বাংলাদেশের রাষ্ট্রসংস্কারে মাজোভিয়েস্কির প্রাসঙ্গিকতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ইতিহাসে কিছু নেতা আছেন, যাদের গুরুত্ব শুধু কত দিন তারা ক্ষমতায় ছিলেন, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বরং দেশের কঠিন সময়ে তারা কীভাবে ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন, কীভাবে সংকট মোকাবিলা করেছেন এবং ভবিষ্যতের জন্য কী রেখে গেছেন— সেই বিবেচনায় তারা স্মরণীয় হয়ে থাকেন। পোল্যান্ডের তেমনই একজন নেতা তাদেউশ মাজোভিয়েস্কি। ১৯৮৯ সালে দেশটির প্রথম অ-কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি এমন এক অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন, যা গভীর সংকটে নিমজ্জিত ছিল।
১৯৮৯ সালে পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনানির্ভর অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ব্যর্থ হচ্ছিল। বাজারে পণ্যের ঘাটতি, বাজেটের চাপ, মুদ্রার ওপর আস্থাহীনতা এবং বিপুল বৈদেশিক ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। একদিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির দুর্বলতা, অন্যদিকে মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিক অসন্তোষ— সব মিলিয়ে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়।
মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের অক্টোবরে পোল্যান্ডে ভোক্তামূল্য এক মাসেই ৫৪ শতাংশ বেড়ে যায়। বছরের শেষ দিকে দেশটি কার্যত অতিমাত্রার মূল্যস্ফীতির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের বোঝা ১৯৮৯ সালের শেষে প্রায় ৪০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী হন মাজোভিয়েস্কি। তিনি পোল্যান্ডের গণতন্ত্রপন্থী ‘সলিডারিটি’ আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৮১ সালে সামরিক আইন জারির পর কারাবরণও করেছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এসে তিনি প্রতিশোধকে প্রধান লক্ষ্য করেননি; বরং তার অগ্রাধিকার ছিল অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটানো এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য নতুন ভিত্তি তৈরি করা।
পোল্যান্ডের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কেন্দ্রে ছিল অর্থমন্ত্রী লেশেক বালসেরোভিচের পরিকল্পনা। ১৯৯০ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া এই সংস্কার কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘদিনের অকার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো ভেঙে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করা।
এই রূপান্তরের মূল্যও ছিল যথেষ্ট। ১৯৯০ সালে উৎপাদন কমে যায়, প্রকৃত মজুরি হ্রাস পায় এবং বেকারত্ব বাড়তে শুরু করে। পুরনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল বহু প্রতিষ্ঠান নতুন প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে চাপে পড়ে। তাই পোল্যান্ডের অভিজ্ঞতাকে শুধু সংস্কারের সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি একই সঙ্গে দেখায়, সংকট মোকাবিলায় শুধু সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেই হয় না; সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং ক্ষমতার প্রতিটি স্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে
বাংলাদেশ আর ১৯৮৯ সালের পোল্যান্ড এক নয়। দুই দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। তবু কঠিন সময়ে জাতীয় পুনর্গঠনের বিষয়টি দুই দেশের জন্যই প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশের সামনে এখন একাধিক চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মানুষ চায়, রাষ্ট্র যেন তাদের কথা শোনে এবং ন্যায্য সেবা পেতে অযথা হয়রানির শিকার হতে না হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তুলনামূলক অনাড়ম্বর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জনজীবনে সংযমের একটি ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যয় সংযম, সরকারি সুযোগ-সুবিধার যৌক্তিক ব্যবহার এবং জনগণের অর্থের সঠিক হিসাব নিশ্চিত করা গেলে ব্যক্তিগত সংযম প্রশাসনিক সংস্কৃতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারি অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ নয়। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি হতে হবে; দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপরাধ করলে পার পাওয়ার সুযোগ থাকবে না— এসব নীতিবোধ ধারাবাহিকভাবে কার্যকর করা গেলে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ভালো উদ্যোগ; কিন্তু নিজের দলের কেউ অপরাধে জড়ালে তার বিরুদ্ধে একই নীতি প্রয়োগ করাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। এসব সংস্কারের উদ্দেশ্য শুধু প্রশাসনের কাজ সহজ করা নয়; বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রকৌশল, আধুনিক উৎপাদনব্যবস্থা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে তরুণদের দক্ষ করে তোলা জরুরি। শুধু ডিগ্রি অর্জন যথেষ্ট নয়; এমন দক্ষতা দরকার, যা দিয়ে তারা দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবেন এবং নতুন ব্যবসা গড়ে তুলতে পারবেন। এতে অল্প কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভিত আরও মজবুত হবে।
মাজোভিয়েস্কির উত্তরাধিকারও শুধু তার ব্যক্তিগত সংযম কিংবা কঠিন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তনকে কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দেওয়া। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য: নেতা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন, কিন্তু সেই দৃষ্টান্তকে স্থায়ী রূপ দিতে পারে শুধু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
পোল্যান্ডের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষা সম্ভবত এটাই— সংকট যত গভীরই হোক; সংযমী নেতৃত্ব, সাহসী কিন্তু বিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা সম্ভব। তবে সেই পরিবর্তনকে টেকসই করতে হলে রাষ্ট্রকে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে, সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং ক্ষমতার প্রতিটি স্তরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একটি দেশ শুধু নতুন নেতৃত্ব পেলে বদলে যায় না; দেশ বদলায় যখন রাষ্ট্রের কাজের ধরন বদলে যায়।
লেখক: ব্যাংকার ও কলাম লেখক



