চীনের প্রাচীর, পৃথিবীর দীর্ঘ কবরস্থান!

গ্রাফিক্স: আগামীর সময়
গ্রেট ওয়াল অব চায়না! বাংলায় চীনের মহাপ্রাচীর। চীনা ভাষায় ছাং ছং। যার অর্থ দীর্ঘ প্রাচীর বা অন্তহীন দেয়াল। ‘১০ হাজার মাইল দেয়াল’ নামেও সুখ্যাত ইতিহাসে। চীনের হাজার গল্পের ঝুড়ি। আকাশ থেকে দেখলে মনে হয় পৌরাণিক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ড্রাগনটিই পেঁচিয়ে রেখেছে তার প্রিয়ভূমিকে। ২১ হাজার ১৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ লেজ দিয়ে আগলে রেখেছে চীনকে। সীমান্তের পাহাড়-পর্বত, নদী-মরুভূমি ছুঁয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে সাপের মতো। প্রাচীর ঘিরে প্রচলিত হাজার বছরের অলৌকিক কেচ্ছা-কাহিনিতেও বারবার এসেছে এই রূপকথার ‘ড্রাগন’! প্রাচীরের গতিপথ নাকি নির্ধারণ করেছিল একটি বিশাল ড্রাগন। অলৌকিক সেই পায়ের ছাপ অনুসরণ করেই নির্মিত হয়েছে পৃথিবীর এই সপ্তাশ্চর্য। মহাপ্রাচীরের শুরু আর শেষটাতে দেওয়া হয়েছে ড্রাগনের মাথা আর লেজের আকৃতি। পশ্চিমের গানসু (প্রদেশ) মরুভূমির জিয়াইউগুয়ান সিটি থেকে ছুটে এসে মুখ ডুবিয়েছে পূর্বের হেবেই প্রদেশের শাং হাইকুয়ানের বোহাই সাগরে। দেখে মনে হয়, পানি পান করছে ড্রাগনটি। প্রাচীরের এই অংশকে বলা হয়, হেড অব ড্রাগন। চীনা বিশ্বাসে, ফার্স্ট পাস আন্ডার হ্যাভেন; স্বর্গের প্রথম দুয়ার।
লোককাহিনির শেষ নেই চীনের প্রাচীরে। বংশানুক্রমের ঢেউয়ে আছড়েপড়া দেয়াল নির্মাণের সে নিষ্ঠুর গল্পে আজও গা শিউরে ওঠে লোকালয়ের। মহাপ্রাচীর আড়ালে এর আরেক নাম ‘পৃথিবীর দীর্ঘ কবরস্থান’। গল্প আছে, ২ হাজার ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত এ দেয়াল নির্মাণে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ লাখেরও বেশি শ্রমিক। যাদের প্রত্যেককেই গেঁথে দেওয়া হয় দেয়ালে। প্রাচীরের ভেঙে পড়া অংশে খনন চালিয়ে সেই সত্যতা পেয়েছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। অসংখ্য হাড়গোড় পেয়েছেন বিভিন্ন সময়ে। শ্রমিকদের ওপর অকথ্য নির্যাতন করতেন রাজকর্মচারীরা। লোকমুখে শোনা যায়, সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের (খ্রিস্টপূর্ব ২২১ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২০৭) শাসনামলে মেং জিয়াং নু নামের এক নারীর স্বামী মারা যান প্রাচীর তৈরির কাজে গিয়ে। রাজার পাইক-বরকান্দজরা তাকে জোর করে ‘বেগার শ্রমিক’ হিসেবে পাঠিয়েছিল প্রাচীর নির্মাণে। প্রেমের বিয়ে ছিল তাদের। চীনে তখন হাড়কাঁপানো শীত। খবর পেয়ে স্বামীর জন্য শুকনো খাবার ও শীতের পোশাক আনতে ছোটেন লেডি মেং জিয়াং নু। ফিরে এসে শোনেন সব শেষ! ততক্ষণে মারা গেছেন স্বামী। রাজার ওপর প্রচণ্ড আক্রোশে বুক চাপড়ে কান্না শুরু করেন নু। কথিত আছে, প্রাচীরের যে অংশে স্বামী ইট টানছিল; সেখানে বসে টানা কয়েক মাস ধরে বিলাপ করেন নু। তার কান্নায় ধসে পড়ে প্রাচীরের বিশাল একটি অংশ। ভেসে ওঠে স্বামীর মরদেহ। গল্পটি আজও চীনের বহুল প্রচলিত চার লোককাহিনির একটি হিসেবে গণ্য।
চাঁদ বা মহাকাশ থেকেও নাকি খালি চোখে দেখা যায় চীনের প্রাচীর। প্রকৃতপক্ষে, এটি মহাকাশ থেকে দৃশ্যমান নয়। মহাপ্রাচীর শুধু একটি স্তম্ভ নয়; বীরত্বের নিদর্শনও। আমজনতার মতোই সে কথা বিশ্বাস করতেন চীনের বিপ্লবী নেতা মাও সেতুংও। এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘যে চীনা কখনো মহাপ্রাচীরে পা ফেলেনি, সে সত্যিকারের পুরুষই নয়।’ প্রাচীরের বিভিন্ন অংশে দেখা যায় মন্দিরও। সেখানে তাদের ইতিহাসের মহৎ ব্যক্তিদের স্মরণ করে চীনারা।
আগের সে দেয়ালের ৩০ শতাংশ হারিয়ে গেছে এখন। চুরি করে এর ইট দিয়ে বাড়ি বানানোর কারণেই বিলীন হওয়ার পথে ঐতিহাসিক এ প্রাচীর । চীনা ভাষা খোদাই করা একেকটি ইট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫ ডলার বা ৩০ ইউয়ান।
স্থাপত্যবিদ্যার বিস্ময়
বিশ্বআশ্চর্য এই মহাপ্রাচীরের ইতিহাস ঘাটলে বেরিয়ে আসে চীনের স্থাপত্যবিদ্যার আরেক বিস্ময়। খ্রিস্টের জন্মের ৫ থেকে ৮শ বছর আগেই দেয়াল নির্মাণের কলাকৌশল বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের প্রকৌশলীরা। দীর্ঘ এ প্রাচীরের প্রায় পুরোটাই মাটি ও পাথরে নির্মিত। পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ সামরিক অবকাঠামোও বটে! আবার মানুষের হাতে তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপত্যও এটি। গাঁথুনিতেও রয়েছে বিশ্বসেরার চমক। প্রাচীর তৈরির কংক্রিটের মিশ্রণে আঠালো ভাত ব্যবহার করেছিলেন রাজার স্থপতিরা। নির্মাণ বিজ্ঞানে পৃথিবীতে প্রথম আবিষ্কার। ২০১০ সালে প্রকাশিত ঝেজিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টস অব কেমিকেল রিসার্চ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উঠে এসেছে সেই কালজয়ী তথ্য। গবেষণা অনুসারে, স্টিকি রাইস বা আঠালো ভাত ব্যবহার করা হয় কংক্রিটের মিশ্রণে। এটি জলরোধী ও ভূমিকম্প প্রতিরোধী। শুরুর দিকে (সম্রাট কিন শি হুয়াং) দেয়ালটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছিল মাটি, কাঠ ও পাথর। মিং সাম্রাজ্যের সময়ে (১৩৬৮-১৬৪৪) চুন, ইট আর পাথর। বর্তমানে দেয়ালের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন নাশকতায়। পুনর্নির্মাণেও ধ্বংস হয়েছে কিছু অংশ। পূর্ণাঙ্গ জরিপ না থাকায়, কতটুকু স্থান রক্ষা পেয়েছে সে তথ্য কারও জানা নেই। ধারণা করা হয়, আগের সে দেয়ালের ৩০ শতাংশ হারিয়ে গেছে এখন। চুরি করে এর ইট দিয়ে বাড়ি বানানোর কারণেই বিলীন হওয়ার পথে ঐতিহাসিক এ প্রাচীর । চীনা ভাষা খোদাই করা একেকটি ইট বিক্রি হয়েছে প্রায় ৫ ডলার বা ৩০ ইউয়ান।
সীমান্ত দুর্গ
চীনের দেয়াল আজ বিশ্বের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠলেও মূলত এটি ছিল সম্রাটদের রাজ্য সীমানা ও সীমান্ত দুর্গ। এই প্রাচীর থেকে সীমান্ত পাহারা দিতেন সীমান্তরক্ষীরা। পাহারা দিতেন দলে ভাগ হয়ে। ফলে এক দলের সঙ্গে অন্য দলের যোগাযোগ রক্ষার বিষয়ও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। পাহাড়ের চূড়ায় বা অনেক উঁচুতে ছিল সেনাবাহিনী পর্যবেক্ষণ ও সিগন্যাল টাওয়ারগুলো। ফলে খুব সহজেই বোঝা যেত টাওয়ার থেকে আসা সতর্কতা বা বিপদসংকেত। একসময় নিয়মিত সেনা টহল চলত প্রাচীরের ওপরে। ২০ থেকে ২৬ ফুট উঁচু (স্থান বিশেষ) দেয়ালের মাথায় পাশাপাশি ১০ সেনা হাঁটত একসঙ্গে। ঘোড়া ৫ থেকে ৬টি। গোপন সামরিক রসদের বহরও চলত এই পথেই। দেয়ালের দৈর্ঘ্য নিয়ে মিথ রয়েছে বিশ্ব পর্যটন মহলেও। দিনে ৪০-৪৫ কি.মি করে হাঁটলে টানা ১৭ থেকে ১৮ মাস লেগে যাবে প্রাচীরের শেষ ছুঁয়ে আসতে। চীনের দেয়াল নামে পরিচিত হলেও পুরো চীন কিন্তু এই দেয়ালে ঘেরা নয়। ৩৪টি প্রদেশের মাত্র ১৫টি প্রদেশ ও কয়েকটি স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চলের সীমান্ত ঘিরে আছে এই দেয়াল।
২০ থেকে ২৬ ফুট উঁচু (স্থান বিশেষ) দেয়ালের মাথায় পাশাপাশি ১০ সেনা হাঁটত একসঙ্গে। ঘোড়া ৫ থেকে ৬টি। গোপন সামরিক রসদের বহরও চলত এই পথেই। দেয়ালের দৈর্ঘ্য নিয়ে মিথ রয়েছে বিশ্ব পর্যটন মহলেও। দিনে ৪০-৪৫ কিমি করে হাঁটলে টানা ১৭ থেকে ১৮ মাস লেগে যাবে প্রাচীরের শেষ ছুঁয়ে আসতে।
নির্মাণ পদ্ধতি
মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্থাপনাতে তৎকালীন সেরা প্রকৌশলীদের অবদান সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। তাদের দেখানো পথ এখনো পাথেয়। সাধারণ কিছু যন্ত্র ব্যবহার করে এত দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল শুধু চৈনিক সভ্যতার হাতেই। হাতিয়ার বলতে ছিল, কোদাল, খুরপি, হাতুড়ি, বাটালি ও ছেনি শাবল। একদল কাঠের ফ্রেম বানাত। মাটি, পাথর ভরে দিত আরেক দল। চাপ দিয়ে তা শক্ত করত শেষের দল। বাইরের দিকে ছিল পোড়ামাটি বা ইট, যা প্রাচীরকে করত দুর্ভেদ্য। কিন্তু সব জায়গায় ছিল না মাটি। তখন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন প্রাচীন ইঞ্জিনিয়াররা। তার একটি উদাহরণ মরুভূমি। যেখানে টনকে টন মাটি নিয়ে গিয়ে প্রাচীর নির্মাণ অসম্ভব। সেটাও সম্ভব করেছিল চীনারা। খাড়া পাহাড়, জঙ্গল বা নদী কোনো কিছুই আটকাতে পারেনি তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে।
নির্মাণের ইতিহাস
