ডানপন্থার নতুন অবকাঠামো

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এক গবেষণা প্রতিবেদনে একটি তথ্য তেমন গুরুত্ব পায়নি। ইতালি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও হাঙ্গেরিতে ডানপন্থী পপুলিস্ট দলগুলোর ফেসবুক এনগেজমেন্ট মূল ধারার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় গড়ে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি; যদিও বাজেট ও প্রচারণার সময়কাল সমান। কেন? উত্তরটা কাঠামোগত। সেই কাঠামো বুঝতে ফিরে যেতে হয় ষাটের দশকে, যখন মার্শাল ম্যাকলুহান প্রশ্ন তুলেছিলেন— মাধ্যম কি শুধু বার্তা বহন করে, নাকি মাধ্যমই বার্তা?
ম্যাকলুহানের প্রশ্নকে একবিংশ শতাব্দীর প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদের লেন্সে দেখলে যা দেখা যায়, সেটা আর মিডিয়া তত্ত্বের বিষয় থাকে না। ট্রাম্প থেকে মোদি, অরবান থেকে মিলেই, বলসোনারো থেকে ডা. শফিকুর রহমান বা সাদিক কায়েম— একটা প্যাটার্ন আছে, যা শুধু আদর্শগত নয়, যোগাযোগতাত্ত্বিক। একই ধরনের ভাষা, একই আবেগ, একই বানানো ‘শত্রু’। এই মিল আকস্মিক নয়।
ওয়াল্টার ওং তার ১৯৮২ সালের ‘ওরালিটি অ্যান্ড লিটারেসি’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, লেখ্য ভাষার আবির্ভাবের আগে মানুষের চিন্তার কাঠামো ছিল আলাদা। মৌখিক সংস্কৃতিতে জ্ঞান ধরে রাখার একমাত্র উপায় ছিল স্মৃতি, আর স্মৃতির জন্য দরকার ছন্দ, পুনরাবৃত্তি, অতিরঞ্জন। ওং এই বৈশিষ্ট্যকে বলেছিলেন ‘অ্যাগোনিস্টিক’— যার মানে দাঁড়ায় প্রতিযোগিতামূলক, সংঘাতপ্রবণ, গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। আজ টিকটক বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ফেসবুক পেজ স্ক্রল করলে ওংয়ের এই বর্ণনা চেনা লাগে। আমরা ফিরে যাচ্ছি মৌখিকতার দিকে, তবে এবারেরটা অ্যালগরিদম-নিয়ন্ত্রিত, পুঁজিচালিত। আন্দ্রে মিরের ভাষায়, এই ‘ডিজিটাল ওরালিটি’ বা ‘ডিজিটাল মৌখিকতা’ কি বিশ্ব জুড়ে ডানপন্থার উত্থানের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে না?
অক্ষরের আবিষ্কার মানুষকে দিয়েছিল একাকিত্বে যুক্তি পরখ করার ক্ষমতা। যশোয়া মেয়োরিটজ তার ‘নো সেন্স অব প্লেস’ (১৯৮৫)-এ দেখিয়েছেন, লিখিত ভাষা মানুষকে দিয়েছে অন্তর্দৃষ্টি— রৈখিক চিন্তা ও কার্যকারণ বিশ্লেষণের ভিত্তি, যার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মুক্ত সংবাদমাধ্যম, বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরগতির, প্রমাণনির্ভর, বহুবচন-সহিষ্ণু।
আর ঠিক সেখানেই সমস্যা। হার্বার্ট সাইমনের ‘অ্যাটেনশন ইকোনমি’ বা ‘মনোযোগ অর্থনীতি’ সাক্ষরতার এই ধীরতাকে পণ্য হিসেবে বিক্রয় অযোগ্য করে দিয়েছে। কারণ, একটি সুনির্মিত যুক্তির চেয়ে একটি ক্রোধোদ্দীপক ছয় সেকেন্ডের ক্লিপ বেশি এনগেজমেন্ট আনে। ফ্রান্সেস হাউগেনের ফাঁস করা ফেসবুকের অভ্যন্তরীণ নথি (২০২১) দেখিয়েছিল, এনগেজমেন্ট অ্যালগরিদম কীভাবে ক্রোধ ও বিভাজনকে অগ্রাধিকার দেয়।
