সাক্ষ্য-প্রমাণের পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করতে হবে ডিজিটাল তথ্য-উপাত্তের ওপর। এটি ভুলভাবে ব্যাখ্যা হওয়ার বা বিকৃত হওয়ার বা অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে মিথ্যা মামলা ও নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার আশঙ্কা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। শাস্তি যত কঠোর হয়, বিচারিক ভুল হলে তার পরিণতিও ভয়াবহ হয়। এ কারণেই মৃত্যুদণ্ডকে অন্য সব শাস্তি থেকে আলাদা করে দেখা হয়। মৃত্যুদণ্ড একবার কার্যকর হলে তা আর সংশোধনের সুযোগ থাকে না। এদিকে, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত বিচারব্যবস্থায়ও ভুল রায়, ভুল শনাক্তকরণ এবং ত্রুটিপূর্ণ ফরেনসিক বিশ্লেষণের অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। এদিকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ডিজিটাল ফরেনসিক, সাইবার তদন্ত ও ইলেকট্রনিক সাক্ষ্য মূল্যায়নের ক্ষেত্র এখনো বিকাশমান। এ বাস্তবতায় মৃত্যুদণ্ডের মতো অপরিবর্তনীয় শাস্তির পরিধি বাড়ানো বিচারিক ঝুঁকিও তৈরি করে। ২০০২ সালের অ্যাসিড অপরাধ দমন আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হলেও অ্যাসিড-সহিংসতা কমে আসার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছে একই বছরের ‘অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন’। এর মাধ্যমে আসলে অ্যাসিডের উৎপাদন, পরিবহন, বিক্রি ও বিপণনের ওপর কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। মাদকের ক্ষেত্রেও অপরাধ সংঘটনের পর সর্বোচ্চ শাস্তি আরোপের চেয়ে অপরাধের সুযোগ সংকুচিত করা বেশি জরুরি। এ জন্য প্রয়োজন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা, অবৈধ আর্থিক লেনদেন শনাক্ত করা, সাইবার গোয়েন্দা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ফরেনসিক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অপরাধীদের নিশ্চিতভাবে বিচারের আওতায় আনা। অপরাধের প্রকৃত কারণ, কাঠামো এবং অপরাধবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত নীতি উপেক্ষা করে শুধু শাস্তির মাত্রা বৃদ্ধি জনমনে বুদবুদসম সন্তুষ্টি আনলেও মাদকের আগ্রাসন দমনে স্থায়ী সাফল্য আনবে বলে মনে হয় না; বরং সরকারের উদ্যোগকে উল্টো রথে চলার মতো বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক





