বাংলাদেশে রাজনৈতিক দখলে বিশ্ববিদ্যালয় বিকশিত হতে পারে না

বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এমন এক পরিসর, যেখানে ধারণার যাচাই হয়, জ্ঞান সৃষ্টি হয় এবং তরুণ প্রজন্ম জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রস্তুতি নেয়। এটি এমন কোনো ক্ষেত্র হতে পারে না, যেখানে ভয়, গোষ্ঠীগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দলীয় নিয়ন্ত্রণ শিক্ষার পরিবেশকে গ্রাস করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও এমন এক অস্বস্তিকর বাস্তবতাই বিদ্যমান।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান ও পরিবেশ প্রায়ই সেই দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে নির্ধারক ভূমিকা রাখে। যেসব দেশ উদ্ভাবন, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় এগিয়ে, তারা তা কেবল কাকতালীয়ভাবে অর্জন করেনি। তারা এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠ, গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করতে পারেন। তাদের ক্যাম্পাস কৌতূহল, শৃঙ্খলা ও উৎকর্ষচর্চার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
পূর্ব এশিয়ার দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কঠোর একাডেমিক মনোযোগ ও পরিশ্রমী সংস্কৃতির জন্য সুপরিচিত। ইউরোপে জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ধারাবাহিকভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে কুড়ির কোঠার তরুণরা স্টার্টআপ গড়ে তুলছে, রোবোটিকস নিয়ে কাজ করছে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে অবদান রাখছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এগিয়ে নিচ্ছে এবং উচ্চ প্রতিযোগিতাপূর্ণ ডক্টরাল প্রোগ্রামে অংশ নিচ্ছে।
রাজনীতি, ইতিহাস ও সমাজব্যবস্থায় এসব দেশের মধ্যে পার্থক্য আছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্নে তারা একমত- বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় উন্নয়নের চালিকাশক্তি, কোনো দলীয় দখলদারির ক্ষেত্র নয়।
বাংলাদেশেও মেধার অভাব নেই। আমাদের শিক্ষার্থীরা সক্ষম, উচ্চাভিলাষী এবং সম্ভাবনাময়। কিন্তু তাদের অনেকেরই অভাব এমন একটি একাডেমিক পরিবেশের, যেখানে সেই সম্ভাবনা পূর্ণ বিকাশ লাভ করতে পারে। যখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে একই বয়সী শিক্ষার্থীরা গবেষণার ভিত্তি গড়ে তুলছে, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তখন আমাদের বহু শিক্ষার্থীকে এমন এক ক্যাম্পাস-সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে এগোতে হয়, যা দলীয় আনুগত্য, ভয়ভীতি ও সংঘাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এর ক্ষতি যেমন তাৎক্ষণিক, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি। যে সময় শ্রেণিকক্ষ, গ্রন্থাগার ও গবেষণাগারে ব্যয় হওয়ার কথা, তা নষ্ট হয়ে যায় উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তায়। একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, গুরুতর জ্ঞানচর্চা গতি হারায়, গবেষণার সংস্কৃতি দৃঢ় হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে ওঠে, আর স্বাধীন চিন্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নেরও সংকট।
কোনো দেশই বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা বা শিল্পখাতে এগিয়ে যেতে পারে না, যদি তার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভয় ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চক্রে বন্দি থাকতে দেওয়া হয়। আমরা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার কথা বলতে পারি না, যদি সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অবহেলা করি, যাদের মূল দায়িত্ব জ্ঞান সৃষ্টি করা। আমরা আমাদের তরুণদের সম্ভাবনা নিয়ে গর্ব করতে পারি না, যদি তাদের সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতা না দিই।
একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি সেই প্রতিটি শিক্ষার্থীর, যে আশা নিয়ে সেখানে প্রবেশ করে; সেই প্রতিটি শিক্ষকের, যিনি সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন; এবং সেই প্রতিটি নাগরিকের, যিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জ্ঞান, নেতৃত্ব ও উদ্ভাবন প্রত্যাশা করেন। এর আবাসিক হলগুলো ভয়ভীতির কেন্দ্র হতে পারে না। এর শ্রেণিকক্ষ দলীয় পেশিশক্তির ছায়ায় ঢেকে যেতে পারে না। এর প্রশাসন এমন কোনো চর্চা মেনে নিতে পারে না, যা উৎকর্ষের চেয়ে আনুগত্যকে পুরস্কৃত করে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়কে নীরব থাকতে হবে, কিংবা বৃহত্তর বৌদ্ধিক অর্থে অরাজনৈতিক হতে হবে। বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে হতে হবে বিতর্ক, মতভেদ ও সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের প্রাণবন্ত ক্ষেত্র। শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করবে, জনজীবনের বিষয়ে ভাববে, রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করবে। শিক্ষকরা উৎসাহ দেবেন মুক্ত আলোচনা ও স্বাধীন চিন্তাকে। কিন্তু ধারণা-সজীব একটি ক্যাম্পাস এবং দলীয় আধিপত্যে বন্দি একটি ক্যাম্পাস—এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। বৌদ্ধিক মতভেদ বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী করে, সংগঠিত জবরদস্তি তাকে দুর্বল করে।
অতএব, আমাদের সামনে করণীয় পরিষ্কার। বিশ্ববিদ্যালয়কে তার যথার্থ ভূমিকায় ফিরিয়ে আনতে হবে—স্বাধীনতা, জ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কারের ক্ষেত্র হিসেবে। এর অর্থ হলো শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি থেকে সুরক্ষা দেওয়া, ক্যাম্পাসজীবনে দলীয় হস্তক্ষেপ কমানো, একাডেমিক সুশাসন শক্তিশালী করা এবং গবেষণা অবকাঠামোয় গুরুত্বসহকারে বিনিয়োগ করা। একই সঙ্গে শিক্ষকদের ও গবেষকদের মূল্যায়ন করতে হবে তাঁদের কাজের ভিত্তিতে, দলীয় অবস্থানের ভিত্তিতে নয়। সর্বোপরি, আমাদের মেনে নিতে হবে একটি সহজ সত্য- যে দেশ উদ্ভাবন চায়, তাকে আগে এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মুক্তচিন্তার বিকাশ সম্ভব।
বাংলাদেশের তরুণরা বর্তমান অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো কিছু প্রাপ্য। তারা এমন ক্যাম্পাসের অধিকারী, যেখানে তারা সাহসের সঙ্গে ভাবতে পারবে, মনোযোগ দিয়ে পড়তে পারবে এবং ভয়হীনভাবে স্বপ্ন দেখতে পারবে। তারা এমন বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়ার যোগ্য, যা আনুগত্যের বদলে সৃজনশীলতাকে, ভয়ভীতির বদলে অনুসন্ধানকে এবং গোষ্ঠীভক্তির বদলে উৎকর্ষকে উৎসাহিত করে। দেশও এমন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার যোগ্য, যা গবেষক, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও নেতা তৈরি করবে—এমন স্নাতক নয়, যারা যাত্রা শুরুর আগেই সংঘাতের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এখনও ভিন্ন পথ বেছে নেওয়ার সময় আছে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত নিতে হলে আগে আমাদের সৎ হতে হবে। স্বীকার করতে হবে যে, ক্যাম্পাসজীবনের রাজনৈতিককরণ আমাদের ওপর বড় মূল্য চাপিয়েছে। বুঝতে হবে, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া প্রতিটি মেধাবী শিক্ষার্থী জাতির জন্য একেকটি বড় ক্ষতি। এবং অনুধাবন করতে হবে, ক্যাম্পাসের সংঘাতে অপচয় হওয়া প্রতিটি বছর আসলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ থেকেই চুরি হয়ে যাওয়া একটি বছর।
আমরা যদি রাজনীতিকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গ্রাস করতে দিই, তাহলে আমরা সময়, মেধা ও সম্ভাবনা হারাতেই থাকব। কিন্তু যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের প্রকৃত কাজ করার স্বাধীনতা দিই, তাহলে হয়তো আমরা সেই ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারব, যার কথা আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছি।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, চুয়েট, রুয়েট ও ইউএসটিসি, বাংলাদেশ















