জনসমর্থন ছাড়া মিন অং হ্লাইং কতদিন শাসন করবেন?

সংগৃহীত ছবি
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের ক্ষমতা দখলে নেন জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। সেই থেকে প্রতিবেশী দেশটি শাসন করে আসছেন তিনি। অভ্যুত্থানের প্রায় ৫ বছর পর নির্বাচন শেষে আবারও তিনিই হতে যাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট।
গতকাল সোমবার দেশটির পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর পর প্রেসিডেন্ট পদে মিন অং হ্লাইংয়ের নামপ্রস্তাব করা হয়। যেহেতু তিনি মনোনীত হয়েছেন, তার প্রেসিডেন্ট হওয়া এখন প্রায় নিশ্চিত। পার্লামেন্টে তার সঙ্গে আরও দুই ব্যক্তির নামপ্রস্তাব করা হয়েছে, যাদের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এখন প্রশ্ন হলো জনসমর্থন ছাড়া আর কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন তিনি।
গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে মিয়ানমারে কয়েক ধাপে সাধারণ নির্বাচন হয়। এতে দেশটির বড় বিরোধী দলগুলোকে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এ নির্বাচনের পর সোমবার পার্লামেন্টে প্রথম অধিবেশন বসে।
ক্ষমতার নেশায় মত্ত ও প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষায় অন্ধ এক স্বৈরশাসক পুরো দেশ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। মাত্র পাঁচ বছর আগে, কভিডের চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও মিয়ানমার সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল। দেশটিতে একটি গণতান্ত্রিক ও ফেডারেল ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু এক ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্ক্ষায় সেই অগ্রযাত্রা হঠাৎ থমকে যায়।
এরপর থেকে দেশটি একের পর এক মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে আক্রান্ত। আগের গণতান্ত্রিক সরকারের মতো কার্যকর নেতৃত্ব ছাড়াই কভিডের ধাক্কা মোকাবিলা করেছিল নেপিদো। ঝড়, বন্যা ও গত বছর ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে দেশটির লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে বা নিহত হয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ সাহায্য নিতে অস্বীকৃতি জানায় জান্তা সরকার। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী জব্দ করে ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেয়। সবচেয়ে ট্র্যাজিক বিষয় হলো, এই বিপর্যয়ের পরপরই সামরিক বাহিনী ৫৫০টির বেশি বিমান ও কামানের হামলা চালিয়ে শত শত বেসামরিক মানুষ হত্যা করে।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফ্যামিন: অ্যান এসে অন এনটাইটেলমেন্ট অ্যান্ড ডিপ্রাইভেশনে’ যুক্তি দিয়েছেন, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশে কখনও বড় কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। গণতান্ত্রিক সরকারগুলো নির্বাচন, বিরোধী দল ও মুক্ত গণমাধ্যমের চাপে থাকায় জনগণের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত সাড়া দিতে বাধ্য থাকে।
আমাদের অভিজ্ঞতা এই সত্যটিই নির্মমভাবে প্রমাণ করে। ২০০৮ সালের ঘূর্ণিঝড় নার্গিস থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের ভূমিকম্প পর্যন্ত— গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতামূলক শাসনের অভাবে মানুষের দুর্ভোগ বহুগুণ বেড়েছে। অথচ এর আগের গণতান্ত্রিক সরকার কভিড মহামারি মোকাবিলায় অনেক বেশি দক্ষতা দেখিয়েছিল।
স্বৈরাচারের পরিণতি কেবল দুর্যোগ মোকাবিলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মিন অং হ্লাইংয়ের অব্যবস্থাপনার কারণে অর্থনৈতিক ধস, সামাজিক ভাঙন ও জাতিগত বিভেদ চরম আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এখন মিয়ানমারকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
এখন সামনে আরও একটি সংকট ঘনিয়ে আসছে— জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে এশিয়াজুড়ে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব মিয়ানমারেও পড়বে। মিন অং হ্লাইং যখন তার প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্নপূরণের কাছাকাছি, তখন আরও একটি মানবসৃষ্ট বিপর্যয় রূপ নিচ্ছে। আবারও সেই গণতন্ত্রের অভাবই আমাদের জনগণের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত হয়ে আসবে।
টমাস জেফারসন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে লিখেছিলেন, ‘সরকার মানুষের মধ্য থেকেই তৈরি হয় এবং শাসিতদের (জনগণের) সম্মতি থেকেই তারা ন্যায়সঙ্গত ক্ষমতা লাভ করে।’ জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো শাসকই অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পারে না। এই নীতি কেবল কথার কথা নয়— এটি আজকের মিয়ানমারের বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কোনো স্বৈরশাসকই তার জনগণের সম্মতি ছাড়া চিরকাল শাসন করতে পারে না। আর জনগণেরও পূর্ণ অধিকার রয়েছে সেই শাসকের কাছ থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করার যে জোর করে শাসন করতে চায়।
যতদিন শাসিতরা (জনগণ) তাদের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ, সহনশীল এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকবে, ততদিন আত্মবিশ্বাস থাকে যে মিয়ানমারে উজ্জ্বল ও ন্যায়সঙ্গত ভবিষ্যৎ অবশ্যই ফিরে আসবে।
লেখক: মিয়ানমারের সাবেক রাজনৈতিক বন্দী। বর্তমানে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা

