প্রত্যাশা ও বাস্তবতার কঠিন সমীকরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জাতীয় বাজেট শুধু অর্থ মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক আর্থিক দলিল নয়। এটি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, অর্থনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি এক বিশেষ সময়ে ঘোষিত হয়েছে। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও রাজস্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশাও এখন অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে সরকার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করেছে। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি এবং ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য ধরা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ লক্ষ্যগুলো কতটা বাস্তবসম্মত? আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই বাজেট কি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে পারবে, নাকি এটি শুধু উচ্চাভিলাষী সংখ্যার সমষ্টি হয়ে থাকবে?
গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল থাকায় মধ্য ও নিম্নবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুধু বাজেট ঘোষণার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ চেইনের দক্ষতা, উৎপাদন বৃদ্ধি, মুদ্রানীতির সমন্বয় ও রাজস্ব সংস্কার প্রয়োজন। অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতায় বেসরকারি বিনিয়োগের গতি ধীর। উদ্যোক্তারা উচ্চ সুদহার, জ্বালানির অনিশ্চয়তা ও নীতিগত জটিলতার কারণে সতর্ক অবস্থানে আছেন। প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পও আন্তর্জাতিক বাজারে চ্যালেঞ্জের মুখে। তাই প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে শুধু উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো যথেষ্ট নয়, নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করতে হবে।
বাজেটের আকার বাড়লেও বাস্তবায়নের ইতিহাস আশাব্যঞ্জক নয়। বছর শেষে দেখা যায়, অনেক প্রকল্পে বরাদ্দ থাকলেও কাজ শেষ হয় না। তাই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়, বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর-জিডিপি অনুপাতের নিম্ন স্তর বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা। বিপুল জনগোষ্ঠী কর কাঠামোর বাইরে থাকায় নিয়মিত করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কথা বলা হলেও তা কতটা কার্যকর হবে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
এই বাজেটকে শুধু সংখ্যার দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি পরীক্ষা। সরকার কি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে? জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কি বাড়বে?
এবারের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধেই ১ লাখ কোটির বেশি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আয়ের বড় অংশ পুরনো ঋণের দায় মেটাতে চলে গেলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ কমে যায়। এ ছাড়া বাজেটের ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি বাজেটের চূড়ান্ত সফলতা নির্ধারিত হয় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান দিয়ে। মানুষ সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকের চেয়ে নিত্যপণ্যের দামকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হলেও তা কতটা লক্ষ্যভিত্তিক হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও সে তুলনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণ জরুরি।
মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, সেবার মান বাড়াতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কর ছাড়ের পাশাপাশি নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
আমাদের বাজেট ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো নির্মাণকে উন্নয়নের প্রধান সূচক ধরা হয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রযুক্তিই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যাগত সুবিধার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে তা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, কারণ ডিগ্রির সঙ্গে কর্মবাজারের দক্ষতার মিল নেই। বিশ্ব অর্থনীতি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর চেয়ে সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।
কৃষি খাতও জলবায়ু পরিবর্তন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকির মুখে। কৃষিকে লাভজনক করতে হলে শুধু ভর্তুকি নয়, বাজার সংস্কার ও আধুনিক সরবরাহব্যবস্থা প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশের উন্নয়ন দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে রয়েছে। আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন।
বাজেট বাস্তবায়নের পেছনে রাজনৈতিক সক্ষমতাও জরুরি। করের আওতা বাড়ানো বা ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরার মতো অনেক প্রয়োজনীয় সংস্কার সিদ্ধান্ত জনপ্রিয় হয় না। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এ কঠিন পদক্ষেপগুলো নিতেই হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারের জ্বালানি মূল্য ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও এই বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ সালের জাতীয় বাজেট এমন একসময়ের বাজেট, যখন বাংলাদেশকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির নতুন উৎস খুঁজে বের করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, মানবসম্পদ উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। বাজেট সে লক্ষ্যগুলোর একটি রূপরেখা দিয়েছে; কিন্তু রূপরেখা কখনোই গন্তব্য নয়।
এই বাজেটকে শুধু সংখ্যার দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি পরীক্ষা। সরকার কি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারবে? জনগণের ক্রয়ক্ষমতা কি বাড়বে? বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কি নতুন গতি পাবে? আগামী এক বছর সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে।
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও মিডিয়াব্যক্তিত্ব




