বিশেষ লেখা
প্রবীণ উৎসব

প্রতীকী ছবি
সকালের হেমন্তের রোদ। রোদে পিঠ দিয়ে বসে আছেন নেয়ামত আলী। বয়স তিয়াত্তর।
খোলা বারান্দার দিকে তাকিয়ে তিনি দেখলেন, টবের ফুলগাছে হেমন্তের শিশির জমেছে।
ছোটদের মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে স্ত্রীকে ডাকলেন, ‘এই শোনো, দেখে যাও। ফুলের গাছে শিশির পড়েছে।’
ভেতরের ঘর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। দ্বিতীয়বার ডাকলেও সাড়া পেলেন না। তৃতীয়বার ডাকার পর সাড়া মিলল।
স্ত্রী বললেন, ‘শিশির দেখার কী আছে! তুমি দেখো। কোমরব্যথায় বাঁচি না।’
বারান্দায় তিনটি চড়ুই লাফিয়ে লাফিয়ে খাবার খুঁজছে। নেয়ামত আলী সেদিকে মনোযোগ দিলেন।
এমন সময় বড় ছেলের গলার আওয়াজ শোনা গেল, ‘ড্রাইভার, গাড়ি বের কর।’
তিনি ছেলেকে ডাকলেন, ‘আজাদ, আমার প্রেসক্রিপশনটা নিয়ে যা। ওষুধ ফুরিয়ে গেছে।’
ছেলের কোনো সাড়া পেলেন না তিনি। তবে ড্রাইভারের গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার শব্দ শোনা গেল।
রোদ একটু বেড়েছে। নেয়ামত আলী আবার টবের ফুলগাছের দিকে তাকালেন। শিশিরের ছোট ফোঁটাগুলো তখনো টলটল করছে।
পাঁচ বছরের নাতনি দৌড়ে ছুটে এলো তার কাছে। হাতে দিনের পত্রিকা।
‘দাদা, দাদা, তোমার পেপার।’
নাতনিকে কাছে পেয়ে দাদার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। তিনি আদর করে তাকে কোলে বসালেন। তার চারপাশ যেন আনন্দে ভরে উঠল।
ভাঁজ করা পত্রিকাটি দুহাতে মেলে ধরলেন তিনি। নিজে নিজে বিড়বিড় করলেন, ‘ব্যাপারটা এখনো কেউ পড়েনি।’
এমন সময় ঘর থেকে বউমা ডাকলেন, ‘তাসফিয়া, এদিকে এসো। নাশতা খাবে তো।’
তাসফিয়া বলল, ‘দাদু, যাই। মা ডাকছে।’
সে আবার ছুটে গেল মায়ের কাছে।
নাতনির এসে আবার চলে যাওয়াটা নেয়ামত আলী কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। তার মন ভারী হয়ে গেল।
পাঠক, ওপরের এই লেখাটুকু আমি আমার এক পরিচিত প্রবীণকে পাঠিয়েছিলাম।
তিনি আমাকে টেলিফোনে বললেন, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে লিখেছ নাকি? আমার অবস্থা তো আরও কঠিন!’
অনেক কথা বললেন আমাকে। তার কথার সারমর্ম করলে দাঁড়ায়—
১. আমি সারা জীবন অনেক মানুষের নিঃসঙ্গতা কাটিয়েছি। এখন আমি নিজেই নিঃসঙ্গ।
২. সারা জীবন বোঝা টেনেছি। এখন আমি নিজেই বোঝা।
৩. মানুষ ডাকলেই কাছে পেতাম। এখন ডাকলে কেউ আসে না।
৪. নিজের ওষুধ কিনতেও অন্যের সহযোগিতা দরকার হয়।
৫. কাঙ্ক্ষিত সম্মানটুকুও হারিয়ে যাচ্ছে।
আমি বললাম, ‘চাচা, রাখি। পরে আপনাকে আবার ফোন করব।’
তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘ও, বুঝেছি, তোমার হাতে সময় নেই। জানো, আপনজনের ব্যস্ততা দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। মনে হয়, সবাই আমাকে অবহেলা করছে।’
এমন অবহেলার শিকার নানা শ্রেণি-পেশার প্রবীণরা কেমন আছেন, সেটি আমাদের আশপাশের কিছু ঘটনার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। এক-দুই করে ঘটনার কয়েকটি ধরন তুলে ধরলে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে—
১. মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া।
২. একা ঘরে মা-বাবার মরে পড়ে থাকা।
৩. বৃদ্ধ মা-বাবার দায়িত্ব কাঁধে তুলে না নেওয়া।
৪. দায়িত্ব পালনে একাধিক সন্তানের টানাহেঁচড়া।
৫. বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধদের জবানবন্দি।
এই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আগামীর সময়ের গোল্ড ক্লাব কিছু আয়োজনের মাধ্যমে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। আয়োজন করেছে প্রবীণ উৎসবের—
বয়সকে আমরা উদযাপন করতে চাই।
পাঠক, নেয়ামত আলীর পরিবারের ছবিটা যেভাবে দেখতে চাই—
হেমন্তের সকালে নেয়ামত আলী বসেছিলেন বারান্দায়। তার স্ত্রী কোমরব্যথা নিয়ে অনেক কষ্টে হেঁটে এলেন তার দিকে।
নেয়ামত আলী বললেন, ‘আরে, কী করছ? এভাবে চলে এলে কেন? কষ্ট হচ্ছে তো তোমার।’
স্ত্রী আনোয়ারা বললেন, ‘সকালবেলা বারান্দায় তোমার পাশে না বসলে ভালো লাগে না।’
বউমা নাশতার ট্রে নিয়ে এলো। বলল, ‘বাবা, রোদে পিঠ দিয়ে নাশতা করেন, ভালো লাগবে।’
বড় ছেলে এলো, ‘বাবা, তোমার সব ওষুধ নিয়ে আসব আজ। মা, তোমার কিছু লাগবে?’
নাতনিটা তার আশপাশেই আছে। দাদুর সঙ্গে নাশতা খাচ্ছে। এক ফাঁকে সে ড্রয়িংরুম থেকে দিনের পত্রিকাটা দাদুর জন্য নিয়ে এসেছে।
চা খেতে খেতে নেয়ামত আলী ফুলের টবের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘দেখেছো, শিশির পড়ছে।’
স্ত্রী বললেন, ‘ওমা, তাই তো! কী সুন্দর! শীত এসে গেল তাহলে।’



