বইয়ের আলমারির একটা তাক আছে, যেটা খুললেই সময় বদলে যায়। ধুলো-ধূসরিত মলাট, হলদে হয়ে আসা পাতা, পুরনো কাগজের গন্ধ, তার ভেতরেই রাজত্ব এক দীর্ঘদেহী মানুষের। বয়স সাতাশে আটকে আছে বহুদিন। চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। হাতে চারমিনার। মগজে বিদ্যুৎগতির হিসাব। পাশে তোপসে, একটু দূরে হাঁপাতে হাঁপাতে আসছেন লালমোহন গাঙ্গুলি। দরজা খুললেই তারা বেরিয়ে আসেন। আজও।
আজ ২৩ এপ্রিল। এই দিনেই ১৯৯২ সালে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। বয়স হয়েছিল সত্তর। শরীর হয়তো তখন কিছুটা ক্লান্ত, কিন্তু মস্তিষ্ক তখনো সৃষ্টিশীল। মৃত্যুর কিছুদিন আগেই পেয়েছিলেন চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান অস্কারের সম্মানসূচক পুরস্কার। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে সেই পুরস্কার হাতে নেওয়া মানুষটি কেবল চলচ্চিত্রকার ছিলেন না; ছিলেন একাই যেন বহুজন। লেখক, চিত্রকর, সম্পাদক, সুরকার, টাইপ ডিজাইনার, ক্যালিগ্রাফার, গল্পকার, কল্পবিজ্ঞান স্রষ্টা, আর বাঙালির ঘরে ঘরে প্রিয় কিছু চরিত্রের জন্মদাতা।
ফেলুদার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে আনন্দমেলার বিশেষ আয়োজন তার চলে যাওয়ার দিন মানে শুধু একজন মানুষের মৃত্যুদিন নয়। এদিন মানে এমন এক স্রষ্টার অনুপস্থিতির দিন, যিনি না এলে আমাদের শৈশব, কৈশোর, বইয়ের তাক, রহস্যবোধ সবই অন্যরকম হতো।
আমি প্রায়ই ভাবি, তিনি না জন্মালে ফেলুদা কি আসত?
নিশ্চিত উত্তর— না।
কারণ, ফেলুদা কেবল একটি গোয়েন্দা চরিত্র নয়। ফেলুদা হলো এক ধরনের মানসিকতা। বুদ্ধি দিয়ে লড়াই করা, জ্ঞানের প্রতি কৌতূহল, ভ্রমণের প্রতি টান, পর্যবেক্ষণের অভ্যাস, আর বিপদের মুখেও ঠান্ডা থাকা এই সবকিছুর নাম ফেলুদা।
আমার নিজের জীবনেও এর প্রভাব কম নয়।
ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। মফস্বলে থাকি। তিন গোয়েন্দার সঙ্গে সবে পরিচয়। এর আগে বইয়ের জগৎ মানে ছিল রূপকথা, কমিকস, ইসলামি কাহিনি, শিশুতোষ গল্প। ঢাকায় এলে খালার বাসায় ওঠা হতো। সেখানে খালাতো ভাইয়ের আলমারিতে প্রথম দেখি কয়েকটি অদ্ভুত নাম, হত্যাপুরী, গোরস্থানে সাবধান, গ্যাংটকে গণ্ডগোল, দার্জিলিং জমজমাট, বাক্স রহস্য।
নামগুলোতেই যেন রহস্য ছিল।
সত্যজিৎ রায়। ছবি: সংগৃহীততখনো জানতাম না, ওই আলমারির তাক থেকে একদিন আমার ভ্রমণপিপাসা, ইতিহাসপ্রীতি আর রহস্যরসের দরজা খুলে যাবে।
পরে একদিন হাতে নিলাম হত্যাপুরী। পড়তে পড়তে বুঝলাম, বই মানে শুধু গল্প নয়। বই মানুষকে জায়গা দেখাতে পারে, মানুষ চিনতে শেখাতে পারে, ইতিহাসে নিয়ে যেতে পারে, আবার একই সঙ্গে দারুণ বিনোদনও দিতে পারে।
