নারীরা অদৃশ্য হয়ে গেলেন কেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে নারীর বলিষ্ঠ অংশগ্রহণ দেখে সবাই ভেবেছিল এইবার রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীর পদচারণা জোরালো হবে। সেইসাথে জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনা ও নীতি নির্ধারণে নারীর ভূমিকা থাকবে দৃশ্যমান ও কেন্দ্রীয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি হলো ভিন্ন। নতুন বন্দোবস্তের রাজনীতিতে নারীর সুযোগ সীমিত হয়ে গেল। মিছিল, মিটিংয়ে অংশ নেওয়া, রাজপথ কাঁপানো নারীরা দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। জুলাই আন্দোলনের সেই নারী নেতৃত্বের বড় একটি অংশ রাজপথ, সংগঠন, এমনকি জনপরিসর থেকেও নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলেন।
কিন্তু কেন? আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী প্রথম সারির নারীরা বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাতকারে স্বীকার করেছেন, অনলাইন ও অফলাইনে নারীদের লক্ষ্য করে ট্রল, গালাগালি এবং সাইবার বুলিংয়ের প্রবণতা বেড়েছে। নারীর চুল ধরে টানা, শরীরে আঘাত করা, আজেবাজে গালি ছুঁড়ে দেওয়া— সবই হয়েছে চব্বিশ পরবর্তী সময়ে। ইদানিং এই প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এসব আক্রমণের সময় তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা পুরুষ সদস্যরা কেউ এগিয়ে আসেননি।
নিজেদের ‘তৌহিদী জনতা’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া একটি গোষ্ঠী নারীদের ওপর ‘নৈতিক পুলিশিং’-এর নামে হয়রানি ও আক্রমণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এদেশে এরকম ঘটনা নতুন নয়; তবে ২০২৪-এর আগস্টের পর ‘তৌহিদী জনতা’র নামে নারীদের ওপর নৈতিক পুলিশিং ব্যাপকহারে বেড়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে নারী জাগরণ নিয়ে যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত ফিকে হয়ে গেছে। নতুন রাজনীতি ও সংস্কারের কথা বলে সেই পুরনো বন্দোবস্তই জারি থাকল। আন্দোলনের সময় যে সাহস ও ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছিল, বিজয়ের পর তার স্বীকৃতি মেলেনি।
নারী অধিকার কর্মীরা বলেছেন, উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো, নারী বিদ্বেষের কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হলেও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে তারা সহজেই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। ওইসব আচরণ ন্যায্যতা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সামাজিকভাবে সমর্থন করার ঘটনাও ঘটেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ বা ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা, যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
এমনকি ‘নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশন’ বাতিলের দাবিতে মিছিল ও আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল কিছু সংগঠন। জনপরিসরে নারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং নারীদের ‘বেশ্যা’ বলে সম্বোধন করতেও দ্বিধাবোধ করেনি। এমন ভাষার প্রয়োগ ক্রমবর্ধমান রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়ার উদাহরণ।
নারীর চুল ধরে টানা, শরীরে আঘাত করা, আজেবাজে গালি ছুঁড়ে দেওয়া— সবই হয়েছে চব্বিশ পরবর্তী সময়ে। ইদানিং এই প্রবণতা লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে গেছে। তারা অভিযোগ করেছেন, এসব আক্রমণের সময় তাদের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা পুরুষ সদস্যরা কেউ এগিয়ে আসেননি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের চেয়ারপারসন শিরীন পারভীন হক বলেছেন, ‘জুলাই আন্দোলনে নারীরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তাদের সামাজিক অবস্থানে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘এখন অনেক পুরুষই নিজেকে নারীর অভিভাবক মনে করেন এবং নারীর পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার প্রবণতা বেড়েছে।’
কেন এমন হলো, এর জবাবে শিরীন হক বলেছেন, আন্দোলনটি যখন ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে গেল, তখন নারীরা আস্তে আস্তে দৃশ্যমানতা হারিয়ে ফেলল। মেয়েরাই অভিযোগ করেছেন তাদের থাকতে দেওয়া হয়নি। তাদের রীতিমতো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি মনে করেন, পুরুষ-আধিপত্যের যে বাস্তবতা, সেখানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি।
এমনিতেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলে নারীদের জায়গা করে নেয়া সহজ নয়। এর ওপর যখন সমাজ বৈরী থাকে এবং পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতিপত্তি প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে, তখন রাজনীতিতে নারীর এগিয়ে যাওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়ে। জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিসরে যেহেতু নারীরা অসম্মানিত হয়েছেন এবং প্রাপ্য স্থান পাননি, তাই তারা নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন।
নারীকর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন যে নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল না, মতামত প্রকাশের জায়গাও ছোট হয়ে আসছিল এবং বেড়ে যাচ্ছিল পুরুষ নেতাদের প্রাধান্য। কেউ কেউ বলেছেন, একটা সময় তাদের মনে হয়েছিল যে তারা ব্যবহৃত হচ্ছেন বা হয়েছেন।
এমনকি পরবর্তীতে যখন সংস্কার কমিশন গঠনের কাজে হাত দেওয়া হয়, তখনও দেখা গেছে কমিশনের প্রধান হিসেবে পুরুষ সদস্যরাই অগ্রাধিকার পেয়েছেন। এমনকি নারী ইস্যুকেও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। নারী সংস্কার কমিশন যখন তাদের রিপোর্ট পেশ করল, তা এক ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের উপস্থাপিত কোনো সুপারিশও গ্রহণ করা হয়নি।
বাংলাদেশে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা ৩৩ বছর নারী নেতৃত্বে ছিলেন। অথচ এরপরেও নারীরা রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত অবস্থানে আসতে পারেননি। জুলাই আন্দোলনে নারীরা এগিয়ে আসায় আলো দেখা গিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এই রক্ষণশীল সমাজ নারীর নেতৃত্ব মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত? এই সমাজ সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও রক্ষণশীল এবং নারী-পুরুষদের একটা বড় অংশ নারী বিদ্বেষী।
চব্বিশে নারীরা এত উচ্চকিত থাকার পরেও চুপসে গেলেন, কারণ এই সমাজ এখনও মনে করে রাজনীতি ‘পুরুষের কাজ’। রাজনীতির ময়দান নারীর জন্য নয়। চব্বিশের আগে রাজনীতিতে নারীর টিকতে না পারার কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণু কাঠামো এবং নিরাপত্তাহীনতা। চব্বিশের পরে এর সাথে এখন যোগ হয়েছে নারীর চরিত্র হনন ও অপপ্রচার।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, রাজনৈতিক পুনর্গঠন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় নারীদের কোণঠাসা করা হয়েছে। আন্দোলন পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী এনসিপি থেকে ঝরে পড়ছেন। মাত্র দু’বছরের মধ্যে কী এমন ঘটল যে তাদের বের হয়ে আসতে হলো। অনেকে বলছেন মেয়েরাই আর থাকতে চাইছেন না। আসলে লড়াইয়ের ময়দানে নিজের দলই নারীকে স্পেস দিতে চায়নি।
২০২৪ পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী হয়রানি ও নৈতিক পুলিশিংয়ের যে ঘটনা দেখা যাচ্ছে, সেটা শুধু উদ্বেগজনক পরিসংখ্যানেরই প্রতিফলন নয়; বরং হিংসাত্মক সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরছে। এখন নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার দাবি একদিকে, অন্যদিকে সমাজের একটা অংশের কঠিন রক্ষণশীল বাধা।
পিতৃতন্ত্র, ধর্ম নিয়ে কিছু মানুষের বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা, নারীকে কোণঠাসা করার চেষ্টা এবং মবকেন্দ্রিক অস্থিতিশীলতা সবকিছু মিলেই নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখছে।
এত বড় একটি আন্দোলন ও অভ্যুত্থানের পর অনেকেই ভেবেছিলেন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে এবং নানা সংস্কার করা সম্ভব হবে। কিন্তু পরে দেখা গেছে বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন নেতিবাচক ঘটনায় নারীর অবস্থান আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক





