মাজারের দিঘিতে কুমিরকেও থাকতে হবে

মাজার, ষাট গম্বুজ মসজিদ, কুমির এবং দিঘিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই
আমাদের বাগেরহাটের লোকদের সারা দেশের মানুষ মনে করে— বাঘেদের ঘনিষ্ঠ লোক। আসলে আমাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল কুমিরের সঙ্গে; সুন্দরবনের কুমির নয়, দিঘির কুমির।
ছোটবেলা থেকে আমরা হযরত খানজাহান আলী (র.)-এর মাজারসংলগ্ন কুমিরের সঙ্গে আপনজনের মতোই বড় হয়ে উঠেছি। এই দিঘির কুমিরকে আমাদের কখনোই হিংস্র কোনো প্রাণী মনে হয়নি। অন্তত আমাদের শৈশব, কৈশোরে তাদের হিংস্রতার কোনো গুজবও কখনো শোনা যায়নি। তাদের সঙ্গে লোকেরা ছবি তুলত, ডাক দিলে ডাঙার কাছে চলে আসত; তারা আসলেই বাগেরহাটের নাগরিক ছিল।
অথচ আজ সেই মাজারসংলগ্ন দিঘি থেকে শেষ কুমিরটিকে বাধ্য হয়ে সরিয়ে নিল প্রশাসন। কুমিরটির আচরণ এবং তাকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগে শেষ এই কুমিরটি একটি কুকুরকে আক্রমণ করে ভাইরাল হয়েছিল। দিনতিনেক আগেও এক শিশুকে আক্রমণ করে মেরে ফেলেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে কুমিরটিকে সরানোই আপাতত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটাই আমরা বাগেরহাটবাসী মনে করছি, মাথা কেটে ফেলার মতো অমানবিক।
হ্যাঁ, দিঘির এই কুমিরটি সেই আদিকালের কুমিরের বংশধর বা প্রতিনিধি নয়। মাজারসংলগ্ন এই দিঘিতে কুমিরের বসবাস সেই অজানা অতীত থেকেই। কথিত আছে, হযরত খানজাহান আলী (র.) নিজেই কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় নামে দুটি কুমিরকে এই দিঘিতে অবমুক্ত করেছিলেন। কালক্রমে তাদের বংশধররাই ২০০৫ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিল।
২০০৫ সালে ধলাপাহাড়ের মৃত্যুর পর থেকেই মূলত জটিলতা শুরু হয়; ধলাপাহাড় ছিল খানজাহান আলী (র.)-এর সময়ের কুমিরের শেষ প্রতিনিধি। এই কুমিরটি মারা যাওয়ার পর একটা বিরাট বিভ্রাট তৈরি হলো— কুমিরের জন্য বিখ্যাত এই দিঘিতে কী তাহলে কুমির থাকবে না? খুব জটিল সমস্যা। কারণ এই লোনা অঞ্চলে এমন মিঠা পানির কুমির তো ততদিনের দিঘির বাইরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা, আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার) মিঠা পানির কুমিরকে বাংলাদেশ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করে ২০০০ সালে। যদিও বিলুপ্ত ঘোষণা করার আগে এই ধরনের কুমির বাংলাদেশের জলাধারগুলোতে শেষবার দেখা গিয়েছিল ১৯৬২ সালে। মূলত অস্ট্রেলিয়া ছাড়া কোথাওই মিঠা পানির কুমির খুব দাপটের সঙ্গে টিকে নেই। ফলে ধলাপাহাড় মারা যাওয়ার পর তাকে প্রতিস্থাপিত করাটা একটা জটিল সমস্যা হয়।
এই সমস্যা সমাধানে ২০০৫ সালে ভারতের একটি প্রাণী প্রজনন কেন্দ্র থেকে এক ঝাঁক কুমির আনা হয় বাগেরহাটে। সেই কুমিরগুলো দিঘিতে অবমুক্ত করার পর শুরুতে বেশ জটিলতা হয়েছিল। বর্ষার সময় বেশ কিছু কুমির বের হয়ে লোকালয়ে উপদ্রব করেছিল; কিছু মানুষ আহতও হয়েছিলেন। তখন মোংলার করমজলে বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কিছু কুমির। আর এই দিঘিতে ছিল ৪টি কুমির। বাকি তিনটি পর্যায়ক্রমে মারা গেছে বা অসুস্থ হয়ে করমজলে ঠাঁই পেয়েছে। সর্বশেষ কুমির ছিল এই সরিয়ে নিয়ে যাওয়া আলোচিত প্রাণীটি।
এখন প্রশ্ন হলো, দিঘি থেকে কুমির সরানো কি ঠিক হয়েছে? এটি একটি বড় দ্বিধার জায়গা। এই ঘটনার পর আমি বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও মাজার পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি গোলাম মো. বাতেনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তিনি বলেছেন, আগে তাদের পরিকল্পনা ছিল ফেন্সিং বা বেড়া দিয়ে ঘাট নিরাপদ রাখা। কিন্তু একটি মানবসন্তান আক্রমণের শিকার হওয়ায় দ্রুত তাকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এরই মধ্যে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কুমিরটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাতে মাজারের খাদেমরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন— এই সমাধান অনেকটা মাথা ব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার মতো। হ্যাঁ, আমরা জানি যে হযরত খানজাহান আলীর (র.) সেই আদি বংশধর এটি নয়। কিন্তু এই কুমির নিজেও তো একটি বিরল প্রাণী।
আমাদের বিষয়টি দুটি দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখতে হবে। প্রথমত, মানুষের নিরাপত্তা সবার আগে। দেশ-বিদেশ থেকে আসা হাজারো দর্শনার্থীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, খানজাহান আলীর মাজার, দিঘি এবং কুমির— এগুলো একে অপরের পরিপূরক এবং বাগেরহাটের ঐতিহ্যের প্রতীক। মানুষ কুমিরটিকে দেখতে চায়, তার ডাকে সাড়া দেওয়া বা দূর থেকে তাকে দেখার অভিজ্ঞতাটি সারা পৃথিবীতে অনন্য। আমাদের দুর্ভাগ্য যে আমরা আদি কুমিরদের রক্ষা করতে পারিনি, কিন্তু যারা আছে তারা তো দুর্লভ। তাই এই প্রতীক নষ্ট করার সুযোগ নেই।
আপাতত নিরাপত্তা বিবেচনায় কুমিরটি সরানো হয়েছে, এটি ঠিক আছে। কিন্তু অনতিবিলম্বে এখানে যথাযথ নিরাপত্তার সঙ্গে কুমিরটিকে পুনর্বাসিত করা দরকার। এক্ষেত্রে মাজারের খাদেম বা ফকির পরিবারের বড় একটি দায়বদ্ধতা রয়েছে। হযরত খানজাহান আলীর (র.) সহচরদের বংশধর হিসেবে তাদের এই দিঘি ও কুমিরের ওপর একটা ঐতিহ্যগত অধিকার রয়েছে। তবে তাদের অত্যন্ত দায়িত্বশীল হতে হবে।
আমি করমজলের বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ডেপুটি রেঞ্জার আজাদ কবিরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বলছেন, কুমির স্বভাবতই হিংস্র। কিন্তু বর্তমান কুমিরটির এই আচরণের পেছনে মানুষের দায়ই বেশি। তবে বিজ্ঞান বলে, মিঠা পানির কুমিররা অন্য যেকোনো কুমিরের চেয়ে মানুষের সঙ্গে বেশি মানিয়ে নেয় এবং কম আক্রমণাত্মক হয়; যদি তাদের কৃত্রিম খাদ্যে আসক্ত না করা হয় এবং আহত না করা হয়।
দিঘির কুমির নিয়ে একধরনের অনৈতিক ব্যবসা যে চলে, তাতো অস্বীকার করার উপায় নেই। এদের প্রদর্শন করে অর্থ আয়ের জন্য তাদের খাদ্যাভ্যাস যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, তা স্বাভাবিক নয়। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে আরও কিছু অনৈতিক আচরণের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া দিঘিতে মাছ ধরতে গিয়ে কুমিরকে আহত করা এবং তার সংবেদনশীল অঙ্গগুলোতে আঘাত করার অভিযোগ রয়েছে। আহত বন্য প্রাণী আরও বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
তাই এই কুমিরকে যত্ন করা, অসাধু উপায়ে প্রদর্শন না করা এবং প্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতামত মেনে চলাই হবে প্রকৃত সমাধান। নিরাপত্তার সঙ্গে আপস না করে, জেলা প্রশাসন এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর চাইলে দিঘির একটি প্রান্ত আলাদা করে ‘কনজারভেটরি’ তৈরি করতে পারে।
এখানে আরেকটি সুখবর হচ্ছে, গত পাঁচ-ছয় বছরে পদ্মার বিভিন্ন অংশে কয়েকটি মিঠা পানির কুমির নতুন করে পাওয়া গেছে। যা বলে, মিঠা পানির কুমির আসলে দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়নি। এমন চারটি কুমির করমজলের প্রজনন কেন্দ্রে আশ্রয়ও পেয়েছে। তারা প্রায় প্রজনন সক্ষম হয়েছে। এদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিঘিতে আনা সম্ভব।
মাজার, ষাট গম্বুজ মসজিদ, কুমির এবং দিঘিকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই। এটি করলে বাগেরহাটের ঐতিহ্যের প্রতি অবিচার হবে।





