ভারত কি মানুষকে জোর করে ঠেলে দিতে পারে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তথাকথিত ‘পুশইন’ বা সীমান্তে মানুষকে জোর করে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ বেশ আলোচনায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশের দাবি, ভারত কোনোরকম আইনি বা কূটনৈতিক রীতিনীতি না মেনেই কিছু মানুষকে স্রেফ ‘বাংলাদেশি’ দেগে দিয়ে সীমান্তের এপারে পাঠানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, দিল্লির দাবি একেবারেই উল্টো; বলা হচ্ছে, তারা কেবল নিজেদের দেশে অবৈধভাবে বাস করা বাংলাদেশি নাগরিকদেরই নিজ দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে।
সম্প্রতি মার্কিন বার্তা সংস্থা ‘রয়টার্স’ জানিয়েছে, বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির দাবি অনুযায়ী, মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের তরফ থেকে অন্তত ১০ বার পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এ ঘটনাকে সাধারণ সীমান্ত সমস্যা মনে হতেই পারে। কিন্তু গভীরে ঢুকলে বোঝা যায়, এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক জটিল আইনি ও রাজনৈতিক সংকট। বিষয়টি সরাসরি যুক্ত নাগরিকত্ব, দেশের সার্বভৌমত্ব, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সঙ্গে। কোনো রাষ্ট্র কি স্রেফ একতরফাভাবে ঠিক করে নিতে পারে, কোনো ব্যক্তি অন্য একটি দেশের নাগরিক? এবং সেই সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে তাকে কি সীমান্ত পার করে ঠেলে দেওয়া যায়?
এই বিতর্কে ভারতের অবস্থান বুঝতে গেলে প্রথমে তাদের আইনের দিকে নজর দিতে হবে। ভারতের ১৯৪৬ সালের ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, রাষ্ট্রকে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই আইন বলে, যেকোনো বিদেশিকে শনাক্ত করা, আটকে রাখা এবং দেশ থেকে বহিষ্কার করার পূর্ণ এখতিয়ার রয়েছে প্রশাসনের। পাশাপাশি রয়েছে ১৯২০ সালের ‘পাসপোর্ট অ্যাক্ট’। এই আইন অনুযায়ী, বৈধ নথিপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশ করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। ভারতের সুপ্রিম কোর্টও বিভিন্ন রায়ে স্পষ্ট জানিয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের ভারতে বসবাস করার কোনো অবাধ সাংবিধানিক অধিকার নেই। ফলে ভারতের যুক্তি বেশ সরল— অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ফেরত পাঠানোর অধিকার দেশের সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে।
কোনো রাষ্ট্র কি স্রেফ একতরফাভাবে ঠিক করে নিতে পারে, কোনো ব্যক্তি অন্য একটি দেশের নাগরিক? এবং সেই সিদ্ধান্তের ওপর ভর করে তাকে কি সীমান্ত পার করে ঠেলে দেওয়া যায়?
কিন্তু আসল জটিলতা তৈরি হয় ঠিক এর পরের প্রশ্নটি ঘিরে। কে ঠিক করবে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি আদতে বাংলাদেশি নাগরিক কি না? এই বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। ঢাকা মনে করে, ভারত একতরফাভাবে কাউকে বাংলাদেশি বলে ঘোষণা করতে পারে না। ভারত দাবি করলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে যান না। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, নাগরিকত্ব একটি আইনি মর্যাদা, যা জন্মসূত্র বা নিবন্ধনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। ১৯৫১ সালের নাগরিকত্ব আইনের ১৯ নম্বর ধারাটি এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সেখানে বলা হয়েছে, কারও নাগরিকত্ব নিয়ে যদি কোনো সংশয় বা বিবাদ দেখা দেয়, তবে তা নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল বাংলাদেশ সরকারেরই রয়েছে।
বাংলাদেশের বক্তব্য হলো, ভারত যদি কাউকে বাংলাদেশি বলে দাবি করে, তবে সবার আগে সেই দাবির সত্যতা যাচাই করতে হবে বাংলাদেশের প্রশাসনকে। এই পরিচয় যাচাই প্রক্রিয়ার আগে বাংলাদেশ কাউকে নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে আইনত বাধ্য নয়। নাগরিকত্ব স্রেফ ভাষা, ধর্ম বা গায়ের রঙ দেখে ঠিক করা যায় না। একজন বাংলায় কথা বলছেন বলেই তিনি বাংলাদেশি, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা ত্রিপুরার কোটি কোটি মানুষের মাতৃভাষাও বাংলা। নাগরিকত্ব একটি নিখাদ আইনি পরিচয়; কোনো সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত পরিচিতি নয়।
সীমান্ত সুরক্ষায় দুই দেশের মধ্যে একাধিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকা এবং ২০১১ সালের ‘কো-অর্ডিনেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান’ বা সিবিএমপি। এসব ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো, অনুপ্রবেশ বা মানব পাচারের মতো অপরাধ যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে মোকাবিলা করা। কিন্তু যখন কোনো এক পক্ষ একতরফাভাবে মানুষকে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দিতে যায়, তখন এই যৌথ পরিকাঠামো ভেঙে পড়ে। আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কার নাগরিক, তা ঠিক করার অধিকার সেই সংশ্লিষ্ট দেশেরই থাকে। ফলে ভারত যদি কাউকে বাংলাদেশি মনে করে এবং বাংলাদেশ যদি তাকে স্বীকৃতি না দেয়, তবে একতরফা পুশইন আন্তর্জাতিক নিয়মের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়।
আন্তর্জাতিক আইনে এ বিষয়ে দুটি ভিন্ন ধারা রয়েছে। প্রথমত, প্রতিটি দেশের নিজের সীমান্ত রক্ষা করার এবং অনুপ্রবেশকারীদের তাড়িয়ে দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কোনো দেশকেই অবৈধ বিদেশিদের স্থায়ীভাবে আশ্রয় দিতে বাধ্য করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন মানুষের মৌলিক অধিকারকেও অগ্রাধিকার দেয়। ফলে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কখনোই সীমাহীন হতে পারে না। কাউকে বহিষ্কার করার আগে তার নাগরিকত্ব এবং আইনি অবস্থান খতিয়ে দেখার ন্যূনতম সুযোগ দিতে হবে। সেই সুযোগ না দিয়ে ভারত এক তরফাভাবে কোনো নাগরিককে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিতে পারে না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একে ‘আরবিট্রারি এক্সপালশন’ বা স্বেচ্ছাচারী বহিষ্কার বলে বর্ণনা করে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি অনুযায়ী, কাউকে এমন কোনো দেশে জোর করে ফেরত পাঠানো যায় না, যেখানে তার জীবন সংশয় বা নির্যাতনের আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীদের ভয় হলো ‘কালেকটিভ এক্সপালশন’ বা গণবহিষ্কার। আন্তর্জাতিক আইন বলে, প্রতিটি মানুষের পরিস্থিতি আলাদাভাবে বিচার করা উচিত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ সীমান্ত। বছরের পর বছর এখানে অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও পরিচয়-সংক্রান্ত সমস্যা চলছে। যদি প্রতিটি ক্ষেত্রে দীর্ঘ কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতা পার করতে হয়, তবে অনুপ্রবেশ ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। সার্বভৌম দেশের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখার অধিকার সবার আগে।
দিনশেষে এই পুশইন বিতর্ক তাই স্রেফ একটি সাধারণ সীমান্ত সমস্যা নয়। এটি আসলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার সঙ্গে ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের লড়াই। এটি সীমান্ত সুরক্ষার সঙ্গে মানবাধিকারের সংঘাত। এই অমীমাংসিত আইনি প্রশ্নের সমাধান লুকিয়ে রয়েছে একতরফা পদক্ষেপে নয়, বরং দুই দেশের যৌথ কূটনৈতিক সদিচ্ছা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সুচারু প্রয়োগের মধ্যে।
লেখক: উপ বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়