সত্যজিৎ রায়ের এই বড় জাদু ছিল—তিনি পাঠককে কখনো শেখাচ্ছেন বলে শেখাতেন না। গল্পের ভেতরেই জ্ঞান ঢুকিয়ে দিতেন নিঃশব্দে।
ফেলুদা পড়ে কত কিছু যে জেনেছি! কিউরিও কী, প্রাচীন শিল্পবস্তু কী, নেপালের কাঠের কারুকাজ, রাজস্থানের দুর্গ, সিকিমের পাহাড়ি রাস্তা, বেনারসের গলি, লক্ষ্ণৌর নবাবি ইতিহাস, এলোরার গুহা, কলকাতার পার্ক স্ট্রিট, এমনকি পুরনো ডাকটিকিটের দাম পর্যন্ত।
শুধু তাই নয়, ভ্রমণের নেশাও জাগিয়েছিলেন তিনি।
আমার নিজের দার্জিলিংকে চেনা শুরু হয়েছিল মানচিত্র দেখে নয়, দার্জিলিং জমজমাট পড়ে। কুয়াশা ঢাকা পাহাড়ি রাস্তা, ম্যালে সন্ধ্যার হাওয়া, দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার আভা সব আগে দেখেছি বইয়ের পাতায়, পরে বাস্তবে।
তোপসের মতো আমিও ফেলুদার কাছ থেকেই শিখেছিলাম ‘কিউরিও’ মানে কী— পুরনো, বিরল, ইতিহাসমাখা বস্তু। হয়তো সে কারণেই ২০১৭ সালে প্রথম ভারত সফরে উটি, সিমলা, মুসৌরির মতো লোভনীয় পাহাড়ি শহরগুলোকে পাশ কাটিয়ে সোজা দার্জিলিংকে বেছে নিই। মনে হচ্ছিল, বহুদিনের চেনা এক শহরে ফিরছি। দার্জিলিংয়ের ম্যাল। ছবি: সংগৃহীত
তবে ফেলুদাকে অনুসরণ শুরু আরও আগে। ২০১৪ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে, স্ত্রী পুনমকে সঙ্গে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় পৌঁছাই কাঠমান্ডুতে। কিন্তু সত্যি বলতে, শহরটায় আমার যাওয়া শুরু হয়েছিল বহু বছর আগেই, ক্লাস সেভেনে পড়ার সময়, যত কাণ্ড কাঠমান্ডু পড়ে। তখনই প্রাচীন মন্দিরঘেরা শহরটা মাথায় বাসা বেঁধেছিল। সেখানে এক খুনির পিছু নিতে হাজির হয়েছিল ফেলুদা, তোপসে আর লালমোহন গাঙ্গুলি। তারপর মগনলাল মেঘরাজের সঙ্গে শ্বাসরুদ্ধকর টক্কর। কিশোর বয়সে তখনই মনে হয়েছিল, একদিন আমাকে এই শহরে যেতেই হবে। বহু বছর পর সেই ইচ্ছে পূরণ হলো।
একইভাবে ২০১৮ সালে ঋষিকেশের রামঝুলা আর লছমন ঝুলা দেখতে যাওয়ার পেছনেও ছিল ফেলুদার হাত। বাদশাহী আংটি পড়ে প্রথম জানি ওই নামগুলো। কত বই মানুষকে শুধু গল্প দেয়, আর কত বই পথও দেখায়, ফেলুদা দ্বিতীয় দলের।
ভারতের কলকাতার প্রতি আমার আলাদা টানও তাই। শুধু শহর নয়, যেন এক সাহিত্যিক ভূগোল। কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের গলি, ট্রামের ঝনঝন, পুরনো বাড়ির বারান্দা সবকিছুর ভেতর কোথাও না কোথাও লুকিয়ে আছে ফেলুদা।
তবে বছর কয়েক আগে কলকাতায় গিয়ে একটা আক্ষেপ রয়ে গেছে। গোরস্থানে সাবধান-এর সেই পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রিতে ঢুঁ মারা হলো না। আজও সেটা পোড়ায়। কারণ আশ্চর্যভাবে, কোনো গোরস্থানে গেলেই বইটার আবহ আমাকে ঘিরে ধরে। ঢাকার ওয়ারি খ্রিস্টান কবরস্থান, বান্দুরার পুরনো সমাধিক্ষেত্র, এমনকি বরিশালের গাছপালায় ঢাকা এক মুসলিম কবরস্থানেও দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই বুঝি তোপসে ফিসফিস করে কিছু বলল, আর ফেলুদা মাটির দিকে তাকিয়ে সূত্র খুঁজছে।
আমার ধারণা, শুধু রহস্য-রোমাঞ্চ নয় ভারতের জঙ্গল, পাহাড়, সৈকত, ছোট শহর, গ্রাম, কলকাতার অলিগলি সবখানে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ দিয়েছে বলেই প্রদোষচন্দ্র মিত্রকে এত ভালোবেসেছি। তার সঙ্গে ভ্রমণ করা যায়, শেখা যায়, ভয় পাওয়া যায়, আবার মুগ্ধও হওয়া যায়।
আমার ভ্রমণপিপাসু হয়ে ওঠার পেছনে তাই যেমন পথঘাট আছে, তেমনি আছে বইয়ের তাক। আর সেই তাকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন, প্রদোষচন্দ্র মিত্র। তার পেছনে নীরবে হাসছেন আরেকজন— সত্যজিৎ রায়। সন্দেশের পাতায় ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি
ফেলুদার জন্ম ১৯৬৫ সালে। সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি গল্প দিয়ে প্রথম আবির্ভাব। তখনো কেউ জানত না, এই চরিত্র একদিন বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় গোয়েন্দাদের একজন হয়ে উঠবে। পরে বাদশাহী আংটি প্রথম উপন্যাস হিসেবে আসে। তারপর একে একে সোনার কেল্লা, জয় বাবা ফেলুনাথ, কৈলাসে কেলেঙ্কারি, ছিন্নমস্তার অভিশাপ, টিনটোরেটোর যীশু, গোরস্থানে সাবধান কত নাম বলব!
মজার ব্যাপার, ফেলুদার মধ্যে শার্লক হোমসের প্রভাব আছে, এটা সত্যজিৎ নিজেই স্বীকার করেছেন নানা সময়ে। কিন্তু অনুকরণ নয়, তিনি তাকে বাঙালি করে তুলেছেন। হোমস লন্ডনের মানুষ, ফেলুদা কলকাতার। হোমসের পাইপ আছে, ফেলুদার চারমিনার। হোমসের ওয়াটসন আছে, ফেলুদার তোপসে। আর আমাদের সৌভাগ্য, ফেলুদার সঙ্গে জুটে গেলেন জটায়ু, যার মতো আনন্দদায়ক চরিত্র গোয়েন্দা সাহিত্যে বিরল।
একদিকে টানটান উত্তেজনা, অন্যদিকে তার ভুলভাল ইংরেজি, ভয় পেলেও সাহসী সাজার চেষ্টা, অদ্ভুত বইয়ের নাম, আর সরলতা এই চরিত্রই গল্পগুলোকে মানবিক করেছে। নইলে সব সময় শুধু তীক্ষ্ণ বুদ্ধির গোয়েন্দা আর সহকারী দিয়ে কাহিনি একটু শুকনো হয়ে যেত। লালমোহন গাঙ্গুলি যেন ফেলুদা কাহিনির চাটনি।
সত্যজিৎ সেটা জানতেন।
তিনি চরিত্র নির্মাতা হিসেবে ভয়ংকর দক্ষ ছিলেন। ছোট্ট কয়েকটি বাক্যে মানুষ দাঁড় করিয়ে দিতে পারতেন চোখের সামনে। সিধু জ্যাঠা, মগনলাল মেঘরাজ, বনবিহারী বাবু, মহেশ চৌধুরী, বিকাশ সিংহ, কারাণ্ডিকার—কত মানুষ আজও মনে আছে।
কেন আছে?
