চীন যেভাবে নীল আকাশের দেখা পেল

২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসের এক সকাল। ঘুম থেকে উঠে এক ভুতুড়ে, অপার্থিব নগরী প্রত্যক্ষ করলেন বেইজিংবাসী। পুরো মেগা সিটি ঢাকা পড়েছিল ঘন, হলদেটে, ধূসর এক বিষাক্ত কুয়াশায়। ইতিহাসে এ ঘটনাটি লিপিবদ্ধ হয়ে আছে ‘এয়ারপোক্যালিপ্স’ (Airpocalypse) নামে। সেদিন চীনের রাজধানীর বাতাসে অতি সূক্ষ্ম ও মারাত্মক ক্ষতিকর বস্তুকণা বা পিএম২.৫-এর মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ৭৫৫ মাইক্রোগ্রামে গিয়ে ঠেকেছিল, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিরাপদ সীমার চেয়ে ৩০ গুণের বেশি!
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে যায় যে, কয়েক হাত দূরের মানুষকেও চেনা যাচ্ছিল না। স্কুলগুলো তাদের শিক্ষার্থীদের খেলার মাঠের ওপর বিশাল বায়ু-ফিল্টারযুক্ত ‘ইনফ্ল্যাটেবল ডোম’ বা কৃত্রিম বেলুন-ছাদ তৈরি করতে বাধ্য হয়। রাস্তায় মাস্ক ছাড়া বের হওয়া ছিল আত্মঘাতী। তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান হাসপাতালগুলোতে।
২০০৩-১৩ সাল পর্যন্ত চীনের মেগা সিটি ও শিল্পাঞ্চলগুলোর বায়ুর অবস্থা ছিল ভয়াবহ। দেশটির ভারী শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শীতকালে ঘর গরম করার পুরো ব্যবস্থাটিই ছিল অনিয়ন্ত্রিত কয়লানির্ভর। কোটি কোটি টন কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত কালো ধোঁয়া আর বিষাক্ত গ্যাস স্থায়ীভাবে ধূসর করে রাখে আকাশকে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে যুক্ত হয় দেশটির যানবাহনের ধোঁয়া।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও চীন সরকারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সেই অন্ধকার সময়ে বায়ুদূষণের কারণে চীনে প্রতি বছর অকালে মারা যেতেন ১০ থেকে ২০ লাখ মানুষ। দেশটিতে আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায় ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক এবং হৃদরোগের হার। ২০১৩ সালে দূষণের কারণে মাত্র আট বছর বয়সী এক শিশুর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে, যা বিশ্ব জুড়ে তীব্র আলোড়ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। শুধু স্বাস্থ্যহানিই নয়, এর ফলে বিপুল কর্মদিবস নষ্ট হওয়া, পর্যটন খাতে ধস এবং চিকিৎসা খাতের ব্যয় বাড়ার কারণে চীনের বার্ষিক জিডিপির একটি বড় অংশই উড়ে যায় কর্পূরের মতো।
২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিং ‘এয়ারপোক্যালিপ্স’-এর ধাক্কা সামলে উঠে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে ‘দূষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। চালু করে কঠোর ও আপসহীন ১০ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনা
কিন্তু চীন এই নিয়তিকে মুখ বুজে মেনে নেয়নি। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বেইজিং ‘এয়ারপোক্যালিপ্স’-এর ধাক্কা সামলে উঠে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে ‘দূষণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। চালু করে কঠোর ও আপসহীন ১০ দফা জাতীয় কর্মপরিকল্পনা।
তিনটি ফ্রন্টে কাজ শুরু করে তারা। প্রথমত, কয়লা বর্জন ও গ্যাস রূপান্তর। বেইজিং ও এর আশপাশের অঞ্চলের লক্ষাধিক বাড়ি এবং কারখানাকে কয়লার ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় নতুন কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি। দ্বিতীয়ত, ভারী শিল্পের কঠোর স্থানান্তর ও আধুনিকায়ন। বেইজিংয়ের ভেতরে থাকা শত শত দূষণকারী স্টিল, লোহা ও সিমেন্ট কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয় চিরতরে। কিছু কারখানা সরিয়ে নেওয়া হয় শহর থেকে শত মাইল দূরে প্রত্যন্ত প্রদেশে। তৃতীয়ত, সবুজ দূরপাল্লার পরিবহনব্যবস্থা। বড় শহরগুলোতে পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির নতুন লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়াকে অত্যন্ত সীমিত ও ব্যয়বহুল করে ফেলা হয়, যা সাধারণ মানুষকে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে বাধ্য করে।
আজ এক দশকের বেশি সময় পর, এই পরিবেশ যুদ্ধের ফলাফল পৃথিবীর পরিবেশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম এবং অভূতপূর্ব অর্জন হিসেবে স্বীকৃত। ২০১৩ সালের তুলনায় চীনের প্রধান শহরগুলোতে পিএম২.৫-এর বার্ষিক গড় ঘনত্ব প্রায় ৪১ থেকে ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে। বিশেষ করে রাজধানী বেইজিংয়ে এই দূষণ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৫৪ শতাংশ। যেখানে ২০১৩ সালে বেইজিংয়ে তীব্র দূষণযুক্ত বা ‘অস্বাস্থ্যকর’ দিন ছিল ৫৮টি, সেখানে কয়েক বছরের ধারাবাহিক চেষ্টায় সাম্প্রতিক সময়ে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ দিনে! বেইজিংয়ের বার্ষিক পিএম২.৫-এর গড় প্রথমবারের মতো নেমে এসেছে ৩০ মাইক্রোগ্রামের নিচে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অভূতপূর্ব বায়ুমান উন্নয়নের ফলে চীনের সাধারণ নাগরিকদের গড় আয়ু বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ২ বছর। আর বেইজিংয়ের বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে তা বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৯ বছর।
পরিবেশ আইনকে আরও কঠোর করে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০টি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব ‘জিরো-কার্বন ফ্যাক্টরি’ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে চীন। তারা প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইনপ্রয়োগ এবং প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় থাকলে মাত্র এক দশকে বিষাক্ত বাতাসকেও নীল আকাশে রূপান্তর করা সম্ভব।
চীনের এই পরিবেশগত রূপান্তর আজ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এক দৃষ্টান্ত। বিশ্বের দূষিত শহরগুলোর শীর্ষ তালিকায় যখন ঢাকার নাম ঢুকে যায়, তখন আমরা বুঝতে পারি এটি কোনো অবধারিত ভাগ্য নয়; এটি ভুলনীতি ও উদাসীনতার ফসল। সঠিক ও কঠোর নীতিমালার মাধ্যমে এ তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
যে কাজগুলো আমাদের করতে হবে— প্রথমত, সনাতন পদ্ধতির ইটভাটা ও অপরিকল্পিত শিল্পকারখানার আধুনিকায়ন করতে হবে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর চারপাশের অবৈধ ও প্রাচীন ইটভাটাগুলো চিরতরে বন্ধ করা প্রয়োজন। উন্নত প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব ব্লক ইটের ব্যবহার শতভাগ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।
দ্বিতীয়ত, বেইজিংয়ের মতো ঢাকায়ও ফিটনেসবিহীন, কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের সংখ্যা আকাশচুম্বী। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত বৈদ্যুতিক বাস ও মেট্রোরেলের পরিধি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, শহুরে বনায়ন ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। বেইজিং তাদের বায়ুমান উন্নত করতে শহরের চারপাশে বিশাল ‘সবুজ বেষ্টনী’ তৈরি করেছিল। এ দেশের বড় শহরগুলোতে উন্মুক্ত সবুজ স্থান ও জলাশয় রক্ষা করা এবং যত্রতত্র প্লাস্টিক ও আবর্জনা পোড়ানো বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি, যা শীতকালে পিএম২.৫-এর মাত্রা মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। সর্বোপরি, একটি সমন্বিত জাতীয় মহাপরিকল্পনা বা ‘জাতীয় বায়ুর মান কর্মপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে কঠোর আইন লঙ্ঘনের জন্য থাকবে জবাবদিহি।
লেখক: সহকারী বার্তা সম্পাদক, আগামীর সময়




