রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সুরক্ষা কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে তাকে গ্রেপ্তার এবং বিচারের দাবি করা হয়েছে। ‘স্বাস্থ্যগত কারণে’ গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদকে প্রভাবিত করেছেন, ফ্যাসিবাদের শিকড় গেড়েছেন এবং ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন।
শুধু এনসিপি নয়, পদত্যাগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে বিভিন্ন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তার বিচার দাবি করা হয়।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি ‘ফ্যাসিবাদের শিকড় গেড়েছেন’ কি না এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, সেখানে তার কোনো দায় আছে কি না এবং থাকলে তাকে সেই কাজের জন্য বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ আছে কি না— সে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করা যাক।
বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা ব্রিটেনের ব্যবস্থার আদলে গঠিত। এ ব্যবস্থায় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী দলের আস্থাভাজন নেতার নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকে, যারা সম্মিলিতভাবে নির্বাহী বিভাগের সব কাজের জন্য জনগণের কাছে দায়ী থাকেন। রাষ্ট্রপ্রধান (ব্রিটেনের ক্ষেত্রে রাজা/রানী) শুধু আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করেন।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ভারত, পাকিস্তানসহ কমনওয়েলথভুক্ত সংসদীয় ব্যবস্থার রাষ্ট্রগুলোতে রাষ্ট্রপ্রধান আনুষ্ঠানিকতার কাজই করে থাকেন। তিনি কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করেন না। নির্বাহী বিভাগ মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর কথায় চলে এবং দিনশেষে তাদেরই সব কাজের জন্য সংসদে এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি শুধু দুটি বিষয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া সব কাজ তাকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে করতে হয়। উল্লিখিত দুটি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির সব সিদ্ধান্তই নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত। ব্যক্তিগত কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই।
নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষমতা না থাকায় সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে পদে থাকাবস্থায় তার সিদ্ধান্তের জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়মুক্তি দেওয়া আছে
রাষ্ট্রের এক নম্বর ব্যক্তি হওয়ায় রাষ্ট্রপতিকে সম্মান করেন সবাই। তার ছোটখাটো অনুরোধ, পছন্দের কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন— সবাই রক্ষা করার চেষ্টা করেন। যেমন আবদুল হামিদের ইচ্ছায় হাওরে সড়ক ও সেতু নির্মাণ করা হয়েছে, যা সেখানকার পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন অনেকে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, রাজনৈতিক নীতিগত বিষয়ে রাষ্ট্রপতির তেমন কিছু করার সুযোগ নেই, যদি না সরকারপ্রধান বিষয়টিতে গুরুত্ব প্রদান করেন। শেখ হাসিনার অত্যন্ত কাছের এবং সম্মানিত হওয়ার পরও ২০১০-১১ সালে ভৈরবকে কিশোরগঞ্জ থেকে বাদ দিয়ে জেলা করতে পারেননি তখনকার রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান।
সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবেও সাবেক আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত আরেক রাষ্ট্রপতি তার পছন্দের ব্যক্তিকে নৌবাহিনীপ্রধান হিসেবে সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার সুপারিশ গ্রহণ করেননি। বঙ্গভবনের একাধিক সূত্র থেকে এ বিষয়টি জেনেছি। যার জন্য রাষ্ট্রপতি সুপারিশ করেছিলেন, তিনিও আমার সিনিয়র বন্ধুর মতো।
দুর্নীতি দমন কমিশনের চাকরি শেষ করে মো. সাহাবুদ্দিন পাবনা থেকে এমপি হওয়ার জন্য সক্রিয় হন। তবে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি বিষয়ে সরকারের পক্ষে খুব শক্ত অবস্থান নেওয়ায় তিনি শেখ হাসিনার আস্থাভাজন ছিলেন। তাই তাকে সংসদ সদস্যের পরিবর্তে করেন রাষ্ট্রপতি।
এটিই বাংলাদেশের চমক। ২০০২ সালে এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে তার স্থলাভিষিক্ত হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, যিনি মনোনয়নপ্রাপ্তির কয়েক দিন আগেও তার ছাত্র ও বিএনপির মন্ত্রীদের কার্যালয়ে ঘুরে বেড়াতেন কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত হওয়ার জন্য।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও অনেক ছোট স্তরের নেতা হওয়ায় দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব, মন্ত্রী, নেতারা মো. সাহাবুদ্দিনকে খুব গুরুত্ব দিতেন— এটি ভাবার কোনো কারণ নেই। আওয়ামী লীগপ্রধান হয়তো আনুষ্ঠানিক খাতিরে তাকে দেশের রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে অবহিত করতেন, সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন। কিন্তু তার কথামতো দল অথবা রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন, সেটি বলার সুযোগ নেই বললেই চলে।
একজন দলীয়প্রধান কী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটি তার এবং তার দলের নীতিনির্ধারকরা নির্ধারণ করে থাকেন। তিনি স্বৈরতান্ত্রিক হলেও সেটি তার সিদ্ধান্ত। সুতরাং, রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাহাবুদ্দিন ফ্যাসিবাদের শিকড় গেড়েছেন, শক্তিশালী করেছেন— এমন বলাটা খুব যুক্তিযুক্ত কথা নয়।
নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করার ক্ষমতা না থাকায় সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে পদে থাকাবস্থায় তার সিদ্ধান্তের জন্য সাংবিধানিকভাবে দায়মুক্তি দেওয়া আছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তাকে কী পরামর্শ দিয়েছেন, সেটি প্রকাশ করা যাবে না অথবা সেটি আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। রাষ্ট্রীয় কাজের জন্য শুধু রাষ্ট্রপতি নন, বিচার বিভাগ এবং জাতীয় সংসদের কর্মকর্তারাও এমন দায়মুক্তি পেয়ে থাকেন। এমনকি অনেক আইনেও বলা হয়, সরল বিশ্বাসে কৃতকর্মের জন্য কোনো কর্মকর্তাকে দায়ী করা যাবে না।
কেন এ দায়মুক্তির বিধান? সাংবিধানিক দায়মুক্তি না দেওয়া হলে কিছু বেতন, সম্মান ও সুবিধার জন্য কোনো বিচক্ষণ ব্যক্তিই রাষ্ট্রপতি হতে চাইবেন না।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তিনি যদি কোনো বেআইনি কাজ করে থাকেন, সেক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে মো. সাহাবুদ্দিনের বিচার হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজের জন্য তাকে বিচার করা যাবে না।
ক্ষমতায় যিনিই থাকুন না কেন, এ বিধান থাকতে হবে। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এ বিধান বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করা হয়েছে। এগুলো নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করা সমীচীন নয়।
লেখক : সাংবাদিক




