ইরান-যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই ঐতিহাসিক চুক্তির দ্বারপ্রান্তে?

সংগৃহীত ছবি
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধ, পাল্টাপাল্টি হামলা এবং কূটনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি প্রায় সম্পন্ন এবং খুব শিগগিরই তা আনুষ্ঠানিক রূপ পেতে পারে। তবে ইরান বলছে, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ধরে রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তি তৈরির লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। তিনি এমনও দাবি করেছেন যে, আলোচনার মূল বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নীতিগত ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যেকোনো সময় আসতে পারে।
কিন্তু তেহরানের বক্তব্য অনেক বেশি সংযত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনা অব্যাহত থাকলেও এখনো এমন কোনো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যেখানে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলা যায়। তাদের অভিযোগ, আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ফলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
সম্ভাব্য সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট-ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা তৈরির সক্ষমতা রাখতে পারবে না। অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য বেসামরিক প্রয়োজনে সীমাবদ্ধ। তবে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরেই এই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছে।
আলোচনায় অর্থনৈতিক বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা দেশগুলোর একটি ইরান। বছরের পর বছর ধরে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং তেল রপ্তানিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাই তেহরানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদের ওপর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া।
আরেকটি বড় ইস্যু হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রণালিটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটকে আরও তীব্র করেছে। সম্ভাব্য সমঝোতার অংশ হিসেবে প্রণালিটি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি লেবানন ইস্যু। ইরান চায়, যে কোনো সমঝোতার অংশ হিসেবে লেবাননে ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হোক এবং একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হোক। অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের সমঝোতা হলেও তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প যে ‘চুক্তি’র কথা বলছেন, সেটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এটি একটি প্রাথমিক সমঝোতা বা ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ হতে পারে। যার মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি বজায় রেখে পরবর্তী বড় আলোচনার পথ তৈরি করা হবে।
তাদের মতে, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের মতো জটিল বিষয়গুলোর চূড়ান্ত সমাধান এত দ্রুত সম্ভব নয়। তাই এখনো ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় আসেনি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক অস্থিরতার বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ফলে সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে সমঝোতার দিকে এগোনোর প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সেই বাস্তবতা থেকেই হয়তো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরেছে। কিন্তু এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী শান্তির ভিত্তি গড়বে, নাকি কেবল সাময়িক বিরতি এনে দেবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
সূত্র: আলজাজিরা


