জনবান্ধব আমলার হৃদয়বান্ধব শিক্ষা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সম্প্রতি বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় রাজধানীতে সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের চার দিনব্যাপী সম্মেলন হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সম্মেলন উদ্বোধন করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য প্রকৃত জনবান্ধব জনপ্রশাসন কায়েমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি জেলা প্রশাসকদের গণমানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে দেশবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও দুঃখ-কষ্ট লাঘবে যারপরনাই চেষ্টা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের দেশের জনপ্রশাসনের কজন আমলা আছেন, যারা নিজেদের ‘নাগরিকদের প্রকৃত সেবক’ ভাবেন? তাদের মঙ্গলভাবনাই তাদের কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে বিরাজ করে?
একটা ছোট মজার ঘটনা বলি। আশির দশকের শুরুর দিকের কথা। কমলাপুরের রেল কলোনি এলাকা থেকে তাড়াহুড়ো করে রিকশা ভাড়া করলেন ইত্তেফাকের একজন স্টাফ রিপোর্টার। কিন্তু পরমুহূর্তে রিকশায় উঠতে গিয়েই রিপোর্টার খেয়াল করলেন, রিকশাচালক বেশ বয়স্ক, প্রায় আশির কাছাকাছি। এই বুড়ো মানুষটা তাকে টেনে নিয়ে যাবে, ভাবতেই মনটা দমে গেল তার। সবিনয়ে তাকে না-যাওয়ার কথা বললে রিকশাচালকের মলিন মুখটা আরও মলিন হয়ে গেল। বারবার অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন রিপোর্টারকে, যেন সে তার রিকশায় চড়ে। একটু অপ্রস্তুত হলেন রিপোর্টার। তবে খানিকবাদেই তার মাথায় চকিতে একটা হিউম্যান স্টোরির আইডিয়া এসে গেল। রিকশায় উঠলেন তিনি। চালককে বললেন ইত্তেফাক নয়, তোপখানা রোড চলুন, প্রেস ক্লাবের কাছে। ভাগ্য ভালো সিনিয়র ফটোসাংবাদিক রশীদ তালুকদার ভাইকে তার বাসায় পাওয়া গেল। তবে রশীদ ভাই স্বভাবসুলভ ধমক মারলেন রিপোর্টারকে, ‘সক্কালবেলা আর কাম পাইলা না? এটা তোমার রিপোর্টের কী এক মহা-ছবি হবে?’ যাই হোক, মেজাজ দেখালেও ছবিটা ভালোই তুলে দিলেন রশীদ ভাই। রিপোর্টার এরপর চালককে নিয়ে ইত্তেফাক অফিসে এলেন। তার সঙ্গে কথা বলে তৈরি করলেন চমৎকার একটা মানবিক প্রতিবেদন। প্রথম পাতায় তিন কলাম জুড়ে ছাপা হলো পরদিনই। রিপোর্ট ছাপার দিনই ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক কবি মহাদেব সাহা হাফ পাতার কলামে লিখলেন, ‘এই স্টোরি তো গল্প-উপন্যাসের কাহিনিকে হার মানিয়ে দেয়।’
ব্যস! আর যায় কোথায়! কবি ও লেখক আবুল হাসনাত মোফাজ্জল করিম (পরবর্তীকালে সরকারের সচিব ও প্রখ্যাত কলামিস্টও বটে) তখন ঢাকার জেলা প্রশাসক। তিনি তার সহকারী পাতি-আমলাদের ডেকে কড়া নির্দেশ দিলেন, শিগগিরই এ রিকশাচালককে শহরতলিতে একটা দোকান করে দাও। বরাদ্দ দিলেন আঠারো হাজার টাকা (১৯৮১ সালের মানে অনেক টাকাই বটে)। রিকশাচালক দোকান পেয়ে মহাখুশি। কবি লেখক ও আমলা মোফাজ্জল করিম নিজেও মহাআনন্দিত।
ঢাকার একসময়কার ডিসি আবুল হাসনাত মোফাজ্জল করিম আর পটুয়াখালীর গণমানুষের বন্ধু ডিসি আবদুস শাকুর যেভাবে দেশপ্রেমিক ছিলেন, গণমানুষের বন্ধু ছিলেন; তাদের কাছ থেকে, তাদের আদর্শ থেকে আমরা সবাই অনেক কিছু শিখতে পারি
এখন বলুন পাঠক, বলুন সারা দেশের ডেপুটি কমিশনাররা, এই আমলা মোফাজ্জল করিমের মতো এমন মহানুভব জনপ্রশাসক এখন কোথায় পাবেন? এবার ঢাকায় রাষ্ট্রীয় আয়োজনে চার দিনব্যাপী সম্মেলন করে ডেপুটি কমিশনাররা যে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করলেন, অনেক লম্বা-চওড়া বক্তব্য দিলেন আর আত্মপ্রসাদ অনুভব করলেন, তারা কি কখনো কোনো সাধারণ গরিব নাগরিককে সরাসরি ডেকে জানতে চেয়েছেন জনপ্রশাসন নিয়ে তাদের বেদনার কথা! কয়েকজন সাধারণ নাগরিককে সঙ্গে নিয়ে একবেলা আহার করার কথাও কি কখনো ভেবেছেন তারা! এরকম আমলা ৬৪ জেলায় দুজনও কি পাওয়া যাবে? সন্দেহ আছে! চার দিনের সম্মেলনে তারা কি একটা উদাহরণও দেখাতে পেরেছেন যে, গণমানুষকে তারা মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন, তারা নিজেদের তাদের সেবক ভাবেন আর জনগণকে নিজেদের চাকরিদাতা ভাবেন?
আমি কিন্তু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি (সংসদ সদস্য) হিসেবে এসব জনপ্রশাসককে নিয়ে রাষ্ট্রের উন্নয়নকাজে অংশ নিতে দারুণভাবে আগ্রহী। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, আমাদের জনপ্রশাসকদের অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে শিক্ষার্থীজীবনে পাশাপাশি লেখাপড়া করেছি, ডিগ্রি লাভ করেছি। ছাত্রজীবনের সেই উত্তাল সময়ে দেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। তাহলে আজ তারা এবং আমরা একসঙ্গে দেশ গড়ার কাজ করতে পারব না কেন? অন্তত অনেকেরই তো সেই আগ্রহ আছে। এখনো আমাদের পাশাপাশিই কাজ করতে হয়। প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশও আছে, সেভাবে আন্তরিকতা নিয়েই কাজ করার জন্য। আমরা সবাই দেশ ও দেশবাসীর কল্যাণ চাই। অবশ্যই একে অন্যের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে আমাদের। তাদের প্রতি আমার ব্যক্তিগত বিদ্বেষ থাকার প্রশ্নই আসে না। কখনোই না। আমাদের প্রত্যেক জনপ্রতিনিধি এবং আমলাদের শতভাগ সাবধান থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী না জনপ্রতিনিধি, না জনপ্রশাসক কারও এতটুকু গাফিলতি সহ্য করবেন না। তাই আমাদের কোনো পক্ষই রাষ্ট্রীয় কাজে এতটুকু হেলাফেলা করতে পারবে না।
আমি একজন নগণ্য জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে আমাদের ৬৪ জেলার ডেপুটি কমিশনারদের উদ্দেশে কিছু পরামর্শ রাখতে চাই। ঢাকার একসময়কার ডিসি আবুল হাসনাত মোফাজ্জল করিম আর পটুয়াখালীর গণমানুষের বন্ধু ডিসি আবদুস শাকুর (প্রখ্যাত লেখক, সংস্কৃতিপ্রেমী ব্যক্তিত্ব) যেভাবে দেশপ্রেমিক ছিলেন, গণমানুষের বন্ধু ছিলেন; তাদের কাছ থেকে, তাদের আদর্শ থেকে আমরা সবাই অনেক কিছু শিখতে পারি। আমাদের জেলা প্রশাসকরা প্রত্যেকে নিজের বিশাল সরকারি বাড়ির গেটটা সবার জন্য উন্মুক্ত রেখে প্রতিদিন যদি সাধারণ মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা, আলাপ-আলোচনার চর্চাটা শুরু করেন, তাহলে উপকার হবে। এখনকার ডিসি সাহেবদের নানারকম ব্যক্তিগত স্টাফরা তাদের বাড়ির গেটের ধারেকাছেও সাধারণ মানুকে ঘেঁষতে দেন না কেন? কেন ডিসি সাহেবদের কাছে যেতে আতঙ্ক বোধ করেন তারা? কেন প্রত্যেক জেলা প্রশাসক তার এলাকার গণমানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে মাসে অন্তত একবার বৈঠক করতে পারেন না? মোটকথা, প্রতিটি জেলার ডিসিদের যেকোনো সময়ে যেকোনো নাগরিকের সঙ্গে কথা বলার, অভাব-অভিযোগ শোনার মন-মানসিকতা অর্জন করতে হবে। কোথাও কোথাও এরকম পরিস্থিতি কিছুটা রয়েছে বলে কোনো কোনো জেলা প্রশাসন দাবি করলেও দুঃখজনক সত্য হলো, সারা দেশের সব জেলায় তা নেই।
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী আমলের আমলাদের গড়ে ওঠা মনমেজাজ সহসাই বদলানো অতটা সহজ নয়। আর শিক্ষা-দীক্ষার দম্ভ এবং অহংকারের সংস্কৃতি রাতারাতি বদলানোও বেশ কঠিন কাজ। কিন্তু সব পক্ষের চেষ্টায় একটা প্রকৃত জনবান্ধব জনপ্রশাসন কি গড়ে তুলতে পারব না আমরা? এটা আমাদের সবার দেশপ্রেমের দায়। আর এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব ও অন্যসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে কঠোর পরিশ্রম ও মেধা বিনিয়োগ করতে হবে।
আমাদের ৬৪ জেলা প্রশাসকের প্রত্যেকে যেদিন নিজ নিজ জেলায় সত্যিকার অর্থে জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে পারবেন, তখন তাদের ব্যক্তিগত সন্তুষ্টিও থাকবে তুঙ্গে। আর প্রতিটি জেলার গণমানুষ ধন্য ধন্য করবেন তাদের ডিসিদের নিয়ে। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায় রইলাম।
লেখক: জাতীয় সংসদ সদস্য; বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব এবং সাবেক ডাকসু সাধারণ সম্পাদক





