২৫ বিঘার খাজনা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নামজারি নিয়ে গত কয়েক দিনে কথা হয়েছে দেশের নানা প্রান্তের এসিল্যান্ডদের সঙ্গে। আমজনতাকে সামলাতে সামলাতে তারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। তাদের উপলব্ধি, নীতিগত ভুলে ভর করে ভূমি ব্যবস্থাপনা চলছে। নাগরিকের দুর্ভোগ হয়ে উঠেছে নিত্যনৈমিত্তিক। সামলাতে গিয়ে নাকাল হচ্ছেন তারাও।
এসিল্যান্ডরা কাজ করেন প্রান্তিক পর্যায়ে। তারা সরকারের ফ্রন্টলাইনার। ধাপে ধাপে কাজ করেন এডিসি (রেভিনিউ) ও ডিসি। কখনো বিভাগীয় কমিশনার, কখনো ভূমি আপিল বোর্ড অ্যাপিলিয়েট কর্তৃপক্ষ। আর নীতি বা পলিসি নির্ধারণ ভূমি মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। মাঠ পর্যায়ের অসন্তোষ নিয়ে কথা হয় তাদের সঙ্গেও। বিস্মিত হতে হয় তাদের মতামতেও। তারাও ফ্রন্টলাইনারদের সঙ্গে একমত। দীর্ঘ রিপোর্টিংয়ের সুবাদে সচিবালয়ে নানা ধাপের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আমার পরিচয়। তারাও প্রান্তিক ও মিড লেভেলের কর্মকর্তাদের ধারণার সঙ্গে একমত।
স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার তাড়নায় কিছু কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—কিছু সময়ের দাবিতে, কিছু রাজনৈতিক দৃষ্টিতে। ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ তেমনই একটি। এ জনতুষ্টিবাদী সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি ছিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, ব্যুরোক্রেটিক চ্যানেলে যাচাই করা হয়নি। অথচ আদর্শ নিয়ম হচ্ছে—সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকই হবে, কিন্তু তা ব্যুরোক্রেটিক লেভেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে আসতে হবে।
পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকারও এটি পরিবর্তন করেনি। এরশাদ, খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাই-বা কেন পরিবর্তন করেননি? কারণ, ‘দ্যাট উইল বি ভেরি আনপপুলার।’ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এ নিয়ে খেলবে, ইস্যু বানাবে। সাধারণ মানুষও এর ইমপ্লিকেশন না বুঝে বলবে— সিদ্ধান্তটি জনস্বার্থবিরোধী।
অথচ ভূমিকর অত্যন্ত সামান্য বা অকিঞ্চিৎকর একটা ফিগার। খুব সামান্য টাকা। যে পরিমাণ খাজনা আসবে, তা ভূমি অফিসে যাওয়া-আসার রিকশা বা অটো ভাড়ার চেয়েও কম। এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেছিলেন, ভূমি উন্নয়ন কর একটি ‘লারজলি আনএক্সপ্লোরড’ বা আন্ডারইউজড উৎস। তিনি এটি এক্সপ্লোর করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু অজনপ্রিয় হওয়ার ভয়ে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়।
মানুষ থানাকে এড়িয়ে চলে। সোজা কথায়— থানাকে ভয় পায়। মানুষ ভয় পায় ভূমি অফিসকেও। সেখানে গেলে কলমের খোঁচায় দাগ নম্বরে দাগ লাগিয়ে দেবে
স্বাধীনতার পর যখন এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন মনে হয়েছিল— আমজনতার কাঁধ থেকে করের বোঝা নেমে গেল। কিন্তু এসিল্যান্ডরা আজ অন্য কথা বলছেন। খাজনা আদায় কি শুধু রাজস্ব আদায়? নাকি এর কোনো প্রশাসনিক গুরুত্বও আছে?
খাজনা আদায় শুধু কর দেওয়ার বিষয় নয়; জমির মালিকানা, দখল ও রেকর্ডকে জীবন্ত রাখার একটি প্রক্রিয়া। ভূমির মালিক যখন প্রতি বছর খাজনা দেন, তখন তাকে প্রতি বছরই সেখানে যেতে হয়; অর্থাৎ ভূমি অফিসের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হয়। প্রয়োজন পড়ে নামজারি, খতিয়ান ও অন্যান্য তথ্য হালনাগাদ করার। কিন্তু খাজনা মওকুফের ফলে লাখ লাখ মালিকের ভূমি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। ‘খাজনা নেই তো ঝামেলাও নেই’— এই ঝামেলাহীন নীরবতাই আজ বড় সমস্যার জন্ম দিয়েছে। ভূমি অফিসে মালিকের শূন্যস্থান পূরণ করেছে দালাল, জালিয়াত ও দখলদারদের নানা কৌশল।
খাজনা হলো জমির ওপর স্বত্ব ও দখলের প্রমাণ। খাজনা দেওয়া থাকলে মালিকানা প্রমাণের নানা সুযোগের মধ্যে এটিও একটি বড় মাধ্যম। খতিয়ান হচ্ছে ‘রেকর্ড অব রাইটস’ এবং নামজারি হলো মালিকানার বিষয়টি নোটিফাই করা। কিন্তু এগুলো অনলাইন করার নামে মানুষ উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছে।
