খামেনির পূর্ণ বৃত্তের সমাপ্তি
মাশহাদে শুরু, মাশাহাদেই শেষ

সংগৃহীত ছবি
মাশহাদ থেকে শুরু হয়েছিল তার জীবনযাত্রা। সূর্যের নগরী, ইমাম রেজার পবিত্র রওজার ছায়ায় যে শিশুর শৈশব কেটেছিল, সময়ের দীর্ঘ পরিক্রমায় সেই মানুষটিই ফিরে এসেছেন একই পবিত্র প্রাঙ্গণের সান্নিধ্যে। মাঝখানের পথটি ছিল সংগ্রামের, জ্ঞানচর্চার, নেতৃত্বের, ত্যাগের এবং ইতিহাসের এক উত্তাল অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে ওঠার।
আজ সেই দীর্ঘ যাত্রার একটি পূর্ণ বৃত্ত সম্পন্ন হয়েছে।
চার কোটির বেশি মানুষের অশ্রু, দোয়া, মোনাজাত আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শহীদ আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী হোসেইনি খামেনি তার শেষ পার্থিব যাত্রা সম্পন্ন করেছেন। ইমাম রেজার পবিত্র নগরী আজ তার সন্তানকে বুকে ধারণ করেছে, চিরন্তনের পথে তার শেষ প্রত্যাবর্তনের সাক্ষী হয়ে।
মৃত্যু ইসলামী দৃষ্টিতে কোনো সমাপ্তি নয়; এটি এক জগত থেকে অন্য জগতে যাত্রা, ক্ষণস্থায়ী জীবন থেকে চিরস্থায়ী বাস্তবতার দিকে প্রত্যাবর্তন। তাই কিছু বিদায় কেবল একজন মানুষের প্রস্থান নয়, বরং তা হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক স্মরণীয় অধ্যায়, যেখানে সময়, স্থান, বিশ্বাস ও স্মৃতি এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়।
মাশহাদ যেন জনসমুদ্র
তেহরান থেকে কোম, নাজাফ থেকে কারবালা, আর শেষ পর্যন্ত মাশহাদ। কয়েক দিনব্যাপী বিস্তৃত এই বিদায়যাত্রা পরিণত হয়েছিল শোক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব মহাস্রোতে। বিভিন্ন হিসাব ও প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান ও ইরাকজুড়ে অনুষ্ঠিত জানাজা ও বিদায় অনুষ্ঠানে প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় প্রায় এক কোটি মানুষ তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। ইরানের তেহরান, কোম ও মাশহাদে অংশ নেন তিন কোটির বেশি মানুষ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানিয়েছেন তাদের নেতাকে।
আলেমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ, রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিত্বদের পাশে সাধারণ নাগরিক, প্রবীণ তীর্থযাত্রীদের পাশে তরুণ প্রজন্ম। কোথাও একজন বৃদ্ধ হাতে তসবিহ নিয়ে নীরবে দোয়া পড়ছিলেন, কোথাও বাবা কাঁধে শিশুকে তুলে শেষবারের মতো কফিনের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছিলেন। কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন, কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে শুধু তাকিয়ে ছিলেন বিদায়বেলার শোকযাত্রার দিকে। শোক যেন সেদিন ভাষা, পেশা, জাতীয়তা ও সামাজিক পরিচয়ের সব সীমারেখা অতিক্রম করেছিল।
তেহরানের গণপরিবহন ব্যবস্থাই সেই অভূতপূর্ব জনসমাগমের নীরব সাক্ষ্য হয়ে আছে। শোকের তিন দিনে নগরীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মেট্রো ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয়। তিন দিনে এক কোটি ৪৬ লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৩ জন যাত্রী মেট্রো ব্যবহার করেন, যা নতুন রেকর্ড। তিন হাজার ৬০০টির বেশি বাস প্রায় ৯০ লাখ যাত্রী পরিবহন করে। প্রায় দেড় হাজার ট্যাক্সি ও ভ্যান স্বেচ্ছাসেবীভাবে অনুষ্ঠানস্থলের সংযোগ সড়ক ও ফিডার রুটে সেবা দিয়ে সম্পন্ন করে প্রায় ছয় লাখ যাত্রা। সব মিলিয়ে তেহরানের গণপরিবহন ব্যবস্থা তিন দিনে দুই কোটি ৩৭ লাখ মানুষকে পরিবহন করে, যা নগরীর ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
কিন্তু এই বিদায়ের তাৎপর্য কেবল মানুষের সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়।
এর গভীর অর্থ নিহিত রয়েছে সেই পবিত্র ভূগোলে, যেখানে তার পার্থিব যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে।
ইমাম রেজা শুধু ইতিহাসের একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব নন। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র বংশধারার অষ্টম ইমাম, জ্ঞান, তাকওয়া, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের এক চিরন্তন প্রতীক।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তার পবিত্র মাজার বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কোটি মানুষের হৃদয়ের আশ্রয় হয়ে রয়েছে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে আসে নিজেদের আশা, বেদনা, কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনা নিয়ে।
সাম্রাজ্য ভেঙে গেছে, রাজবংশ বিলীন হয়েছে, ক্ষমতার অহংকার ইতিহাসের ধুলোয় মিশে গেছে; কিন্তু নেককার মানুষের স্মৃতি টিকে থেকেছে মানুষের হৃদয়ে। ইমাম রেজার রওজা যেন সেই সত্যের এক জীবন্ত সাক্ষ্য।
আর সেই পবিত্র ছায়াতলেই আজ চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন এমন একজন মানুষ, যার জীবন আহলে বাইতের শিক্ষা, ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিরোধের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল।
মাশহাদ আয়াতুল্লাহ খামেনির জীবনে বিশেষ স্থান অধিকার করেছিল তার দাফনের স্থান হওয়ার বহু আগে থেকেই। এখানেই তার জন্ম। এখানেই তিনি প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন। এখানেই তার শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে। এখানেই তিনি প্রথম অনুভব করেছিলেন জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিকতার সেই পরিবেশ, যা পরবর্তী সময়ে তার চিন্তা ও ব্যক্তিত্বকে গড়ে দেয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনজুড়ে তিনি আহলে বাইতের উত্তরাধিকারকে শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় হিসেবে দেখেননি; তিনি এটিকে নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক জীবন্ত উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন।
বিশেষ করে কারবালার ঘটনাকে তিনি কেবল শোকের স্মৃতি হিসেবে নয়, বরং মর্যাদা, আত্মত্যাগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক চিরন্তন শিক্ষা হিসেবে তুলে ধরতেন। তার বহু বক্তব্য, লেখনী ও রাজনৈতিক অবস্থানের পেছনে কারবালার সেই চেতনার প্রতিফলন খুঁজে পাওয়া যায়।
তিনি বিশ্বাস করতেন, ইতিহাসের প্রতিটি যুগে মানুষকে অন্যায়ের সামনে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করতে হয়; আপসের পথ নয়, বরং ন্যায় ও মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তার রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিটি দিকের সঙ্গে সবাই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু তার অনুসারীদের কাছে আহলে বাইতের আদর্শের প্রতি তার গভীর অনুরাগ এবং সেই আদর্শ বাস্তব জীবনে ধারণ করার প্রচেষ্টা ছিল অস্বীকার করার মতো নয়।
তাই তাদের কাছে অষ্টম শিয়া ইমামের সান্নিধ্যে তার সমাহিত হওয়া কোনো ঐতিহাসিক কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি পবিত্র আহলে বাইতের পথের প্রতি নিবেদিত একটি জীবনের শেষ অধ্যায়।
জানাজার আনুষ্ঠানিকতা শেষে তার মরদেহ ইমাম রেজার পবিত্র রওজার নিকটবর্তী দারুল জিকর মিলনায়তনে দাফন করা হয়। দাফনের আগে তার কফিন রওজা মোবারক তাওয়াফ করানো হয়। পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় এক সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত বিদায় অনুষ্ঠান।
অনুসারীদের কাছে দারুল জিকরে তার সমাহিত হওয়া শুধু একটি দাফনস্থান নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং এটি ইমাম রেজার সান্নিধ্যে এক আজীবন আধ্যাত্মিক সম্পর্কের প্রতীক। দাফনের পর ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা তার জন্য লাইলাতুল দাফনের নামাজ আদায় করেন।
একজন নেতার দাফনের মধ্য দিয়ে হয়তো একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে, কিন্তু তার স্মৃতি, তার উত্তরাধিকার এবং তার অনুসারীদের অঙ্গীকার এখনও লাখো মানুষের হৃদয়ে জীবন্ত হয়ে রয়েছে।
এই ঘটনার মধ্যে আরও একটি গভীর শিক্ষা লুকিয়ে আছে।
মানুষ প্রায়ই সম্পদ, ক্ষমতা, পদমর্যাদা ও প্রভাব দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাপ করে। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্ষয় হয়ে যায়, সাম্রাজ্য ধ্বংস হয় এবং পার্থিব মর্যাদা বিলীন হয়ে যায়। যা টিকে থাকে তা হলো সততা, নিষ্ঠা, ন্যায়পরায়ণতা এবং মানুষের সেবা।
ইমাম রেজার মাজার সেই সত্যের এক জীবন্ত প্রমাণ। যেসব রাজবংশ একসময় নিজেদের অজেয় মনে করত, তারা ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু আজও কোটি কোটি মানুষের পদচারণায় মুখর থাকে এই পবিত্র প্রাঙ্গণ।
সম্ভবত অমরত্বের রহস্য এখানেই। প্রকৃত মহানতা তাদের নয় যারা অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, বরং তাদের যারা নিজেদের উচ্চতর আদর্শের জন্য উৎসর্গ করে।
আগামী প্রজন্মও মাশহাদে আসবে। তারা ইমাম রেজার জিয়ারতের জন্য আসবে, দোয়া ও বরকত কামনা করবে। আর সেই পথেই তারা স্মরণ করবে সেই মানুষটিকেও, যিনি আজ একই পবিত্র প্রাঙ্গণের সান্নিধ্যে শায়িত।
সম্ভবত এটিই আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের এক গভীর প্রকাশ। শুধু প্রভাবশালী জীবনযাপন নয়, বরং নেককারদের সান্নিধ্যে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া; শুধু একটি প্রজন্মের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা নয়, বরং এমন এক পবিত্র ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, যা সময়ের সীমাকেও অতিক্রম করে। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শ থেকে যায়। কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়, কিন্তু বার্তা বেঁচে থাকে। দেহ মাটিতে ফিরে যায়, কিন্তু উত্তরাধিকার ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করতে থাকে।
মাশহাদের পবিত্র আকাশের নিচে, ইমাম রেজার রওজার সান্নিধ্যে, এক নেতার পার্থিব যাত্রার সমাপ্তি ঘটেছে। কিন্তু ইতিহাসের কিছু যাত্রা কবরের মাটিতে থেমে যায় না। তারা রূপ নেয় স্মৃতিতে, বিশ্বাসে এবং উত্তরাধিকারে।
৮৬ বছর আগে যে নগরী তাকে পৃথিবীর আলো দেখেছিল, সেই নগরীই আজ তাকে গ্রহণ করেছে শেষ আশ্রয়ে। ইতিহাসের ভাষায় একে হয়তো কাকতাল বলা যায়, কিন্তু বিশ্বাসীদের কাছে এটি এক পূর্ণ বৃত্তের সমাপ্তি। বৃত্তটি পূর্ণ হয়েছে, কিন্তু গল্পটি শেষ হয়নি।
লেখক : ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থায় (আইআরআইবি) কর্মরত সিনিয়র সাংবাদিক