কারণ তিনি তাদের জীবন্ত করেছিলেন।
তার আরেক বড় গুণ ছিল ভাষা। সহজ অথচ মার্জিত। রসিক অথচ শালীন। আধুনিক অথচ আপন। তার গদ্য পড়লে মনে হয়, কেউ সামনে বসে গল্প বলছে। কোথাও বাড়তি মেদ নেই, কোথাও জটিলতা নেই, অথচ গভীরতা আছে। সত্যজিতের অমর সৃষ্টি ফেলুদা
একটা গির্জার ঘড়ি দূরে বেজে উঠল। সেন্ট পলস। সাড়ে এগারোটা। রাতের নিস্তব্ধতা যেন শব্দ গুনছিল। কাছাকাছি কোথাও হঠাৎ একটা কুকুর ডেকে উঠল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, ডান পাশের পাঁচিল টপকে এক লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল ফেলুদার ওপর। সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন। হাতের বাক্সটা উধাও। কিন্তু ফেলুদা কি এত সহজ শিকার? বিদ্যুতের মতো ঝটকায় প্রথম লোকটাকে ছুড়ে ফেলে সে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার বুকের ওপর....
বুঝতেই পারছেন, ফেলুদার দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছি আমরা। বইটির নাম বাক্স রহস্য। যে কজন এখনো ফেলুদাকে ভালো করে পড়েননি, তাদের বলব, ফেলুদা সমগ্র কিনে একসঙ্গে গিলবেন না, আলাদা আলাদা বই কিনে ধীরে ধীরে পড়ুন। তবেই রহস্যের স্বাদ দীর্ঘস্থায়ী হবে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেটা আরও বেশি বোঝা যায়।
এখন আমরা দ্রুত উত্তেজনা চাই, বড় শব্দ চাই, চমক চাই। সত্যজিৎ জানতেন, পাঠককে ধরে রাখতে শুধু বিস্ফোরণ লাগে না, বুদ্ধিও লাগে।
তাই তার গল্পে গুলি আছে, তাড়া আছে, ভয় আছে, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আছে চিন্তার আনন্দ। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে ভাবি, ১৯৯২ সালে তিনি চলে গেলেন খুব তাড়াতাড়ি। আর পাঁচটা বছর থাকলে? হয়তো আরও কয়েকটি ফেলুদা পেতাম। আরও দু-একটি শঙ্কু। আরও কিছু ছোটগল্প। হয়তো নতুন চরিত্রও।
এই আফসোস বহু পাঠকের।
তবে আবার মনে হয়, তিনি যা দিয়ে গেছেন, তাও কম কী!
ফেলুদাকে নিয়ে যে কয়টি সিনেমা হয়েছে তার অন্যতম সোনার কেল্লা। ছবি: সংগৃহীত
চলচ্চিত্রে পথের পাঁচালী, অপরাজিত, অপুর সংসার, চারুলতা, নায়ক, অরণ্যের দিনরাত্রি, গুপী গাইন বাঘা বাইন, শতরঞ্জ কে খিলাড়ি, এক জীবনে এত কাজ অনেকের বহু জন্মেও হয় না।
আজও যখন মন খারাপ হয়, বুকশেলফ থেকে গ্যাংটকে গণ্ডগোল নামাই। কখনো জয় বাবা ফেলুনাথ। কখনো বাক্স রহস্য। কয়েক পাতা পড়তেই মনে হয়, জীবন এখনো মজার। পৃথিবী এখনো রহস্যে ভরা। আর জ্ঞান এখনো আনন্দের জিনিস। ফেলুদার মতো সত্যজিতের আরেক অমর সৃষ্টি ফেলুদা। ছবি: সংগৃহীত
এই অনুভূতি দেওয়ার জন্য কজন লেখককে ধন্যবাদ জানানো যায়?
আজ ২৩ এপ্রিল। বিশ্ব বই দিবস। আর তার চলে যাওয়ার দিন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, কিছু মানুষ মরেন না। তারা বইয়ের পাতায় রয়ে যান। সিনেমার দৃশ্যে রয়ে যান। সংলাপে রয়ে যান। পাঠকের অভ্যাসে রয়ে যান।
সত্যজিৎ রায় তেমনই।
তাকে মনে পড়লেই আমার মনে একটাই কথা আসে, তুমি না থাকলে ফেলুদার জন্ম হতো না। আর ফেলুদা না থাকলে, আমাদের শৈশবও হয়তো এত বুদ্ধিমান, এত রোমাঞ্চকর, এত দূরপাল্লার হতো না।