মানুষ থানাকে এড়িয়ে চলে। সোজা কথায়— থানাকে ভয় পায়। মানুষ ভয় পায় ভূমি অফিসকেও। সেখানে গেলে কলমের খোঁচায় দাগ নম্বরে দাগ লাগিয়ে দেবে! ভূমি মালিক যদি জানেন যে তার খাজনা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে তিনি কখনো ভূমি অফিসে যাওয়ার তাগাদা বোধ করবেন না।
বেশিরভাগ ভূমি মালিকের জমিই এখন মৃত পিতা বা দাদার নামে, কখনো কখনো আরও আগের পূর্বপুরুষের নামে। উত্তরাধিকারীরা মনে করে— কে যায় ভূমি অফিসে! কারও আবার ভূমি অফিসের নাম শুনলেই গায়ে জ্বর আসে; হয়রানি, দৌড়ঝাঁপ আর দুর্নীতির ভয়ে। কিন্তু একসময় এই উন্নাসিকতা আর থাকে না; মানুষ বাধ্য হয়ে সেখানে যায়। বিশেষ করে যখন জমি বিক্রির প্রয়োজন হয় বা সরকার জমি অধিগ্রহণ করে। তখন সে হাবুডুবু খেতে থাকে। সেখানে গিয়ে দেখতে পায়, জমির মালিকানা তো তার নামে নেই! সে দখলে থাকলেও কাগজপত্র অন্যের নামে। তখন সে দৌড়ায় ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে উপজেলায়, জেলায় ও বিভাগীয় শহরে। মামলা ও আপিল শুনানিতে জলের মতো টাকা বের হয়ে যায়।
কেউ মারা গেলে প্রাথমিক কাজ হচ্ছে ইউনিয়ন অফিসে বিষয়টি জানানো। কিন্তু আমরা তা করি না; কারণ এর ইমপ্লিকেশনটাই আমরা জানি না। ইউনিয়ন অফিস বা ভূমি অফিস কী করে বুঝবে যে ভূমির মালিক মারা গেছেন? ভূমির মালিক মারা গেলে স্বাভাবিক নিয়মে উত্তরাধিকারীরা মালিক বনে যাবে, আর ছেলেমেয়েদেরও ভূমি অফিসের খোঁজ করার প্রয়োজন পড়ে না, কারণ তাদের ভোগদখলে তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। অসুবিধাটা তখনই হয়, যখন মালিকানা ট্রান্সফার করতে হয়।
২৫ বিঘা জমির মালিক কিন্তু দরিদ্র নন। দরিদ্র হচ্ছেন তারা, যাদের জমি এক একর বা তিন বিঘার চেয়ে কম। যদি তিন বিঘার নিচের জমির মালিককে দরিদ্র বলা হয়, তবে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিককে একই কর মওকুফের আওতায় রাখার কি যুক্তি? তিন বিঘার নিচের ক্ষুদ্র ভূমি মালিকদের জন্য যে কর সুবিধা, তা ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য হবে কেন?
কাজেই ২৫ বিঘা অনেক জমি। ২৫ বিঘার মালিকদের প্রতি সরকারের এত দায় থাকার তো কথা নয়। তারা তো সব ধরনের কর দিচ্ছেন। মাসে মাসে বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছেন, প্রক্রিয়াজাত সব পণ্যেই ভ্যাট দিচ্ছেন। এত কিছুর ভার বহন করতে পারলে তারা কেন মাত্র কয়েকশ টাকার খাজনা দিতে পারবেন না?
বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। এখানে বড় ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দরকার। তবে সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সচেতনতা তৈরি করা দরকার, যাতে মানুষ ভুল না বোঝে। মানুষ এতদিন খাজনা না দেওয়ার স্বাদ পেয়েছে; এখন নতুন করে খাজনা চালু করতে গেলে সেই স্বাদে হাত পড়বে। রাজনৈতিকভাবে তাই বিষয়টি সাপের পাঁচ পা দেখার মতোই কঠিন।
ভূমি অফিস দেশের অন্যতম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান। তবে ঘুষের সঙ্গে খাজনা গুলিয়ে ফেলার কোনো কারণ নেই। খাজনা মওকুফ করলেই ঘুষ বন্ধ হয় না; আবার খাজনা বাড়ালেও ঘুষ আপনাআপনি বাড়ে না। দুর্নীতি সামলাতে হবে প্রশাসনিক জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে।
সম্পূর্ণ কর মওকুফের বদলে নামমাত্র কর নেওয়া যেতে পারে। ধাপে ধাপে কর নির্ধারণ করা যায়— পাঁচ বিঘা পর্যন্ত নামমাত্র, ১৫ বিঘা পর্যন্ত একধরনের এবং ২৫ বিঘা পর্যন্ত আর একটু বেশি হারে। এমন একটা অঙ্ক নির্ধারণ করা হবে, যা সংসারের বাজেটে টান ফেলবে না; কিন্তু প্রতি বছর তাকে নিজের জমির খাজনা দিতে বাধ্য করবে।
কয়েকশ টাকা রাজস্বের চেয়েও বড় বিষয় হলো— মালিকের মতো জমির রেকর্ড যেন ঘুমিয়ে না পড়ে। সামান্য কটি টাকার বিনিময়ে যদি মানুষের জমির কাগজপত্র ঠিক থাকে, নিরাপদ থাকে মালিকানা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক ভূমির মাধ্যমে যদি প্রতি বছর নবায়ন হয়— তবে সেই সুযোগ কি আমরা নেব না?
দেশের ৮০ ভাগ মামলাই ভূমি-সংক্রান্ত। আর এই বিপুল মামলা-মোকদ্দমার মূল কারণই হলো অব্যবস্থাপনা। সরকারের কাজ শুধু তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা দেখা নয়; আগামী দিনের বিপদটিও আগেভাগে আঁচ করা। জনপ্রিয়তার হিসাব তো ৫৫ বছর ধরে অনেক হলো, এবার প্রয়োজন জমির হিসাবটা ঠিকঠাক করা।
লেখক: ডেপুটি এডিটর, আগামীর সময়




