ট্রাম্প ও তেহরানের ‘অবিবেচক’ সোশ্যাল পোস্টের কারণে ভেস্তে গেছে শান্তি আলোচনা

ওয়াশিংটন ডিসিতে হেলিকপ্টারে ওঠার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। ছবি : দ্য গার্ডিয়ান
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের জন্য কার্যকর হয় সাময়িক যুদ্ধবিরতি। একে স্থায়ী রূপ দিতে চলে কূটনৈতিক আলোচনাও। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া একের পর এক ‘আগাম ও অবিবেচক’ পোস্টের কারণে ভেস্তে গেছে সে প্রক্রিয়া।
দুই দেশের শীর্ষ ব্যক্তিরাই যুদ্ধের নানা পর্যায়ে এরকম ভুল ও অপ্রয়োজনীয় পোস্ট করছিলেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। যার চূড়ান্ত ও সবশেষ পোস্টটি করলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। শনিবার তিনি এক্সে ঘোষণা দেন, ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের ওপর আবারও ফিরিয়ে আনবে পূর্ণ অবরোধ।
আরাঘচির ভাষ্য, ইরানে মজুত থাকা উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের কোনো অংশই ভিন্ন দেশে হবে না রপ্তানি।
ঘটনার শুরু হয় শুক্রবার। এদিন ভোরে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক্সে ঘোষণা করেন, সাময়িক যুদ্ধবিরতির বাকি সময় হরমুজে জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না তেহরান। এর পেছনে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হওয়া ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিকে কারণ দেখান তিনি।
আরাঘচির এ ঘোষণাকে স্বাগত জানায় পাকিস্তান। ঠিক ওই সময়ে দেশটিতে ছিলেন সেনাপ্রধান আসিম মুনিরসহ ইসলামাবাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা। যারা ওয়াশিংটনের প্রস্তাব নিয়ে ৩ দিন ধরে কাজ করছিলেন ইরানে।
এই খবরকে স্বাগত জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও। হরমুজ খুলে দেওয়ায় ইরানকে ধন্যবাদ দেন তিনি। একই পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাদের মজুত ইউরেনিয়াম পাঠাতে রাজি হয়েছে ইরান- এই অংশটি সম্পূর্ণ অতিরঞ্জন ও ভুল দাবি।
হরমুজ খোলা নিয়ে আরাঘচির পোস্টটি ছিল যথেষ্ট দুর্বল বা অসম্পূর্ণ। তার এই ঘোষণায় প্রতি ব্যারেল তেলের দাম কমে যায় ১২ ডলার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইরানের কেউ কেউ এমনটিও দাবি করেছেন, তেলের বাজারকে প্রভাবিত করতেই করা হয় আরাঘচির পোস্টটি।
ইরানি আইনপ্রণেতা (এমপি) মুর্তজা মাহমুদির ক্ষোভ, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি না থাকলে এক্সে করা এ মন্তব্যের জন্য অভিশংসন হওয়া উচিত ছিল আরাঘচির। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার অসময়ে মন্তব্য করেন বলেও অভিযোগ তার।
যদিও কিছু সময় পরেই আরাঘচির পোস্টটিকে ভুল অথবা অসম্পূর্ণ দাবি করে আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ এ সংবাদ সংস্থাটি।
তাসনিমের দাবি, পোস্টটি প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই হয়েছে প্রকাশ। এটি অস্পষ্টতা তৈরি করেছে এবং জন্ম দিয়েছে ব্যাপক সমালোচনার। এ কারণে আরাঘচিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিও তুলেছে কায়হানের মতো কট্টর গণমাধ্যমগুলো।
আরাঘচির প্রতি সহানুভূতিশীল রাজনীতিবিদ মাহমুদ সাদেঘির মতো ব্যক্তিরাও বিষয়টি নিয়ে বিরক্ত। তিনি স্পষ্ট করেন, ঘোষণাটি আনুষ্ঠানিকভাবে করা উচিত ছিল, এমন কোনো পোস্টের মাধ্যমে নয়; যা তৈরি করতে পারে ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়নি কোনো আলোচনা।
পরে আবারও তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়, আরাঘচি বোঝাতে চেয়েছিলেন হরমুজ কেবল আইআরজিসি অনুমোদিত জাহাজগুলোর জন্য উন্মুক্ত। যারা প্রয়োজনীয় টোল পরিশোধ করবে, তারাই কেবল ব্যবহার করবে প্রণালিটির নির্ধারিত পথ।
নতুন করে এ অচলাবস্থার ফলে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, আগামী বুধবার তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরের সপ্তাহে তিনি বোমা হামলা শুরু করবেন পুনরায়। এর ফলে আবারও আরেকটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলো হরমুজে।
ইরান জোর দিয়ে বলেছে, সোমবার ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে যে গুজব প্রচারিত হয়েছে সে অনুযায়ী পুনরায় আলোচনা শুরু করতে অনিচ্ছুক তারা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের দাবিগুলো ছিল মাত্রাতিরিক্ত।
ইরানের এই কঠোর মনোভাব প্রমাণ করে দেশটির পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে আইআরজিসি কতটা প্রভাবশালী। আগে থেকেই বাহিনীটি আশঙ্কা করেছিল, ওয়াশিংটনকে অপরিপক্ব ও অপ্রয়োজনীয় ছাড় দিচ্ছেন আরাঘচি।
অন্যদিকে, ট্রুথ সোশ্যালে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ধারাবাহিক আশাবাদী পোস্ট দেন ট্রাম্প। এসব পোস্টের কারণে ক্ষোভ আরও বেড়ে যায় আইআরজিসির।
ট্রাম্পের পোস্টগুলোতে অনেক মিথ্যা দাবি ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সংসদের স্পিকার এবং শান্তি আলোচনায় ইরানি দলের নেতা মোহাম্মদ গালিবাফ।
ট্রাম্পকে আক্রমণ করে গালিবাফ তার সাম্প্রতিক পোস্টে বলেছেন, হরমুজ খোলা থাকবে নাকি বন্ধ থাকবে, তা সামরিক বাহিনী নির্ধারণ করবে, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট নয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ শেষ করার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন একটি প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নিতে চাইছেন, যার ওপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেই তার। এর জন্য সম্মতি প্রয়োজন তেহরানেরও।
তাদের ভাষ্য, ইরান এখনও নিশ্চিত যে যুদ্ধে তাদের জয়ের প্রধান হাতিয়ার হরমুজ এবং পরিস্থিতি তাদের পক্ষেই রয়েছে। তাই আলোচনায় ফেরার তাড়া নেই তেহরানের।
এরই মধ্যে তেহরানের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে, লেবাননে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের কারণে ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পুনরায় শুরু করার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে ইরান।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত, ভাষান্তর : মাহমুদুল হাসান রিফাত


