ঈদসংখ্যা : এক বিপন্ন ঐতিহ্যের গল্প

আগামীর সময় গ্রাফিক্স
আমার বাবা ছিলেন এদেশের একজন প্রখ্যাত কবি। মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসারে বিলাসিতার কোনো ঠাঁই ছিল না। আমরা ছয় ভাই-বোন বড় হয়েছি এক অদ্ভুত নিয়মানুবর্তিতার মধ্য দিয়ে, যেখানে নতুন জামাকাপড় পাওয়াটা ছিল অনিশ্চিত এক আনন্দ। কিন্তু একটি বিষয়ে বাবা কোনোদিন কার্পণ্য করেননি, আর তা হলো বই। দেশি-বিদেশি, দুর্লভ কিংবা অতি সাধারণ—যে বইটি পড়া জরুরি বলে তিনি মনে করতেন, সেটি সংগ্রহে বাবার কোনো আপস ছিল না। ঈদ আসার বেশ আগে থেকেই বাবার মধ্যে একধরনের বিশেষ চাঞ্চল্য লক্ষ করতাম। সেই অস্থিরতা নতুন পোশাক কিংবা কোরবানির বাজারের জন্য ছিল না, তা ছিল নিছক ঈদসংখ্যার প্রতীক্ষায়। পূজার সময় কলকাতার শারদীয় সংখ্যাগুলোর জন্যও তাঁর একই রকম তীব্র অপেক্ষা থাকত। সেই মোটা, রঙিন আর তাজা ছাপার কালির ঘ্রাণযুক্ত পত্রিকাগুলো হাতে পেলে বাবার চোখে যে প্রশান্তি দেখতাম, তা অন্য কিছুতে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। আমরা জানতাম, বাবা যখন ওই পাতাগুলোর ভেতর ডুব দেবেন, তখন বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁর সব যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
সেই পত্রিকাগুলো কেবল বাবার ব্যক্তিগত সম্পদ ছিল না, তা ছিল পুরো পরিবারের এক মিলনমেলা। মা পড়তেন রান্নার পাতা, বড় আপারা খুঁজতেন প্রিয় অভিনেত্রীর সাক্ষাৎকার, আর আমার শৈশব কাটত ছোটদের গল্পের জাদুকরীজগতে। একটিমাত্র পত্রিকা অথচ প্রতিটি সদস্যের জন্য সেখানে কিছু না কিছু বরাদ্দ থাকত। উৎসবের সামাজিক আনন্দ আর পাঠের ব্যক্তিগত আনন্দ তখন একবিন্দুতে এসে মিলত। বাংলাদেশে ঈদসংখ্যার এই ঐতিহ্যের ইতিহাস ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ক্ষুদ্র সাময়িকী হিসেবে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সত্তর ও আশির দশকে তা বিশাল এক মহীরুহে পরিণত হয়। নব্বইয়ের দশকে এসে ঈদসংখ্যা হয়ে ওঠে মধ্যবিত্তের ঈদ কেনাকাটার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তখনকার দিনে আড়াইশ-তিনশ টাকায় একটি পত্রিকা মানে ছিল সাত-আটটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস, অগণিত গল্প, কবিতা আর মননশীল প্রবন্ধের এক বিশাল ভাণ্ডার। আলাদাভাবে কিনতে গেলে যার মূল্য হতো বহুগুণ বেশি। এটি কেবল সাহিত্যের সংকলন ছিল না, ছিল এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক সেতু। মফস্বলের শিক্ষিত পরিবারগুলোতে ঈদসংখ্যা আর শারদীয় সংখ্যা যখন পাশাপাশি পড়া হতো, তখন ধর্মের কৃত্রিম বিভাজন ছাপিয়ে তা একটি সর্বজনীন উৎসবে রূপ নিত।
তবে কালের পরিক্রমায় সেই সোনালি ছবিটা আজ ম্লান হয়ে আসছে। প্রকাশকরা পাঠকের উপস্থিতির কথা বললেও বাস্তবতা হলো, ঈদসংখ্যার সেই জোয়ার এখন মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। একসময় যে পত্রিকা মফস্বলের প্রতিটি শিক্ষিত ঘরে পৌঁছে যেত, এখন তার মুদ্রণসংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অনেক ঐতিহ্যবাহী সংখ্যা নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে, আর যা টিকে আছে তার বড় অংশ চলছে কেবল জড়তা আর অভ্যাসবশত, সৃজনশীল উদ্ভাবনের অভাবে নয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাহিত্য