শ্রমিক অসন্তোষ— সংকট না ষড়যন্ত্র?

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের মতো রপ্তানি; ৩৫ লাখের বেশি শ্রমিক, যাদের ৫৫ শতাংশ নারীশ্রমিক, যুবকনির্ভর শিল্পকারখানা; যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিকের বয়স ৪০ বছরের কম, শ্রমঘন শিল্পই শুধু নয়, একেকটা শিল্পাঞ্চলে কারখানার সংখ্যাও অনেক বেশি; ফলে লাখ লাখ শ্রমিক বাস করে একেকটা এলাকায়। সেই খাতে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগে না। এবারও সেটাই ঘটেছে।
গত কয়েক দিনে শ্রমিকরা নেমে এসেছে রাস্তায়, সংঘর্ষ হচ্ছে পুলিশের সঙ্গে, মালিকরা বন্ধ ঘোষণা করছেন একের পর এক কারখানা। মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ, অবরোধ ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ শ্রমিকদের ওপর টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিচার্জ করেছে; এতে পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছিল। এরই মধ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বৃহৎ কারখানা বলে পরিচিত কয়েকটি গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণায় উত্তেজনার সঙ্গে আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে এ খাতে। শ্রমিকদের অসন্তোষের সূত্রপাত বকেয়া মজুরি নিয়ে। উত্তরাসহ কয়েকটি অঞ্চলে শ্রমিকদের মজুরি কয়েক মাস বাকি— এ কথা বলে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মজুরি বোর্ড ঘোষণা এবং নিম্নতম মজুরি ঘোষণার দাবি।
পরিস্থিতি প্রতিমুহূর্তেই পাল্টাচ্ছে। দেশের তিন শিল্প অধ্যুষিত মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ, সাভার-আশুলিয়ায় বিজিএমইএর আওতাধীন ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে সচল ছিল ১ হাজার ৮১৬টি। তবে শ্রম অসন্তোষের জেরে ৭৭৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ এলাকায়ও। এর আগে ঢাকা মহানগরীর মিরপুরে শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে গেলে ৬৮টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬২৫। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ২৭৬ কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ১৮৫টির শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে যান। এই এলাকায় কাজ করেননি ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ শ্রমিক। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক এখন কারখানার বাইরে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্পমালিকরা। মালিকদের সংগঠন বলেছে, অবস্থার উন্নতি না হলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়টি তারা বিবেচনা করবেন।
অর্থনীতি শুধু অঙ্কের হিসাব করে। মালিক হিসাব করে মুনাফা। শিল্প টিকে থাকলেই শুধু চলবে না, তার মুনাফা বাড়াতে হবে। শ্রমিক চায় মজুরি। যেমন-তেমন মজুরি দিয়ে কায়ক্লেশে জীবনধারণ নয়, জীবন বিকাশের জন্য মজুরি। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে যে গতিতে, শ্রমিকের মজুরি সে অনুপাতে বাড়ছে না
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের মজুরি বিশ্বের পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি গত দুই দশকে কয়েক দফায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে নিম্নতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১০ সালে তা বাড়িয়ে ৩ হাজার, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০, ২০১৮ সালে ৮ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়েছিল। সাতটা গ্রেডে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রেড-১-এ সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩৫ টাকা। এ মজুরি দিয়ে কেমন জীবনযাপন করা যায়? অনেকে বলেছেন, ওভারটাইম করে কেউ কেউ ১৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পান; কিন্তু তারা বিবেচনা করেন না, এর জন্য দিনে শ্রমিকদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়। তারপর দ্রব্যমূল্য আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে শ্রমিকরা।
সংসার খরচ চালাতে অতিরিক্ত আয় দরকার। তাই ওভারটাইম না করলে সংসার চলে না, বাজার হয় না, আবার ওভারটাইম করলে শরীর চলে না, জীবন বলে কিছু থাকে না। পোশাকশ্রমিকরা ওভারটাইম করে বাঁচার জন্য, সংসার আর চাকরি রক্ষা করতে। শ্রমিকদের জীবন যেন এ চক্রে বাঁধা।
পোশাকশ্রমিকদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়? শ্রম আইনে আছে ৮ ঘণ্টা, বাস্তবে খাটতে হয় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, একজন শ্রমিক মাসে আইনের চেয়ে ২৮ ঘণ্টা বেশি কাজ করেন এবং অর্ধেকের বেশি সপ্তাহে তারা আইনি সীমা ৬০ ঘণ্টার চেয়েও বেশি সময় কারখানায় থাকেন।
এ দৈনিক রুটিন দেশের ২৫ লাখের বেশি নারী শ্রমিকের, যারা কাজ করেন গার্মেন্টসে। পুরুষ শ্রমিকদের রান্না আর বাচ্চা সামলানোর কাজ বাদ দিলে বাজার করা ও অন্যান্য কাজসহ প্রতিদিনের রুটিন প্রায় একইরকম। এ শ্রমিকদের হাতে সেলাই হওয়া, আয়রন করা, প্যাকেট করা ‘Made in Bangladesh’ ট্যাগ গর্ব করে বহন করে বিশ্ব; কিন্তু তাদের নিজেদের জীবনটাই আটকে আছে একটা দৃশ্যমান চক্রে আর অদৃশ্য শোষণের জালে। ছুটতে ছুটতে বাসায় আসা, দৌড়ে ফ্যাক্টরিতে হাজির হওয়া, একনাগাড়ে কাজ করা, ঘুম— একই চিত্র প্রতিদিন, যতদিন চাকরিটা থাকে।
অর্থনীতি শুধু অঙ্কের হিসাব করে। মালিক হিসাব করে মুনাফা। শিল্প টিকে থাকলেই শুধু চলবে না তার, মুনাফা বাড়াতে হবে। শ্রমিক চায় মজুরি। যেমন-তেমন মজুরি দিয়ে কায়ক্লেশে জীবনধারণ নয়, জীবন বিকাশের জন্য মজুরি। কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে যে গতিতে, শ্রমিকের মজুরি সে অনুপাতে বাড়ছে না। প্রতি তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠন করার আইন হয়েছে; কিন্তু তিন বছর দ্রব্যমূল্য, বাড়ি ভাড়া, জীবনযাপন ব্যয় স্থির রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরির ব্যবধান বেড়েছে ক্রমাগত। এ ব্যবধান না কমাতে পারলে শ্রমিক অসন্তোষ কমবে না। আন্দোলন থামাতে দমনপীড়ন নয়, শ্রমিকদের আশ্বস্ত করতে হবে। আন্দোলনে অনেকেই অংশ নেবে, তাই ষড়যন্ত্র খোঁজা নয়; সংকটের সমাধান করতে হবে। মজুরি যুক্তিসংগত করা, শ্রমিকদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা আর মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যে গার্মেন্টস খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ জোগান দেয়, তাকে আর কতদিন সস্তা শ্রমিক, অদক্ষ শ্রমিকের খাত বলে বিবেচনা করা হবে?
অসন্তোষের মূল কারণ স্বল্প মজুরি, অতিরিক্ত পরিশ্রম, চাকরি হারানোর আশঙ্কা আর বৈষম্য বৃদ্ধি। নজর দিতে হবে এখানে। এ পর্যন্ত যতবার আন্দোলন হয়েছে, প্রতিবার ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ যেমন হয়েছে তেমনি গুলি হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে শ্রমিকদের, শত শত শ্রমিক জেল খেটেছে, হাজার হাজার শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে আর চাকরি হারিয়েছে অসংখ্য শ্রমিক। কিন্তু তারপরও কেন শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একটা স্থায়ী মজুরি কমিশন গঠন করা, বাজারদর ও পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে সংগতি রেখে মজুরি নির্ধারণ করার দাবিকে বিবেচনায় নিতে হবে। উসকানি ও ষড়যন্ত্র খোঁজার উৎসাহে যেন সংকটের মূল কারণ আড়াল না হয়, সে বিষয়টাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক




