আরও সহিংসতার সূতিকাগার

হত্যাকাণ্ডের সময় সবচেয়ে নির্মম দৃশ্যটি শুধু একজন মানুষকে মেরে ফেলার মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে সেই মুহূর্ত, যখন বিপদে পড়া আপনজনকে বাঁচাতে আরেকজন মানুষ নিজের জীবনের কথা ভুলে ছুটে যান। তিনি হয়তো জানেন, এগোলেই প্রাণহানি হতে পারে। তবু থামেন না। কারণ, আপনজনকে বাঁচানোর তাগিদ তখন নিজের মৃত্যুভয়কেও ছাড়িয়ে যায়। আর সেই ছুটে যাওয়া মানুষটিকেও যদি হত্যা করা হয়, তখন শুধু দুটি প্রাণই নিভে যায় না; আপনজনকে বাঁচানোর সহজাত ইচ্ছাকেও হত্যা করা হয়।
২০২৬ সালের ১৭ মার্চ নাটোরে এমন একটি ঘটনা ঘটে, যেখানে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারান বাবা আবুল কালাম। প্রতিপক্ষের হামলায় তার ছেলে কাওসার মাহমুদও গুরুতর আহত হন। ঘটনাটি দেখায়, আপনজন বিপদে পড়লে তাকে রক্ষা করতে গিয়ে মানুষ নিজেও প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। কিন্তু এই চেষ্টার মধ্যেই রয়েছে লেখাটির মূল প্রশ্ন: একজন মানুষ যখন অন্য একজনকে বাঁচাতে নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে যান, তখন সেই মানবিক সম্পর্কের মূল্য কতটা গভীর? আর সেই সম্পর্কের সামনে দাঁড়িয়েও যখন কেউ সহিংসতা চালিয়ে যায়, তখন নির্মমতার সীমা কোথায় গিয়ে পৌঁছায়?
হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা দেখলে বোঝা যায়, পরিবারে বিপদ নেমে এলে স্বজনরা অনেক সময় নিজের নিরাপত্তার কথা ভুলে যান। সন্তান আক্রান্ত হলে মা-বাবা তার সামনে দাঁড়ান। বাবা বিপদে পড়লে সন্তান ছুটে যায়। স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন কিংবা অন্য ঘনিষ্ঠ স্বজনের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। এ প্রবণতাকে শুধু সামাজিক শিক্ষা বা নৈতিকতার ফল হিসেবে দেখলে বিষয়টির পুরোটা বোঝা যায় না। মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, আবেগীয় সংযুক্তি, সহমর্মিতা ও পরস্পরের প্রতি দায়িত্ববোধের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
স্বজনকে হত্যা করা হলে পরিবার একটি মানুষ হারায়; কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষকারী স্বজন হারান শুধু প্রিয় একজন মানুষকে নয়, নিজের নিরাপদ পৃথিবী সম্পর্কে বিশ্বাসও
এ কারণেই পরিবারের সদস্যদের সামনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুরতা শুধু নিহত মানুষের সংখ্যায় মাপা যায় না; সেখানে একজন মানুষকে হত্যার পাশাপাশি অন্য একজন মানুষের মনে এমন একটি দৃশ্য স্থায়ীভাবে গেঁথে দেওয়া হয়, যা তার নিজের জীবনকে বহু বছর ধরে তাড়া করতে পারে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল পি মালমকুইস্ট ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় শিশুদের সামনে বাবা কিংবা মাকে হত্যার মানসিক অভিঘাত নিয়ে কাজ করেন। তিনি ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী ১৬ শিশুকে নিয়ে গবেষণা করেন। এতে দেখা যায়, মা-বাবার হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করা শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক অভিঘাত তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ হত্যার ঘটনা নিহত মানুষের শরীরের সঙ্গে শেষ হয়ে যায় না; তার অভিঘাত জীবিত স্বজনের মনেও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। স্বজনকে হত্যা করা হলে পরিবার একটি মানুষ হারায়; কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষকারী স্বজন হারান শুধু প্রিয় একজন মানুষকে নয়, নিজের নিরাপদ পৃথিবী সম্পর্কে বিশ্বাসও। যে মানুষটিকে সে আশ্রয়, ভালোবাসা কিংবা নিরাপত্তার প্রতীক হিসেবে চিনত, তার চোখের সামনে সেই মানুষকে হত্যা করা হলে পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণাটিও বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুর ক্ষেত্রে এই অভিঘাত তার আবেগীয় ও জ্ঞানগত বিকাশকে প্রভাবিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
কিন্তু প্রশ্নটি এখানেই শেষ হয় না; বরং আরও কঠিন একটি প্রশ্ন সামনে আসে। কীভাবে একজন হত্যাকারী এমন অবস্থায় পৌঁছায়, যেখানে অন্য মানুষের কান্না কিংবা আপনজনকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা তার কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না।
এই জায়গাটিই স্বজনের সামনে স্বজনকে হত্যার ঘটনাকে আরও ভয়ংকর করে তোলে। কারণ, হত্যাকারীর সামনে তখন শুধু একজন মানুষকে হত্যা করার পরিস্থিতি থাকে না; চোখের সামনে থাকে একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের ভালোবাসা, আকুতি ও দায়িত্ববোধের দৃশ্য। একজন মা সন্তানের সামনে দাঁড়িয়ে গেলে, একজন স্ত্রী স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে কিংবা একজন ভাই ভাইয়ের ওপর আসা আঘাত ঠেকাতে ঝাঁপিয়ে পড়লে সেখানে মানবিক সম্পর্কের সবচেয়ে তীব্র প্রকাশ ঘটে। সেই দৃশ্য দেখেও যদি হত্যাকারী না থামে, তাহলে সহিংসতা শুধু শরীরের ওপর আঘাত করে না; মানুষের ভালোবাসা ও আপনজনকে রক্ষার প্রবৃত্তিকেও অস্বীকার করে।
প্রাণিজগতেও সন্তান বা সঙ্গীকে রক্ষা করার প্রবৃত্তির উদাহরণ আছে। বিপদের মুখে অনেক প্রাণী নিজের চেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। মানুষের ক্ষেত্রে সেই প্রবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত হয় স্মৃতি, ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা ও সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস। তাই আপনজনকে বাঁচাতে নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা মানুষের আচরণকে কেবল তাৎক্ষণিক আবেগ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি মানুষের সামাজিক ও আবেগীয় অস্তিত্বের গভীরে থাকা একটি শক্তি।
তাই পরিবারের একাধিক সদস্যকে একে অন্যের সামনে হত্যা করা নিছক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের সমষ্টি নয়। যখন একজন মানুষ নিজের জীবন বাঁচানোর বদলে আপনজনকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়, তখন তার সেই শেষ চেষ্টার মধ্যেই মানুষের একটি গভীর মানবিক প্রবৃত্তি প্রকাশ পায়। তাকে হত্যা করা মানে শুধু একটি জীবন শেষ করা নয়; সেই ভালোবাসার প্রকাশকেও রক্তাক্ত করা।
হয়তো এ কারণেই স্বজনের সামনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। এর একটি অংশ লুকিয়ে থাকে সেই মানুষটির শেষ চেষ্টায়, যে নিজের জীবন বাঁচানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেয়েছিল, অন্তত তার আপনজনও বেঁচে থাকুক। সেই আকাঙ্ক্ষাকে হত্যা করার মানে মানুষের ভেতরের গভীরতম মানবিক প্রবৃত্তিগুলোর একটিকেও খুন করা।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক



