দলিল বদলালেই কি পরিবারের ভিত শক্ত হয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘সম্পত্তি’, ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘বণ্টন’— বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে খুব ভারী তিনটি শব্দ। এগুলো শুধু জমি, বাড়ি কিংবা অর্থের হিসাব নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের অদৃশ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু বৈশিষ্ট্য— ক্ষমতার বণ্টন, ভালোবাসা, দায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকে থাকার সংগ্রাম।
একটি পরিবারে কে সম্পত্তির মালিক, কে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করেন এবং মালিকের মৃত্যুর পর কে কতটুকু পাবেন— এসব প্রশ্ন অনেক সময় সম্পর্কের গভীরে থাকা বিশ্বাস, বৈষম্য ও টানাপড়েনকে দৃশ্যমান করে তোলে।
গত ৬ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এই বাস্তবতায় সম্পত্তি দানের একটি নতুন পদ্ধতি প্রস্তাব করেছে। এর অধীনে বাবা-মা সন্তানকে, দাদা-দাদি বা নানা-নানি নাতি-নাতনিকে এবং স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে সম্পত্তির মালিকানা দিতে পারবেন। একই সঙ্গে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার বা ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। জমি বা বাড়ির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিল বাধ্যতামূলক।
সহজভাবে বললে, সন্তান কাগজে সম্পত্তির মালিক হবে কিন্তু বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত বাড়িতে থাকতে কিংবা ভাড়া বা ফসলের আয় ভোগ করতে পারবেন। সন্তান আগে মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরা মালিকানা পাবেন, তবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে।
আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি মানবিক, সময় উপযোগী ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। সন্তানের ভবিষ্যৎ মালিকানা নিশ্চিত করা যাবে, আবার বাবা-মাকেও জীবদ্দশায় বাড়ি বা আয়ের উৎস হারাতে হবে না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দান সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মালিকানা সত্যিকার অর্থে গ্রহীতার কাছে চলে যাবে। দাতার কাছে থাকবে শুধু ভোগাধিকার, তিনি আর আগের মতো পূর্ণ মালিক থাকবেন না। নিবন্ধনের পর এ দান সাধারণভাবে একতরফাভাবে বাতিলও করা যাবে না। দাতা ও গ্রহীতা উভয়পক্ষ সম্মত হয়ে নতুন নিবন্ধিত দলিল করলে পরিবর্তন সম্ভব। আর কোনো পক্ষ নাবালক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে সম্মতি দিতে অপারগ হলে জেলা জজের অনুমতির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু সন্তান পরবর্তী সময়ে বাবা-মায়ের যত্ন না নিলে, নির্যাতন করলে কিংবা তাদের ভোগাধিকারে বাধা দিলে শুধু সেই কারণে দ্রুত সম্পত্তি ফেরত নেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান নেই।
এখানেই আইনটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সম্পর্ক ভালো থাকা অবস্থায় ‘উভয়পক্ষের সম্মতি’ সহজ শোনায়। কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর যে সন্তান সম্পত্তি ফেরত দিতে অনিচ্ছুক, তার সম্মতির ওপরই যদি প্রতিকার নির্ভর করে, তাহলে দুর্বল পক্ষের নিরাপত্তা কোথায়? ভোগাধিকার একজন প্রবীণ মানুষকে বাড়িতে থাকার সুযোগ দিতে পারে; কিন্তু তার খাবার, চিকিৎসা, সঙ্গ, সম্মান কিংবা নির্যাতনমুক্ত জীবন নিশ্চিত করে না। মালিকানা হস্তান্তরের পর পরিবারে তার দরকষাকষির ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা দেড় কোটির বেশি। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বৃদ্ধভাতার পরিমাণ মাসে মাত্র ৭০০ টাকা এবং সুবিধাভোগী প্রায় ৬২ লাখ। রাষ্ট্রীয় পেনশন ও প্রবীণ স্বাস্থ্যসেবার সীমিত পরিসরে অনেক পরিবারের জন্য বাড়ি বা জমিই কার্যত বার্ধক্যের সঞ্চয়, আশ্রয় ও অনানুষ্ঠানিক সামাজিক নিরাপত্তা। সেই বিবেচনায় জীবনকালীন ভোগাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আইনটির সুবিধা প্রধানত তারাই পাবেন, যাদের হস্তান্তরযোগ্য সম্পত্তি রয়েছে। ভূমিহীন ও সম্পদহীন প্রবীণের জীবনে এটি কোনো মৌলিক পরিবর্তন আনবে না। তাই একে বিস্তৃত প্রবীণ সুরক্ষাব্যবস্থার বিকল্প ভাবার সুযোগ নেই।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সম্পত্তির মালিক কে, তা নয়। প্রশ্নটি হলো, যারা একটি পরিবার গড়ে তুলেছেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কীভাবে ভাগ করে নেবে
নারীর ক্ষেত্রে আইনটির ফল আরও জটিল। একদিকে একজন বাবা তার মেয়েকে বা একজন স্বামী তার স্ত্রীকে আগাম মালিকানা দিয়ে তাদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে পারবেন। বাংলাদেশের কৃষিজমির মালিক বা অধিকারধারীদের মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ, ফলে নারীর সম্পত্তির মালিকানা বৃদ্ধির যেকোনো বৈধ সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে একই ব্যবস্থা ব্যবহার করে পরিবারের সব মূল্যবান সম্পত্তি জীবদ্দশায় শুধু ছেলের নামে দিয়ে মেয়েদের জন্য মৃত্যুর সময় অতিসামান্য সম্পত্তি রেখে দেওয়াও সম্ভব। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও চাপ সৃষ্টি করে সম্মতি বা স্বাক্ষর নেওয়ার ঝুঁকি উপেক্ষা করা যায় না। অর্থাৎ আইনটি ভাষায় জেন্ডার নিরপেক্ষ হলেও এর সামাজিক ফলাফল তা নাও হতে পারে।
ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশ বিলটিকে কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং মিরাস এড়িয়ে যাওয়ার পথ হিসেবে দেখছে। বিষয়টি সরল নয়। জীবদ্দশায় দান বা হেবা আগেও বৈধ ও প্রচলিত ছিল। নতুন আইন সেই ক্ষমতা প্রথমবার সৃষ্টি করেনি। তবে এটি আগাম দানের একটি বড় ঝুঁকি কমিয়ে দিচ্ছে— দাতা মালিকানা দিয়েও সম্পত্তির ব্যবহার ও আয় নিজের কাছে রাখতে পারবেন। ফলে জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের প্রবণতা বাড়লে মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টনের জন্য অবশিষ্ট সম্পত্তি কমে যেতে পারে।
ধরা যাক, একজন বাবার দুই ছেলে ও এক মেয়ে আছে এবং তার প্রধান সম্পত্তি একটি বাড়ি। তিনি যদি জীবদ্দশায় নতুন পদ্ধতিতে বাড়িটি শুধু বড় ছেলের নামে দিয়ে দেন, তবে বাবা বেঁচে থাকতে বাড়িটি ব্যবহার করবেন; কিন্তু মালিক হবে বড় ছেলে। বাবা মারা গেলে বাড়িটি আর তার উত্তরাধিকার সম্পত্তির অংশ থাকবে না। ফলে অন্য ছেলে ও মেয়েটি সেই বাড়ি থেকে মিরাস পাবে না। আইনে মিরাসের নির্ধারিত ভাগ পরিবর্তিত হয়নি কিন্তু যে সম্পত্তির ওপর সেই ভাগ কার্যকর হবে, তার পরিমাণ আগেই বদলে দেওয়া হয়েছে। আইনগত বৈধতা এবং নৈতিক ন্যায্যতা তাই সবসময় একই বিষয় নয়।
তবে এ আইন প্রণয়নের প্রয়োজন কেন হলো, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার পর কি কিছু বাবা-মা নিজেদের বাড়ি ব্যবহার করতে পারেননি, অবহেলা বা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা আশ্রয় হারানোর ভয় অনুভব করেছেন? যদি হয়ে থাকে, তবে সংকটটি শুধু সম্পত্তি আইনের নয়; এটি আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক, সংস্কৃতি এবং প্রবীণদের নিরাপত্তাব্যবস্থারও সংকট। আইন পারিবারিক ভালোবাসা সৃষ্টি করতে পারে না; কিন্তু সম্পর্ক ভেঙে গেলে দুর্বল মানুষটির অধিকার রক্ষা করতে পারে এবং করা উচিত।
সুতরাং আইনটি বাতিল নয়, বরং শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সন্তান মৌলিক যত্ন না দিলে, নির্যাতন করলে বা ভোগাধিকারে বাধা দিলে দ্রুত দান বাতিলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। দাতার স্বাধীন লিখিত সম্মতি ছাড়া জীবদ্দশায় সম্পত্তি বিক্রি, বন্ধক বা অন্য কোনো দায় সৃষ্টি করা যাবে না। নিবন্ধনের সময় গ্রহীতার অনুপস্থিতিতে দাতার স্বেচ্ছাসম্মতি যাচাই, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে স্বাধীন আইনজীবীর পরামর্শ এবং একটি সীমিত ‘কুলিং-অফ’ সময়ও বিবেচনা করা উচিত।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু সম্পত্তির মালিক কে, তা নয়। প্রশ্নটি হলো, যারা একটি পরিবার গড়ে তুলেছেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে তাদের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র কীভাবে ভাগ করে নেবে।
নতুন দলিলের কিংবা নতুন কোনো পদ্ধতি প্রয়োজন হতেই পারে; কিন্তু সেটিই সমাধানের শেষ কথা নয়। আইন কখনো ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে না। তবে ভালোবাসা ও বিশ্বাস ভেঙে গেলে আইনকে অবশ্যই দুর্বলের পাশে দাঁড়াতে হবে।
লেখক: ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনস স্ট্র্যাটিজিস্ট