সমালোচনার অনুপস্থিতি। আমাদের টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে বিনোদন কিংবা খেলাধুলা নিয়ে পর্যাপ্ত পরিসর থাকলেও সাহিত্যের গুরুত্ববহ বিচার-বিশ্লেষণ নিয়ে তেমন কোনো জায়গা নেই। ফলে কোনটি কালজয়ী সৃষ্টি আর কোনটি কেবল তাৎক্ষণিক বিনোদন, তা নিয়ে পাঠক প্রায়শই অন্ধকারে থাকেন। সমালোচনার এই অভাব পাঠককে একটি প্রয়োজনীয় পথনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানের নিম্নগামিতা। অনেক খ্যাতিমান লেখক একই মৌসুমে পাঁচ-ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় লিখে থাকেন। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে লেখা এই সৃষ্টিগুলোতে প্রায়শই গভীরতার অভাব থাকে। লেখার শরীরে যখন তাড়ার গন্ধ প্রকট হয়ে ওঠে, তখন সচেতন পাঠক মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। পাঠক কমলে বাজার সংকুচিত হয় এবং অবধারিতভাবে লেখকের প্রাপ্য সম্মানীও কমে যায়। এই দুষ্টচক্র ভাঙার গুরুদায়িত্ব এখন সম্পাদকদের কাঁধে। বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম আর শর্ট ভিডিওর চাকচিক্যে বেড়ে উঠছে। একে সরাসরি দোষ না দিয়ে বরং বুঝতে হবে যে তাদের চাওয়ার ভাষাটা বদলে গেছে। তারা গল্প চায়, আবেগ চায়, কিন্তু তা চায় আধুনিক মোড়কে। মোবাইল ফোনকে প্রতিপক্ষ না ভেবে একেই মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ঈদসংখ্যার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো যদি দৃষ্টিলব্ধ ডিজিটাল সংস্করণে পাওয়া যায় কিংবা কোনো উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় যদি ইউটিউবে শ্রুতিনাটক হিসেবে জনপ্রিয় করা যায়, তবেই নতুন পাঠককে আবার কাগজের বইয়ের ঘ্রাণে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ঈদসংখ্যা কেবল ঢাকার অভিজাত শ্রেণির পণ্য না হয়ে সারা দেশের মানুষের দর্পণ হওয়া প্রয়োজন। লোকগীতি, আঞ্চলিক উপাখ্যান আর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জীবনগাথা এখানে আরও বেশি স্থান পেলে বৈচিত্র্য বাড়বে। একটি সরকারি ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা আজ সময়ের দাবি, যাতে এই অমূল্য সাহিত্যিক ইতিহাস হারিয়ে না যায়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঈদসংখ্যাকে কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে না দেখে একে একটি পবিত্র সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শৈশবে বাবার হাত থেকে যে পাঠাভ্যাস আমাদের হাতে হস্তান্তরিত হয়েছিল, সেই ধারাবাহিকতা কি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছাবে? আমার সন্তান কি কোনোদিন সেই নতুন ছাপার কালির মাদকতা আর প্রতীক্ষার তৃপ্তি খুঁজে পাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর আজ আমাদের কর্মপন্থার ওপর নির্ভর করছে।
পুরোনো ঐতিহ্য আর আগামীর কৌতূহলের মধ্যে যদি আমরা একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারি, তবেই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির এই অনন্য ধারাটি বেঁচে থাকবে। গতকালের ঐতিহ্য আর আগামীকালের আধুনিকতার মিলনই হতে পারে আমাদের এই অমূল্য সম্পদের রক্ষাকবচ।
লেখক: শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
shammo4n@gmail.com