চীনের ঐতিহাসিক উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত রাজ্য ও রাজত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই শুরু হয় প্রাচীর নির্মাণ। সম্রাট কিন শি হুয়াংয়ের আমল থেকে শুরু হওয়া সীমান্ত দুর্গটি রীতিমতো দেশটির ২০ রাজবংশের হাত ধরে রূপ নিয়েছে আজকের চীনের প্রাচীরে। সে সময় ইউরেশিয়ান প্রান্ত থেকে যাযাবর গোষ্ঠীগুলোর যথেচ্ছ আক্রমণ ঠেকাতেই এ পন্থা। চীনের প্রাচীর আসলে বেশ কিছু দুর্গের সমষ্টি। চীনের কিন, ঝাও, কিউ, ইয়ান ,জিং ,সুই,তাং লিয়াও,ইয়ান,ছিং— সবমিলে সে যুগের প্রায় ২০ রাজবংশের হাতে গড়ে ওঠে চীনের এই বিশাল দুর্গ । কিন রাজ্যের কিন শি ২২১ খ্রিস্টপূর্বে তার শেষ শত্রুদেরও পরাজিত করে পুরো চীনে প্রথম স্থাপন করেন ‘কিন’ বংশের রাজত্ব। কেন্দ্রীয় শাসন জোরদারে ভাঙার নির্দেশনা দেন বিভিন্ন রাজ্যের আগের দেয়ালগুলো (যেগুলো সেই রাজ্যকে অন্যদের চেয়ে আলাদা করে রেখেছিল)। তবে উত্তর দিক থেকে অব্যাহত ছিল জিয়াংনু গোষ্ঠীর আক্রমণ। আক্রমণের হাত থেকে রাজ্যকে রক্ষার জন্য অবশিষ্ট দুর্গগুলোকে সংযুক্ত করে নতুন দেয়াল নির্মাণের নির্দেশ দেন সম্রাট। ১০ লাখেরও বেশি সেনা নিয়ে সাম্রাজ্যের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তে লম্বা দেয়াল তুলতে বলেন সেনাপতি মেং তিয়ানকে। শুরু হয় চীনের দেয়ালের নির্মাণযজ্ঞ। দেয়ালের কাঁচামাল জোগাড় ছিল তখন বেশ কষ্টসাধ্য। স্থানীয় যেসব কাঁচামাল পাওয়া যেত- তা দিয়েই চলত কাজ।
দিনরাত চলত দেয়াল নির্মাণ। প্রধান শক্তি ছিল সৈনিকরা। জোরপূর্বক নিয়োগপ্রাপ্ত সাধারণ মানুষ ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি। সারা দেশ থেকে আনা হতো রাজমিস্ত্রি, পাথরকাটা শ্রমিক, ইটগাঁথুনি কর্মী এবং কাঠমিস্ত্রি। পুরুষ শ্রমিকে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় কাজে বাধ্য করা হয় নারীদেরও।
১৪শ শতাব্দীতে এসে মিং সাম্রাজ্যের অধীনে যেন নবজীবন লাভ করে চীনের মহাপ্রাচীর। মূলত টুমুর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা সচেতন হয়ে ওঠে এ বিষয়ে। এক প্রকার বাধ্য হয়ে উত্তরের সীমান্তে আবার শুরু করেন দেয়াল নির্মাণ। এবারের দেয়ালগুলোও বেশ শক্ত ছিল। এর কারণ ছিল, তারা আগের মতো স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরি না করে এবার দেয়ালগুলো তৈরি করল পাথর এবং ইট দিয়ে। দেয়ালের ওপর নির্মাণ করা হলো প্রায় ২৫টি ওয়াচ টাওয়ার। কিন্তু এতেও আটকানো যাচ্ছিল না মঙ্গোলদের আক্রমণ। চালাতে থাকে নিয়মিত আক্রমণ। এর ফলে আরও বেশি ক্ষতি হতে লাগল দেয়ালগুলোর। আর সংস্কারের পেছনে আবার প্রচুর অর্থ ও শ্রম খরচ হতে লাগল মিংদের । ১৮৬০ সালে শেষ হওয়া দ্বিতীয় অপিয়াম যুদ্ধের পর বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় চীনের সীমান্ত। এর ফলেই এই মহাপ্রাচীর সম্বন্ধে ভালোভাবে প্রথম জানতে পারেন ব্যবসায়ী এবং দর্শনার্থীরা। এর আগপর্যন্ত সারা বিশ্বে এর তেমন কোনো পরিচিতি ছিল না। ধীরে ধীরে দর্শনার্থীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় এই মহাপ্রাচীর। সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে উনবিংশ শতাব্দীতে। এই প্রাচীরের লুকিয়ে থাকা ১৮ কিলোমিটার অংশ নতুন করে আবিষ্কার করা হয় ২০০৯ সালে।
চীনের দেয়াল নামে পরিচিত হলেও পুরো চীন কিন্তু এই দেয়ালে ঘেরা নয়। ৩৪টি প্রদেশের মাত্র ১৫টি প্রদেশ ও কয়েকটি স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চলের সীমান্ত ঘিরে আছে এই দেয়াল।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে প্রাচীরটির অনেক অংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত। যদিও বেইজিংয়ের উত্তর দিকে এবং পর্যটন কেন্দ্রের আশপাশে অনেকটাই সংরক্ষিত। এসবের কিছু অংশে আবার সংস্কারও হয়েছে অনেক। ২০১৪ সালে লাইয়াওনিং এবং হেবেই প্রদেশের সীমান্তের কাছের দেয়ালগুলোতে করা হয়েছে কংক্রিটের নতুন সংস্কার। বেশ সমালোচনার মুখেও পড়েছিল তখন। ২০১২ সালে চীনের ‘স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কালচারাল হেরিটেজ’ প্রকাশিত তথ্যমতে, মিং সাম্রাজ্যের সময় তৈরি হওয়া ২২ শতাংশ প্রাচীরই (প্রায় দুই হাজার কিমি) ধ্বংস হয়ে গেছে সম্পূর্ণভাবে। যে অংশ গানসু প্রদেশে, তার ৬০ কিমিও ধ্বংস হয়ে যাবে সামনের ২০ বছরেই।
নির্মাণশ্রমিক
দিনরাত চলত দেয়াল নির্মাণ। প্রধান শক্তি ছিল সৈনিকরা। জোরপূর্বক নিয়োগপ্রাপ্ত সাধারণ মানুষ ছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমশক্তি। সারা দেশ থেকে আনা হতো রাজমিস্ত্রি, পাথরকাটা শ্রমিক, ইটগাঁথুনি কর্মী এবং কাঠমিস্ত্রি। পুরুষ শ্রমিকে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় কাজে বাধ্য করা হয় নারীদেরও। রাজদরবারে সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীদেরও শাস্তি হিসেবে নিযুক্ত করা হতো বাধ্যতামূলক শ্রমে। মাথা ন্যাড়া করে শিকল বেঁধে রাখা হতো তাদের। দিনে পালাক্রমে প্রাচীর পাহারা; রাতে নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ। কিন রাজবংশের সময় প্রায় তিন লাখ সৈন্য এবং পাঁচ লাখ সাধারণ মানুষ যুক্ত ছিল নির্মাণে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশ। উত্তর ওয়েই রাজবংশ কাজে লাগায় প্রায় এক লাখ মানুষকে। আর উত্তর চি রাজবংশের প্রকল্পে যুক্ত ছিল ১৮ লাখ মানুষ। সুই রাজবংশ নিয়োগ দিয়েছিল প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক। এসব থেকে বোঝা যায়, মহাপ্রাচীর নির্মাণে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি রাজবংশই বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়োগ করেছিল বাধ্যতামূলক শ্রমে। কিন শি হুয়াংয়ের শাসনামলে মারা যায় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ, যা প্রায় ১০ শতাংশ মৃত্যুহার। বেশিরভাগই মারা যায় রোগ, অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ধসের কারণে। এই হারের ভিত্তিতে অনুমান করা যায়, ইতিহাস জুড়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা হতে পারে ১০ লাখেরও বেশি।


