এখনই প্রয়োজন সুপেয় পানির জাতীয় অঙ্গীকার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশ মানেই অসম্ভবকে সম্ভব করার এক অদম্য গল্প। আজ থেকে দুই দশক আগে এ দেশের মানুষ যখন উন্মুক্ত শৌচাগার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল কীভাবে একটি জাতি সঠিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর সামাজিক জাগরণের মাধ্যমে এক নীরব বিপ্লব ঘটাতে পারে। ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন সরকারের হাত ধরে শুরু হওয়া এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সেই জাতীয় স্যানিটেশন অভিযান আমাদের শিখিয়েছিল যে, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তৃণমূলের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলে যেকোনো বড় জাতীয় সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব। আজ সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং অভিজ্ঞতার হাত ধরেই আমাদের সামনে হাজির হয়েছে আরও বড় এক জাতীয় দায়িত্ব, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি ও জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যসম্মত জীবন নিশ্চিত করা।
সাম্প্রতিক জাতীয় পরিসংখ্যান এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা আমাদের সামনে এক গভীর বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছে। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো উন্নত উৎসের পানি ব্যবহার করলেও, নিরাপদে পরিশোধিত ও সংরক্ষিত পানীয় জলের সুফল পাচ্ছেন মাত্র অর্ধেকের কিছু বেশি মানুষ। গৃহস্থালির ব্যবহার্য পানিতে ক্ষতিকর ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া, আর্সেনিক ও লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান বিস্তার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাত আমাদের জনস্বাস্থ্য ও মানবসম্পদের অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিচ্ছে।
এরই পাশাপাশি জাতিসংঘ সম্প্রতি বিশ্ব জুড়ে যে ‘পানি দেউলিয়াত্ব’-এর শঙ্কা প্রকাশ করেছে, তা বর্তমান সংকটকে এক বৈশ্বিক মহাবিপদের মাত্রায় উন্নীত করেছে। ১৯৭০ সাল থেকে পৃথিবীর প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রাকৃতিক জলাভূমি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং নব্বইয়ের দশকের পর থেকে বিশ্বের অর্ধেকের বেশি বড় হ্রদ ও জলাধারের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। আজ বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ চরম পানি-অনিরাপত্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সেন্টারগুলোর কম্পিউটার চিপ ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন কোটি কোটি লিটার সুপেয় পানি খরচ করা হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এক ফোঁটা সুপেয় পানির অভাবে ধুঁকছেন। জাতিসংঘে প্যাট্রিয়টিক ভিশনের স্থায়ী প্রতিনিধি মোহামাদ সাফা যেমন সতর্ক করেছেন— পানি আজ করপোরেট দখলদারিত্ব ও বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে মুনাফা অর্জনের আগেই পানি মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে সুরক্ষিত করা আবশ্যক।
ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে খোদ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা নিয়ে নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে; জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বুত্রোস বুত্রোস-ঘালি এবং বিশ্বব্যাংকের সাবেক সহসভাপতি ইসমাইল সেরাজদিনসহ আন্তর্জাতিক কৌশলবিদরা বহু আগেই সতর্ক করেছেন যে, সুপেয় পানির চরম সংকট ও বণ্টন নিয়ে যদি এখনই কার্যকর বৈশ্বিক ও জাতীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনের সংঘাত ও সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ তেলের পরিবর্তে পানির দখল ঘিরেই আবর্তিত হতে পারে।
বিশেষ করে উপকূলীয়, হাওর, বরেন্দ্র ও উত্তর অঞ্চলের প্রান্তিক মানুষ এবং শিশুরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। ঠিক এই সন্ধিক্ষণে গত বছর হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি ঐতিহাসিক রায় আমাদের নতুন আলোর দিশা দেখিয়েছে। আদালত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন যে, সুপেয় পানির অধিকার সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের প্রদত্ত জীবনের অধিকারের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং রাষ্ট্র এর অভিভাবক। নদী, জলাভূমি ও ভূগর্ভস্থ পানি আজ জাতীয় সম্পদ এবং জনকল্যাণ ট্রাস্ট হিসেবে স্বীকৃত।
এই সাংবিধানিক রায় আমাদের শুধু অভ্যন্তরীণ আইনের গণ্ডিতেই আবদ্ধ রাখে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গীকার, জাতিসংঘ স্বীকৃত সুপেয় পানি ও স্যানিটেশনের মানবাধিকার এবং বিশ্ববাসীর অভিন্ন লক্ষ্যের সঙ্গে বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে। বিশেষ করে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি ৬ অর্জনের পথে এটি এক বিশাল অনুঘটক, যা দেশের সার্বিক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সরাসরি অবদান রাখে। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ পানিধারা কনভেনশন স্বাক্ষর এবং বৈশ্বিক নানা আন্তর্জাতিক কাঠামোর সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশ আজ বিশ্বমঞ্চে পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও জলবায়ু সহনশীলতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে প্রস্তুত।
বর্তমান সরকারের ঘোষিত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শন এবং একটি ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগমুখী অর্থনীতির মাধ্যমে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঙ্গে নিরাপদ পানির এই বিষয়টি গভীরভাবে জড়িত। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণ, নারী ও মেয়েদের জন্য নিরাপদ স্বাস্থ্যবিধি ও স্যানিটারি সুবিধা এবং স্থানীয় সরকারের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জবাবদিহি ও কার্যকরী গ্রাম সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার যে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি সরকার দিয়েছে, তা এই উদ্যোগের হাত ধরেই পূর্ণতা পাবে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞকে সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে প্রস্তাবিত জাতীয় উদ্যোগটি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট স্তম্ভের ওপর দাঁড় করানো হয়েছে।
সুপেয় পানির চরম সংকট ও বণ্টন নিয়ে যদি এখনই কার্যকর বৈশ্বিক ও জাতীয় পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে আগামী দিনের সংঘাত ও সম্ভাব্য বিশ্বযুদ্ধ তেলের পরিবর্তে পানির দখল ঘিরেই আবর্তিত হতে পারে
প্রথমত: অর্থনৈতিক রূপান্তর ও মানবসম্পদ উন্নয়নে নিরাপদ পানির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত: উপকূলীয়, বন্যাপ্রবণ ও খরাকবলিত এলাকার মানুষের জন্য জলবায়ু সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। তৃতীয়ত: নদী ও জলাশয় রক্ষায় দূষণ রোধ এবং প্রাকৃতিক জলাধার পুনরুদ্ধার করা। চতুর্থত: বর্জ্য ও মলমূত্র ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের মাধ্যমে নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করা। পঞ্চমত: সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং টেকসই অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা।
শুধু তাই নয়, দেশের নদী-খাল রক্ষা, খননকাজ এবং রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর দূষণ রোধে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান, পদ্মা ব্যারাজ এবং পানিসম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি বর্জ্য থেকে সার, বায়োগ্যাস ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে একটি আধুনিক বৃত্তাকার অর্থনীতি গড়ে তোলার অঙ্গীকারও এর সঙ্গে যুক্ত। পরিকল্পিত নগরায়ণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারত্ব বা পিপিপি মডেলের পাশাপাশি কঠোর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, উন্মুক্ত দরপত্র ও সুশাসন নিশ্চিত করার যে দৃঢ়প্রত্যয় সরকার ব্যক্ত করেছে, তা এই রূপরেখাকে আরও বেশি অর্থবহ করে তোলে।
এই পুরো রূপকল্পকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে তৈরি করা হয়েছে খসড়া ‘সবার জন্য নিরাপদ পানি’ শীর্ষক একটি নীতিপত্র। হেডস অব স্টেট ইনিশিয়েটিভের আওতায় এই জাতীয় উদ্যোগ মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনসাপেক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং তার আন্তরিক সম্মতিক্রমে একটি ঐতিহাসিক জাতীয় কম্প্যাক্ট বা ঘোষণার মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হবে। পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা, অগ্রাধিকারভিত্তিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং স্বচ্ছ বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করে এই কম্প্যাক্ট বাস্তবায়িত হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পানি ও স্যানিটেশনে বিনিয়োগ হলো মানবসম্পদ উন্নয়নের এমন একটি ক্ষেত্র, যা সবচেয়ে বেশি সুফল বা রিটার্ন নিয়ে আসে। এটি শিশুমৃত্যু কমায়, অপুষ্টি দূর করে এবং শ্রমের উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অক্টোবর জুড়ে জাতীয় স্যানিটেশন মাসের ঐতিহ্যকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী যদি এই ঐতিহাসিক কম্প্যাক্ট স্বাক্ষরে পরম আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তবে তা হবে বর্তমান সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী ও দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।
অতীতে বাংলাদেশ যেভাবে বিশ্বকে স্যানিটেশনবিপ্লব দেখিয়েছে, আজও সময় এসেছে সেই একই রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও জাতীয় ঐক্যের পরিচয় দেওয়ার। নীতিনির্ধারক, উন্নয়ন সহযোগী এবং সচেতন নাগরিক সমাজের যৌথ অংশগ্রহণে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে নিরাপদ পানির একটি আলোকোজ্জ্বল মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে এই ঐতিহাসিক কম্প্যাক্ট স্বাক্ষরে আজই, এখনই আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: উন্নয়নকর্মী




