দুর্ঘটনার পরের ‘গোল্ডেন আওয়ার’
রোদ আটকাতে পর্দা, তা সামলাতে পাইপ, দম যাচ্ছে যাত্রীদের ...

ফাইল ছবি
পদ্মা পাড়ের সাম্প্রতিক বাস দুর্ঘটনার ভয়াবহতার রেশ এখনো কাটেনি। তবে উদ্ধারকাজ শেষে বেরিয়ে আসছে এক রূঢ় বাস্তবতা। বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে জানালার পাশে লাগানো সাধারণ এক টুকরো স্টেইনলেস স্টিল (এসএস) পাইপ। যে পাইপ লাগানো হয়েছিল পর্দার সাপোর্ট হিসেবে, সেটিই দুর্ঘটনার সময় যাত্রীদের জন্য ‘যমদূত’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু পদ্মাপাড়ের এই দুর্ঘটনাই নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও বেশ কয়েকটি আলোচিত সড়ক দুর্ঘটনায় ‘লাইফ সেভিং’ পথ রুদ্ধ করতে দেখা গেছে সামান্য পুরুত্বের এই এসএস পাইপকে। শুধু বাসই নয়, মাইক্রোবাস বা অ্যাম্বুলেন্সের মতো ছোট যানেও পর্দার ব্যবস্থাপনা সহজ করতে লাগাতে দেখা যাচ্ছে এই এএসএস পাইপ। দুর্ঘটনায় পড়া বাসের জানালার কাঁচ ভেঙে দ্রুত বের হওয়ার সুযোগ থাকলেও, আড়াআড়িভাবে লাগানো এই শক্ত পাইপগুলো সেই পথকে অত্যন্ত সংকীর্ণ করে দেয়। বিশেষ করে বাস যখন পানিতে পড়ে, বা সড়কে চলন্ত বাসে আগুন লাগে তখন জানালার মতো ‘জরুরি নির্গমন পথ’ হয়ে পড়ে রুদ্ধ, প্রাণ বাঁচাতে মরিয়া যাত্রী লাথি মেরে বা শক্ত কিছুর আঘাতে জানালার কাঁচ ভাঙতে পারলেও এই চিকন অথচ দীর্ঘ এসএস পাইপের কারণে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ সহজেই বাইরে বের হয়ে আসতে পারেন না।
বিশেষ করে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ার দুর্ঘটনার মতো বাস যখন ৩০-৪০ ফুট গভীরে তলিয়ে যায় তখন পানির প্রচণ্ড চাপে সেই বাসের দরজা খোলা প্রায় অসম্ভব। একমাত্র উপায় তখন জানালার ফাঁক গলে বের হওয়া। কিন্তু এসএস পাইপের গ্রিল বা বারের কারণে যাত্রীরা ভেতরেই আটকা পড়েন। গভীর পানির হিমশীতল পরিবেশ এবং অন্ধকার মিলে তৈরি করে এক চরম আতঙ্কগ্রস্ততা, যা মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা করার ক্ষমতাও নেয় কেড়ে। এমন মুহুর্তে এই এসএস পাইপই হয়ে উঠে জীবন-মৃত্যুর মাঝখানের ব্যবধানের ঠুনকো সুতো রূপে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক মিনিট জীবন বাঁচানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাকে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। কিন্তু সেই গোল্ডেন আওয়াদের সদ্ব্যবহারের পথ আশঙ্কাজনকভাবে রুদ্ধ করছে জানালার পাইপ। জরুরি অবস্থায় দরজা একটিই থাকে। বাস উল্টে গেলে বা পানিতে পড়লে দরজা লক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশ। তখন বাঁচার একমাত্র পথ জানালা। কিন্তু ১.৫ ইঞ্চি থেকে ২ ইঞ্চি মোটা এসএস পাইপ আড়াআড়িভাবে লাগানো থাকায় জানালার ফাঁক দিয়ে একজন মানুষের শরীর বের হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া বাস পানিতে পড়ার পর বাইরের পানির চাপে জানালার কাঁচ ভাঙা কঠিন হয়। যদি কাঁচ ভাঙাও যায়, ভেতরের পাইপটি হাতুড়ি বা বিশেষ কাটার ছাড়া ভাঙা যায় না। বাস পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার পর একজন মানুষ সর্বোচ্চ ১-২ মিনিট শ্বাস ধরে রাখতে পারেন। এই অল্প সময়ে জানালার পাইপ সরানো বা কাটা সম্ভব হয় না বলে সুস্থ ও সবল মানুষও বাসের ভেতরেই বেঘোরে মারা পড়েন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের মতে, বাসের জানালায় কোনো ধরনের স্থায়ী লোহার বা এসএস পাইপ থাকা মানেই হলো দুর্ঘটনার সময় সেটি একটি ‘লোহার খাঁচা’ বা কফিনে রূপান্তর হওয়া। দৌলতদিয়ার দুর্ঘটনায় ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’র সহায়তায় পানির তল থেকে টেনে তোলা হয় ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটিকে। পরে যার ভেতর থেকে একের পর এক নিথর মরদেহ বের করে আনতে থাকেন উদ্ধারকারীরা। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শুধু এবারের দুর্ঘটনাই নয়, গত কয়েক বছরের বাস দুর্ঘটনার রেকর্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জানালার এই অপরিকল্পিত পাইপ মৃত্যুর হার দ্বিগুণ করেছে। এর ২০২৩ সালের ১৯ মার্চ মাদারীপুরের শিবচরে পদ্মা সেতুর এক্সপ্রেসওয়েতে নিয়ন্ত্রণ হারায় খুলনা থেকে ঢাকাগামী ইমাদ পরিবহনের একটি বাস। সেটি খাদে পড়ে প্রাণ যায় অন্তত ১৯ যাত্রীর। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া বাসটির জানালার পাইপ এবং অতিরিক্ত গতির কারণে যাত্রীরা বের হতে পারেননি, ফলে ভেতরেই পিষ্ট হয়ে তাদের মৃত্যু হয়। ওই বাসটির ছিল না ফিটনেস সনদও।
একই বছর ঝালকাঠির ছত্রকান্দায় পুকুরে বাস পড়ে ১৭ জন নিহত হন। ‘বাসার স্মৃতি’ নামের যাত্রীবাহী বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রীরা জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলেও বাসটি উল্টে পানিতে ডুবে থাকায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দুর্ঘটনায় পড়ার পর বাসটির একাধিক যাত্রী তাৎক্ষণিক প্রাণে বাঁচলেও জানালা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করে জানালার পাইপের বাধার কারণে তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। শেষমেষ পানির নিচে আটকা পড়ে মৃত্যু হয় তাদের। গত এক যুগে একই ধরণের আরো কয়েকটি দুর্ঘটনায় জানালার এই এসএস পাইপ বাড়িয়েছে হতাহতের সংখ্যা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পদ্মায় বাসডুবির ঘটনাতেও নিহতের সংখ্যা বাড়ার নেপথ্যে অন্যতম কারণ ছিল জানালার এই এসএস পাইপ। অনেক যাত্রীকেই দেখা গেছে জানালার পাশে হাত বের করে বাঁচার চেষ্টা করছেন, কিন্তু পাইপের ফাঁদ গলিয়ে শরীর বের করতে পারেননি। পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসের ভেতরে পর্দা টাঙানোর জন্য চিকন দড়ি বা তার ব্যবহার করা যেতে পারে, যা সহজে ছিঁড়ে ফেলা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে বাসের ভেতরের জৌলুস বাড়াতে বা পর্দা সঠিক অবস্থানে রাখতে এসএস পাইপ ব্যবহারের চল দেখা যাচ্ছে।
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনার তিনদিনের মাথায় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআরটিএ)। ২৬টি প্রাণ কেড়ে নেওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের সেই বাসটির রেজিস্ট্রেশন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। বিআরটিএর এ সংক্রান্ত চিঠিতে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ বিকেলে দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। মুহূর্তেই প্রাণচঞ্চল সেই যানটি পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।’
শুধু দুর্ঘটনার পর পানিতে তলানোর সময়ই নয়, সড়কে কোনো চলন্ত বাসে আগুন লাগলেও এসএস পাইপের এ ধরণের প্রতিবন্ধকতা ‘মরণফাঁদ’ রূপে আবির্ভূত হতে পারে। বিআরটিএ যেদিন (শুক্রবার) রাজবাড়ীর বাসটির রেজিস্ট্রেশন স্থগিত করে সেদিন বিকলেই এমনই এক দুর্ঘটনা ঘটেছে যশোর সদর উপজেলায়। যশোর-নড়াইল জাতীয় মহাসড়কের ফতেপুর এলাকায় ‘যান্ত্রিক ত্রুটি’ থেকে লাগা আগুনে পুড়েছে চলন্ত একটি বাস। তবে আতঙ্কিত যাত্রীরা দ্রুত দরজা ও জানালা দিয়ে নেমে যাওয়ায় এ ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
বিআরটিএর রাজবাড়ী কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) মুহাম্মদ অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, বাস মালিকরা সাধারণত যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে, যেন কেউ জানালার বাইরে মাথা বা হাত না দেয় সেজন্য এ ধরণের পাইপ লাগান। তবে দুর্ঘটনার সময় এটি যে সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে, সেটিও তারা অস্বীকার করছেন না।
একটি সাধারণ পাইপ কেন শত মানুষের মৃত্যুর কারণ হবে—সেই প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের। বিআরটিএর ফিটনেস নীতিমালায় জানালার এই মরণফাঁদ অপসারণের কঠোর নির্দেশনা ও তা প্রতিপালনের ব্যবস্থা না থাকলে, আগামীতে এমন দুর্ঘটনাই রূপ নিতে পারে একেকটি ‘গণকবরে’। যাত্রী সুরক্ষায় বাসের ভেতর থেকে এসব অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক পাইপ অপসারণ এখন সময়ের দাবি।