হোসে ভ্যান ডাইক, টমাস পোয়েল ও মার্টিন ডে ওয়াল তাদের ‘দ্য প্ল্যাটফর্ম সোসাইটি’ (২০১৮) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিছক যোগাযোগমাধ্যম নয়— সমাজের নতুন অবকাঠামো, যা চারটি নীতিতে সমাজ পুনর্গঠন করে: ডেটাফিকেশন (মানব আচরণকে তথ্যে রূপান্তর), কমোডিফিকেশন (সেই তথ্য বিক্রয়যোগ্য পণ্যে পরিণত করা), সিলেকশন (অ্যালগরিদমিক বাছাই) এবং ম্যাস কাস্টমাইজেশন (ব্যক্তিকেন্দ্রিক বাস্তবতা তৈরি)। এই চার প্রক্রিয়া মিলে তৈরি করে এমন একটি তথ্য পরিবেশ, যেখানে চরমপন্থী ও সরলীকৃত বিষয়বস্তু পদ্ধতিগতভাবে ওপরে ওঠে— সামাজিক মূল্যবোধকে বশ্যতা স্বীকার করতে হয় প্ল্যাটফর্মের মূল্যবোধের কাছে, অর্থাৎ এনগেজমেন্ট ও মুনাফার কাছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যার আগে ফেসবুকে বিদ্বেষমূলক কনটেন্টের বিস্তার, ব্রাজিলে বলসোনারোর হোয়াটসঅ্যাপকেন্দ্রিক প্রচারণা, ভারতে সিএএ-বিরোধী আন্দোলনকালে হিন্দুত্ববাদী কনটেন্টের অ্যালগরিদমিক বিস্তার— প্রতিটি ক্ষেত্রে একই কাঠামো কাজ করেছে।
ওংয়ের আরেকটি তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ‘হেভি ক্যারেক্টার’ বা ‘ভারী চরিত্র’। কথ্য মহাকাব্যে জিউস বা অ্যাকিলিসের মতো অতিরঞ্জিত চরিত্র আসলে তথ্য সংরক্ষণের কৌশল। চারিত্রিক অতিরঞ্জন এদেরকে স্মৃতিতে অম্লান করে রাখে। এই কাঠামোতে বর্তমান ডানপন্থী নেতাদের রাখলে দেখা যায়, ট্রাম্পের মঞ্চভঙ্গি বা মোদির ‘৫৬ ইঞ্চি বক্ষ’-এর আখ্যান রাজনৈতিক অদক্ষতা নয়— এটা মৌখিক সংস্কৃতির ‘ভারী চরিত্র’ হওয়ার শর্ত পূরণ। মেয়োরিটজ দেখিয়েছেন, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে মানুষ এমন নেতার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যিনি সব পরিবেশে অভিন্ন— রঙ্গমঞ্চ আর নেপথ্যের ভেদ রাখেন না। স্বাক্ষর রাজনীতিবিদের কোড-সুইচিং (সামাজিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী যোগাযোগের ভাষা ও ভঙ্গির পরিবর্তন) আজ ডিজিটাল যুগে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে পড়া হয়; ট্রাম্প সবখানে ট্রাম্প— এটাই তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্পদ, নীতি নয়।
কিন্তু সবাই সমানভাবে এই ফাঁদে পড়ছে না, এখানেই শ্রেণির প্রশ্ন এড়ানো যায় না। পিয়ের বোর্দুর ‘সাংস্কৃতিক পুঁজি’র ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক: উচ্চশিক্ষিত, অর্থনৈতিকভাবে নিরাপদ মানুষের কাছে সাক্ষরতার সঙ্গে সংযোগের সুযোগ ও অভ্যাস বেশি; কিন্তু যিনি দিনে ১২ ঘণ্টা শ্রম দেন, যার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তার কাছে একটি ছয় মিনিটের ‘আসল সত্য’ বলা ভিডিওই বাস্তবতার মানচিত্র হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মৌখিকতার শিকড় ডিজিটাল যুগের আমদানি নয়— জনসভা, মাইকিং, স্লোগান, ওয়াজ, ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য বহু পুরনো। কিন্তু স্মার্টফোনবিপ্লব এতে নতুন গতি যোগ করেছে। এই পরিবেশেই ২০২৪-এর জুলাই আন্দোলন ছড়িয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে একই মাধ্যমে সক্রিয় হয়েছে ভিন্ন রাজনৈতিক ভাষ্য, যা বহন করছে সেই পুরনো হেভি ক্যারেক্টার— বাইনারি শত্রু-বন্ধু বিভাজন, ধর্মীয় পরিচয়নির্ভর সরলীকরণ। ফেসবুকের অ্যালগরিদম একে অগ্রাধিকার দেয় দীর্ঘ ওয়াচ টাইমের কারণে, আর ধর্মীয় কনটেন্টে মডারেশনের দুর্বলতা একে আরও সহজ করে। মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, গার্মেন্টস শ্রমিক, প্রথম প্রজন্মের স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর কাছে এই কনটেন্ট শুধু বিনোদন নয়— একটি সম্পূর্ণ বিশ্বদর্শন, যা বলে: সমস্যা কাঠামোগত নয়, শত্রু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষ।
মেয়োরিটজ ১৯৮৫ সালে যা বলেছিলেন, তা আজ অস্বস্তিকরভাবে সত্য: ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষজ্ঞদের ভুলপ্রবণ মানুষ হিসেবে দেখাবে, বিশ্বাস কমাবে, তবু মানুষ তাদেরই ওপর নির্ভরশীল থাকবে, যাদের বিশ্বাস করে না— ক্ষমতার প্রতি অবিশ্বাস ও নির্ভরতার এক অদ্ভুত সহাবস্থান। আজকের টিকাবিরোধী আন্দোলন বা জলবায়ু অস্বীকারবাদের সঙ্গে এই বর্ণনা মিলে যায়। ডানপন্থী রাজনীতি এই অবিশ্বাসকে সবচেয়ে পদ্ধতিগতভাবে ব্যবহার করে— ‘এলিট’, ‘ডিপ স্টেট’, ‘সেকু্যলার বুদ্ধিজীবী’র শত্রুতালিকা আসলে স্বাক্ষর প্রতিষ্ঠানগুলোরই তালিকা।
যোগাযোগের মাধ্যম বদলালে চিন্তার কাঠামো বদলায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এমন এক মৌখিক পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে সংঘাতপ্রবণ, ভারী চরিত্রকেন্দ্রিক বিষয়বস্তু পদ্ধতিগতভাবে ওপরে ওঠে, গণতান্ত্রিক বিচার-বিশ্লেষণের স্বাক্ষর ভিত্তি ক্ষয় করে, আর এই ক্ষয়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ডানপন্থী পপুলিস্ট শক্তি। তবে এই বিশ্লেষণ নিয়তিবাদী নয়। ওং নিজেই বলেছিলেন, ‘সেকেন্ডারি ওরালিটি’ বা ‘মাধ্যমিক মৌখিকতা’ প্রাথমিক মৌখিকতার হুবহু পুনরাবৃত্তি নয়, কারণ তা সাক্ষরতার সঙ্গে সহাবস্থান করে। বই এখনো লেখা হচ্ছে, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা টিকে আছে।
ম্যাকলুহান বলেছিলেন, মানুষ ঘুমিয়ে থাকলেও তার কান সবসময় খোলা থাকে। বিবর্তন টিকে থাকার জন্য মানুষকে সতর্কতার এই সুযোগ করে দিয়েছে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মগুলো বিবর্তনের সেই সুযোগকে দুর্বলতায় পরিণত করেছে— প্রতিটি নোটিফিকেশন এক কাল্পনিক বিপৎসংকেত, মানুষ সচকিত সর্বক্ষণ। চিন্তার জন্য নীরবতা দরকার। আজ সেই নীরবতাই একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
লেখক: শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস




