অভ্যুত্থান বা যুদ্ধে লুটপাট, ভাস্কর্য ভাঙচুর কেন হয়?

অলংকরণ: অনন্যা প্রমা/আগামীর সময়
নব্বইয়ের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর শাসক পতনের ঢেউ বয়ে যায় বিশ্ব জুড়ে। বাংলাদেশেও পতন হয় ‘স্বৈরাচার’ এরশাদ সরকারের। প্রতিবেশী দেশে উত্থান ঘটে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি)। আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারেও সেই সময়টাতেই পতন হয় জান্তা সরকারের। তবে তৎকালীন এই পতনের ধারায় গণমানুষের আন্দোলন থাকলেও লুটপাট কিংবা ভাস্কর্য ভাঙচুরের মতো খবর ছিল না আলোচনায়।
২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ও গণবিক্ষোভের মুখে রাজাপক্ষে পরিবারের পতন হলেও দেশটির রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে লুটপাটের তেমন কোনো ঘটনা খবরে আসেনি। নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে লড়েছেন আন্দোলনকারীরা, জিতেছেনও। সর্বোচ্চ ক্ষতি এড়ানোর চেষ্টা করেছেন রাষ্ট্রীয় সম্পদের। তারা রাষ্ট্রপতি ভবনে ঢুকেছেন, বিজয় উল্লাস করেছেন আর ছবি তুলে রেখেছেন।
বাইজেন্টাইন সম্রাট লিও তৃতীয় দ্য ইসাউরিয়ান তার আমলে খ্রিস্টীয় প্রতিমার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এর জেরে সে সময়ের খ্রিস্টীয় ভাস্কর্য ভাঙা হয়, যা আইকোনোক্লাজম বা প্রতিমাধ্বংসবাদ নামে পরিচিত। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একে বলা হয় ‘পলিটিক্যাল আইকোনোক্লাজম
২০২৪ সালের আগস্টে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। ৫ আগস্ট গণভবনে বিজয় উল্লাস করতে গিয়ে খালি হাতে ফেরেনি কেউ। শেখ হাসিনা শাসনের স্মৃতি ধরে রাখতে কেউ নিয়েছেন শাড়ি, পুকুরের মাছ, হাঁস কিংবা টাটকা সবজি। বাদ যায়নি টিভি, ফ্রিজ, আসবাব। গণভবনের বাইরেও সারা দেশে ভাঙচুর করা হয়েছে ভাস্কর্য ও ম্যুরাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্যেও চলেছে ভাঙচুর। স্থপতি শামীম শিকদারের এই কারুকার্যে ক্ষোভ মিটিয়েছে একদল বিক্ষোভকারী। বাদ যায়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বীরশ্রেষ্ঠ এবং জাতীয় চার নেতার ম্যুরাল ও ভাস্কর্য।
পরের ঢেউ গিয়েছে নেপালে। সেখানেও রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ নথি, পুরনো লাইব্রেরি নষ্ট করা হয়। রাজধানী কাঠমান্ডুতে ব্যাংক লুট করেছে দুর্বৃত্তরা। রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যাংকের বনেশ্বর শাখায় ডাকাতির কথা বলেছিলেন কর্মীরা সংবাদমাধ্যমে। তবে লুটপাটকারীরা ‘জেন জি আন্দোলনের’ সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলেও দাবি করেছিলেন ব্যাংক কর্মীরা। এ ছাড়া সোশ্যালে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে বিভিন্ন শপিংমল, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালাতে দেখা গেছে।
ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তি তার নিজের পরিচয় বা দায়বদ্ধতা ভুলে যায়। তারা দ্বিধাবোধ করে না সহিংস কাজে লিপ্ত হতে। অনেকের কাছে লুটপাট কেবল চুরি নয়। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’
এরপর আসে ইন্দোনেশিয়ার বিক্ষোভ। শাসক পরিবর্তন না হলেও বিক্ষোভ ছিল তুমুল। এ সময় দেশটির অর্থমন্ত্রীর বাড়িতে করা হয় লুটপাট।
ওপরের ঘটনাগুলো গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তবে সম্প্রতি যুদ্ধক্ষেত্রেও দেখা গেছে একই চিত্র। লেবাননে লুটপাট ও যিশুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা। দক্ষিণ লেবাননে লুটতরাজ চালানোর খবরটি প্রকাশ করেছে ইসরায়েলেরই সংবাদমাধ্যম হারেৎজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ লেবাননের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ইসরায়েলি সেনারা লুট করছে বিপুল সম্পদ। তালিকায় আছে মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, চিত্রকর্ম, সোফা ও কার্পেট। বাহিনীর সিনিয়র ও জুনিয়র সদস্যরা বিষয়টি জানেন। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি তাদের।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে অবশ্য। তবে এসব ঘটনা থামেনি। সেনারা তাদের গাড়ি ভর্তি করছে চোরাই সরঞ্জামে। আর এ কাজ করা হচ্ছে কোনোরকম সংকোচ ছাড়াই। চুরির ঘটনা ঘটছে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। পার্থক্য হলো, এই কাজে রাখঢাক নেই।
এই ভাস্কর্য ভাঙচুর করার ঘটনা শুধু আজকের নয়। বাইজেন্টাইন সম্রাট লিও তৃতীয় দ্য ইসাউরিয়ান তার আমলে খ্রিস্টীয় প্রতিমার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর জেরে সে সময়ের খ্রিস্টীয় ভাস্কর্য ভাঙা হয়, যা আইকোনোক্লাজম বা প্রতিমাধ্বংসবাদ নামে পরিচিত। তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একে বলা হয় ‘পলিটিক্যাল আইকোনোক্লাজম’। যখন কোনো আন্দোলনকারী গোষ্ঠী মনে করে একটি নির্দিষ্ট ভাস্কর্য বা স্মৃতিস্তম্ভ পুরনো শোষণমূলক ব্যবস্থার প্রতীক, তারা সেটি ভেঙে ফেলার মাধ্যমে সেই ব্যবস্থার পতন উদযাপন করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটকে পলিটিক্যাল আইকোনোক্লাজম বলা চলে। বাংলাদেশ যে ভাস্কর্যগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে এর মধ্যে আছেন শেখ মুজিব, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মহান নেতারা ও লালন ফকিরের মতো সাধকরা। গত এক বছরে ভাঙা হয়েছে বেশ কিছু মাজারও। যেমনটা ঘটেছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। ভারতে ভাঙা হয় বাবরি মসজিদ।
গণআন্দোলনে ভাঙচুরের ঘটনা ডিনডিভিজুয়েশন। আন্দোলনকারীরা মনে করে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ে তাকে কেউ চিনবে না। ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তি তার নিজের পরিচয় বা দায়বদ্ধতা ভুলে যায়। তারা দ্বিধাবোধ করে না সহিংস কাজে লিপ্ত হতে। অনেকের কাছে লুটপাট শুধু চুরি নয়। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক ধরনের ‘ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ’। গবেষকদের মতে এটি ‘কম্পেনসেটরি জাস্টিস’-এর বিকৃত রূপ। ইসরায়েলি সেনাদের যিশুর ভাস্কর্য ভাঙা আর দেশে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ভাঙা অনেকটাই পলিটিক্যাল আইকোনোক্লাজম। এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠী বা আদর্শের সামগ্রিক স্বার্থই নিহিত।



