উচ্ছেদের আড়াই মাস পর ফের বালিয়াড়ি সৈকতে ৪ শতাধিক দোকান

ছবি: আগামীর সময়
মাত্র আড়াই মাস আগে উচ্ছেদ করা হয়েছিল ৯৩০টি অবৈধ স্থাপনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে আর কোনো দোকান বা স্থাপনা বসতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু সেই নির্দেশনা উপেক্ষিত। পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিকে কাজে লাগিয়ে রাতের অন্ধকারে আবারও দখল করা হয়েছে সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ও ঝাউবাগানের বিস্তীর্ণ এলাকা। গত চার-পাঁচ দিনে সেখানে গড়ে উঠেছে অন্তত চার শতাধিক দোকান ও অস্থায়ী রেস্তোরাঁ।
পরিবেশবিদ ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতার সুযোগে একটি প্রভাবশালী চক্র সৈকতের সংরক্ষিত এলাকা দখল করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করছে। এতে একদিকে যেমন ধ্বংস হচ্ছে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রের সৌন্দর্য।
জানা গেছে, গত ৯ মার্চ জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা ও কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন। এর প্রেক্ষিতে ১২ মার্চ জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে যৌথ বাহিনী সুগন্ধা পয়েন্টের বালিয়াড়িতে গড়ে ওঠা ৯৩০টি দোকান ও স্থাপনা উচ্ছেদ করে। পরবর্তীতে সৈকত পরিদর্শনে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন, উচ্ছেদ হওয়া এলাকায় যেন আর কোনো দোকান না বসে এবং নতুন করে দখলদারিত্ব গড়ে উঠতে না পারে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো চিত্র।
আজ সোমবার দুপুরে সুগন্ধা সৈকত ঘুরে দেখা যায়, যেসব স্থান থেকে মার্চ মাসে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়েছিল, ঠিক সেখানেই আবার সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়েছে শত শত দোকান। সুগন্ধা জামে মসজিদের পাশের বালিয়াড়িতে শতাধিক দোকান গড়ে উঠলেও অধিকাংশের কোনো সাইনবোর্ড বা মালিকের পরিচয় নেই।
দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে শামুক-ঝিনুকের তৈরি সামগ্রী, আচার, পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী, চশমা, চা-কফি, ভাজা মাছসহ নানা পণ্য। অধিকাংশ দোকান ভ্যানগাড়ির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। দোকানিরা জানিয়েছেন, উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার সুবিধার জন্য এমন ব্যবস্থা করা হয়েছে।
একটি দোকানের কর্মচারী নুরুল ইসলাম বলেছেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে দোকানমালিকেরা হাইকোর্টে রিট করেছেন। এরপর আবার দোকান বসানো শুরু হয়েছে। আমাদের দোকানটিও উচ্ছেদের আগে প্রায় ১০ বছর ধরে এখানে ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সৈকত রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের একজন বিচকর্মী জানান, ঈদের আগের রাত থেকেই বালিয়াড়িতে নতুন করে দোকান নির্মাণ শুরু হয়। গত কয়েক দিনে চার শতাধিক দোকান বসানো হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু আইন লঙ্ঘনই নয়, পরিবেশের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। ১৯৯৯ সালে নাজিরারটেক থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করে সরকার। আইন অনুযায়ী জোয়ার-ভাটার সীমা থেকে ৩০০ মিটারের মধ্যে বালিয়াড়িতে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া বালিয়াড়ি রক্ষায় উচ্চ আদালতেরও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ‘সেভ দ্য কক্সবাজার’র সভাপতি তৌহিদ বেলালের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে একটি চক্র বালিয়াড়িতে দোকান বসানোর সুযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সৈকতের প্রবেশমুখে এসব ঝুপড়ি দোকান পর্যটকদের জন্য বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্চে উচ্ছেদের পর যে স্বস্তি ফিরেছিল, ঈদের পর তা আবার নষ্ট হয়ে গেছে।
একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ‘ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস)’র চেয়ারম্যান মুজিবুল হক। তিনি বললেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে আবারও বালিয়াড়ি দখল করা হচ্ছে। এর দেখাদেখি কলাতলী, সিগাল পয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ শুরু হয়েছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
গত শনিবার রাতেও কলাতলী সৈকত ও সিগাল হোটেলের সামনের ঝাউবাগান দখল করে নতুন দোকানপাট বসানোর ঘটনা দেখা গেছে। এমনকি কলাতলী সৈকতের বালিয়াড়িতে সৃষ্ট সাগরলতা বেষ্টিত এলাকাও রেহাই পায়নি। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী রেস্তোরাঁ ও বাজার।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানালেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কয়েক দফা অভিযানে ৯ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। সম্প্রতি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা উচ্চ আদালতে রিট করেছেন। আদালত ব্যাখ্যা চেয়েছেন। রিটের জবাব দেওয়ার পর আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অন্যদিকে কক্সবাজার হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বললেন, প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসেন। সৈকতে নামার সময় বালিয়াড়িতে ঝুপড়ি দোকানের বস্তি দেখে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে নানা অপরাধও সংঘটিত হয়। মার্চে উচ্ছেদের পর সৈকত তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরে পেয়েছিল। কিন্তু এখন আবার পুরোনো দৃশ্য ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের প্রশ্ন— স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রকাশ্য নির্দেশ, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং প্রশাসনের আগের সফল উচ্ছেদ অভিযান থাকার পরও কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যে শত শত দোকান গড়ে উঠল? আর যদি এভাবেই দখলদারিত্ব চলতে থাকে, তবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য কতদিন টিকে থাকবে?






