নেপালে রেমিট্যান্স বাড়ছেই, যাচ্ছে কোথায়

প্রতীকী ছবি
মধ্য পাহাড় বা তরাই অঞ্চলের যেকোনো গ্রামে হাঁটলে চোখে পড়ে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ভাঙাচোরা কাঁচা রাস্তা, নষ্ট হয়ে যাওয়া সেচ খালের পাশেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে চকচকে কংক্রিটের বাড়ি। কোনোটা দোতলা, কোনোটা তারও বেশি। রঙিন। ছাদে স্যাটেলাইট ডিশ। এসব বাড়ি তৈরির অর্থ এসেছে দূর দেশ থেকে। যেমন কাতার, মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু সেই গ্রামের প্রধান সড়ক? বছরের পর বছর ধরে উন্নয়নের অপেক্ষায়।
এই দৃশ্যটাই যেন আধুনিক নেপালের প্রতিচ্ছবি। যেখানে বাড়ছে ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি, কিন্তু পিছিয়ে সামষ্টিক অবকাঠামো।
শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় না। রাস্তা, হাসপাতাল, সেচ ব্যবস্থার জন্য চাই পরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগ। দক্ষ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি।
হাজার হাজার নেপালি কাজের খোঁজে বিদেশে যাচ্ছে প্রতিদিন। গত কয়েক দশকে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়েছে— বৈধ-অবৈধ দুই পথেই। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিবছর বিদেশে পড়তে যাওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। ফলে এটি স্পষ্ট, সবচেয়ে কর্মক্ষম ও উদ্যমী জনগোষ্ঠীকে হারাচ্ছে নেপাল।
অন্যদিকে, বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্স প্রবাহও বিশাল। বছরে বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ঢুকছে নেপালে (কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য, গত বছরের মধ্য জুলাই থেকে চলতি বছরের মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩৩ শতাংশ, সংখ্যায় যা ৮.৮ বিলিয়ন), কিন্তু এই অর্থের পেছনে আছে ব্যক্তিগত ত্যাগ।
পরিবার থেকে দূরে থাকা, কঠোর পরিশ্রম ও অনিশ্চয়তা। প্রশ্নটা তাই গুরুত্বপূর্ণ: এই ত্যাগের বিনিময়ে কি এমন একটি দেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে ফিরে আসা যায়?
পারিবারিক দৃষ্টিকোণ থেকে খরচের প্রবণতা একেবারেই স্বাভাবিক। প্রথমে খাবার, শিক্ষা, চিকিৎসা— তারপর একটি বাড়ি। সেই বাড়ি শুধু বসবাসের জায়গা নয়, বরং প্রবাস জীবনের প্রতীক। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে এই প্রবণতা তৈরি করছে এক অসম ভারসাম্য। ব্যক্তিগত বাড়ি জমকালো হচ্ছে, কিন্তু পানি, রাস্তা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ— এসব অবকাঠামো থেকে যাচ্ছে অবহেলিত।
তরুণদের মধ্যে বাড়ছে বেকারত্ব। সুযোগের অভাবে বিদেশমুখী হচ্ছে তারা। একবার কেউ বিদেশ গেলে বাড়ে অন্যদের যাওয়ার প্রবণতা। ফলে গ্রামগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে সক্রিয় মানুষদের। যারা থেকে গেলে হয়তো তুলতে পারত পরিবর্তনের দাবি।
বছরে বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ঢুকছে নেপালে। কিন্তু এই অর্থের পেছনে আছে ব্যক্তিগত ত্যাগ। প্রশ্নটা তাই গুরুত্বপূর্ণ: এই ত্যাগের বিনিময়ে কি এমন একটি দেশ তৈরি হচ্ছে, যেখানে ফিরে আসা যায়?
গবেষণাও স্পষ্ট কোনো উত্তর দেয় না। যেখানে প্রবাসীরা ফিরে এসে বিনিয়োগ করছে, সেখানে উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা রাখছে রেমিট্যান্স। আবার কোথাও এটি বাড়াচ্ছে নির্ভরতা। উৎপাদনশীলতা কমে দুর্বল হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি।
একটি বিষয় অবশ্য পরিষ্কার— শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে দেশের অবকাঠামো গড়ে তোলা যায় না। রাস্তা, হাসপাতাল, সেচ ব্যবস্থার জন্য চাই পরিকল্পিত সরকারি উদ্যোগ। দক্ষ প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি। অর্থ আছে বটে। কিন্তু সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে রূপান্তরের কাঠামো দুর্বল।
এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যদি নীতিনির্ধারকরা রেমিট্যান্সকে শুধু ব্যক্তিগত আয় হিসেবে না দেখে, বরং বিবেচনা করে জাতীয় সম্পদ হিসেবে, তাহলে তৈরি হতে পারে পরিবর্তনের সুযোগ। একজন প্রকৌশলীর কাছে শুধু একটি ভবন দাঁড়িয়ে থাকাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি খোঁজেন ভবনের ভিত্তি কতটা শক্ত, চাপ কোথায় পড়ছে, দীর্ঘমেয়াদে টিকবে কি না। ঠিক তেমনি নীতিনির্ধারণেও দরকার গভীর বিশ্লেষণ।
রেমিট্যান্স কত আসছে? প্রশ্নটা তাই এমন নয়। বরং এখন জানতে চাওয়া উচিত কোথায় যাচ্ছে এই টাকা? কী তৈরি হচ্ছে? আর কীভাবে এটি ব্যবহার করলে গড়ে তোলা সম্ভব টেকসই ভবিষ্যৎ? এসব উত্তর খুঁজে পাওয়াটাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
লেখক: পিএইচডি গবেষক, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার সিডনি



