আমরা কি শ্বাস নিচ্ছি বিষাক্ত বাতাস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকায় বসবাসরত কোটি মানুষের জন্য পরিষ্কার বাতাস এখন পরিণত হয়েছে বিলাসী বস্তুতে। ঘন ধোঁয়া, ধুলোময় সড়ক আর ধোঁয়ার গন্ধে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে ঢাকার দৈনন্দিন জীবন। বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় বারবার উঠে আসা এই নগরী এখন এক গভীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত কয়েক বছরে ঢাকার বায়ুমান নিয়মিতভাবেই ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ মাত্রায়; বিশেষ করে শীতকালে, নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। অনেক সময় দূষণের মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) নির্ধারিত নিরাপদ সীমার বহু গুণ ছাড়িয়ে যায়। আইকিউএয়ারের এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (একিউআই) অনুযায়ী ঢাকার বায়ুমানসংক্রান্ত তথ্য বলছে এসব তথ্য।
ডব্লিওএইচও এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই সংকটের মূল কারণ হলো অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণা (পিএম ২.৫), যা মানুষের ফুসফুসে ঢুকে রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে। ঢাকায় পিএম ২.৫-এর গড় মাত্রা ডব্লিওএইচওর নির্দেশিত সীমার ১০ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া গেছে।
দূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়লাভিত্তিক ইটভাটা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, সড়ক ও নির্মাণস্থলের ধুলোবালি এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য-ধোঁয়া। ইটভাটাই ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস— শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট এবং ‘স্মার্ট এয়ার’-এর ঢাকায় বায়ুদূষণের কারণ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে এ তথ্য।
চিকিৎসকদের মতে, ঢাকার দূষিত বাতাসের কারণে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ফুসফুস ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বায়ুদূষণ বাংলাদেশে প্রতিবছর লক্ষাধিক অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী, যার বড় একটি অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক, যা উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বেগম বি এ ও তার সহকর্মীদের গবেষণায়।
বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশে বায়ুদূষণের জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব শীর্ষক প্রতিবেদন এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের বায়ুদূষণ ও শিশুর স্বাস্থ্য শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দূষিত বাতাসের কারণে কম ওজনের শিশু জন্ম, অপরিণত প্রসব এবং শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি হয়।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের (সিআরইএ) গবেষণা এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বায়ুদূষণ বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর হুমকি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং অসুস্থতার কারণে কর্মদিবস নষ্ট হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর জিডিপির কয়েক শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হয়।
নিম্ন আয়ের পেশাজীবীরা, বিশেষ করে রিকশাচালক, দিনমজুর ও নির্মাণশ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছেন, কারণ তারা দিনের বেশির ভাগ সময় খোলা বাতাসে কাজ করতে বাধ্য হন। ডেইলি স্টারে প্রকাশিত পরিবেশ ও বায়ুদূষণবিষয়ক প্রতিবেদন এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পরিবেশবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণ ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
সরকার বায়ুদূষণ রোধে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা, জাতীয় বায়ুমান ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, পুরনো ইটভাটা আধুনিকায়ন, বৈদ্যুতিক বাস চালু এবং ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ২০২৬ সালে ঢাকাকে ‘পরিষ্কার ও সবুজ রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তুলতে ১২ দফা কর্মপরিকল্পনাও ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরিবেশবিদদের মতে, দুর্বল প্রয়োগ ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে প্রত্যাশিত সুফল এখনো পুরোপুরি মিলছে না। আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষণ এবং বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কান্ট্রি এনভায়রনমেন্টাল অ্যানালাইসিস প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বলা হয়েছে, বায়ুদূষণ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ সমস্যাগুলোর সমাধানে আমরা ব্যর্থ হলে, ঢাকা শহরে প্রতিটি নিশ্বাসের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকবে এক অদৃশ্য বিষ, যা আর অবহেলা করার সুযোগ নেই।
লেখক
অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী পরিবেশ কর্মী
ইমেইল: banu_nargis@hotmail.com



