মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে ঝরে পড়ার সংকট

দেশে বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট ও সমমানের পরীক্ষা চলছে, যা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের আগের সর্বশেষ ধাপ। একসময় পাবলিক পরীক্ষায় নকল এবং পরে প্রশ্নপত্র ফাঁস বড় সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছিল। সেসব সমস্যা সমাধানের পর আসে গণপাস ও জিপিএ ৫-এর জোয়ার এবং অটোপাসের ধাক্কা। এসব সংকট কাটিয়ে দেশ যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই শিক্ষাব্যবস্থার নতুন সংকট হিসেবে হাজির হয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া। অথচ বিগত বছরগুলোতে দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাপক আয়োজন ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু যাদের দক্ষ করে দেশের হাল ধরার কথা, তাদের বড় একটি অংশ মাঝপথেই হারিয়ে যাচ্ছে। এই মূল সংকটের দিকে নজর না দিয়ে আমরা মেতেছি জেলায় জেলায় পাবলিক-প্রাইভেট ও বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অনুমোদনের প্রতিযোগিতায়। তারা কোথায়, কীভাবে ও কেন হারিয়ে যাচ্ছেন— আমরা সে প্রশ্ন করছিও না; প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছি না। এরই মাঝে আমরা প্রতিযোগিতায় নেমেছি জেলায় জেলায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়ায় এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অনুমোদনে।
স্বাধীনতার পর মাত্র ছয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে গর্ব করত, আজ প্রায় দুইশ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষার সেই মর্যাদা ধরে রাখতে পারছে না। বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৫৯টি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৬টি। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং ক্যান্টনমেন্টের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ২ হাজার ২৮৩টি কলেজে প্রায় ৩২ লাখ শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্স ও ডিগ্রি কোর্সে পড়ছেন। দেশের তরুণদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের গৃহীত উদ্যোগের কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে প্রশ্ন জাগে— কাদের জন্য এই বিশাল আয়োজন? যাদের জন্য এই ব্যবস্থা, তারা যদি উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পার হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে, তবে নীতিনির্ধারকদের এই বিপুল আয়োজন কার জন্য?
ফরম পূরণের বাইরেও মূল পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা অনেক বেশি। প্রথম পরীক্ষার দিনই তিন বোর্ড মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল, যা সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশগ্রহণের লক্ষ্যে নবম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল প্রায় ১৯ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু ফরম পূরণ করেছে মাত্র ১৪ লাখ ৫০ হাজার, অর্থাৎ নবম-দশম শ্রেণিতেই সাড়ে চার লাখ শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। আবার ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৩ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেছে পৌনে ১১ লাখের মতো। কারিগরি শিক্ষা মিলিয়েও একাদশ শ্রেণিতে ঝরে গেছে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থী।
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার চিত্রটি মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য আরও বেশি উদ্বেগের। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষার জন্য ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ, অর্থাৎ পরীক্ষার আগেই বাদ পড়ে গেছে সাড়ে পাঁচ লাখের বেশি শিক্ষার্থী। সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে রেজিস্ট্রেশন করা ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬১ জনের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪৭৭ জন; ঝরে পড়ার হার ৩৩.০৪ শতাংশ। মাদ্রাসা বোর্ডে ঝরে পড়ার হার ৪৪.০৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এই চিত্র সবচেয়ে আশঙ্কাজনক, সেখানে রেজিস্ট্রেশন করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪.৫৮ শতাংশই ফরম পূরণ করেনি। ফরম পূরণের বাইরেও মূল পরীক্ষায় অনুপস্থিতির সংখ্যা অনেক বেশি। প্রথম পরীক্ষার দিনই তিন বোর্ড মিলিয়ে প্রায় ৩২ হাজার পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল, যা সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
শিক্ষার্থীদের এই মাঝপথে হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কোনো একক কারণ নেই, একেকজনের ক্ষেত্রে গল্পটা একেক রকম। বিগত সরকারগুলোর আমলের গণপাস ও অটোপাসের সংস্কৃতি এর জন্য অনেকাংশে দায়ী। আগে প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলেও শিক্ষার্থীরা যেনতেনভাবে পাস করে যেত। কিন্তু এখন যখন সত্যিকার মূল্যায়নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তখন পরীক্ষা-ভীতি ও প্রস্তুতির অভাবে অনেকেই পরীক্ষা না দেওয়াকে নিরাপদ মনে করছে। এ ছাড়া এশিয়ায় বাল্যবিয়ে ও আগাম বিয়েতে আমরা শীর্ষে। ২০২৩ সালের জনমিতি জরিপ অনুযায়ী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর ৪২ শতাংশ এবং মেয়ে শিক্ষার্থীর ৭১ শতাংশই বিয়ের কারণে পড়ালেখা থেকে ছিটকে পড়েছে।
অর্থনৈতিক দারিদ্র্য আমাদের শিক্ষার পথে চিরাচরিত বাধা, যার কারণে গ্রামাঞ্চলে ঝরে পড়ার হার বেশি। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা শেষ করেও সম্মানজনক চাকরির অভাব আরেকটি বড় কারণ। অনেক অভিভাবক ভাবেন, বছরের পর বছর অর্থ ও শ্রম খরচ করে বেকার থাকার চেয়ে এখনই কাজে ঢুকে পড়া ভালো। বিদেশমুখিতা ও আগাম স্বনির্ভর হওয়ার অলীক স্বপ্নও অনেক তরুণকে মাঝপথে থামিয়ে দিচ্ছে। এ ছাড়া পরিবেশ বিপর্যয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং কলেজে নির্বাচনী পরীক্ষায় অতিরিক্ত কড়াকড়ি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে (জুলাই ২০২৪-এর পর) শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি এবং পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের সংকটও এই হারকে ত্বরান্বিত করেছে। এ ছাড়া হাওর, চা বাগান ও পাহাড়ি সীমান্ত এলাকায় এই সমস্যা দীর্ঘদিনের।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে হলে এই সংকটের কার্যকর সমাধান জরুরি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সরকার এবং দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে এই সমস্যার মূলোৎপাটন করতে হবে।
লেখক: ভাইস চ্যান্সেলর, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট




