আগামীর সময়

তেল সংকট কি দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দেবে?

তেল সংকট কি দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দেবে?

সংগৃহীত ছবি

ইরান সংকটে জ্বালানি ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অবহেলিত দুর্বলতা ফুটে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। দেশটির আসল ঝুঁকি তেলের জোগানে নয়, বরং গাড়ির জ্বালানি অভ্যাসে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ট্যাঙ্কার নিয়ে সংবাদমাধ্যমে শোরগোল হলেও এই সংকট এটাই প্রমাণ করছে ভূ-রাজনীতি নির্ধারিত কোনো সাপ্লাই সমস্যা নয় বরং জাতীয় অবকাঠামোর গভীরে থাকা জ্বালানি চাহিদার সমস্যা।

ভোক্তাদের রক্ষা করতে মরিয়া সিউল প্রশাসন। ১৯৯৭ সালের পর এবারই প্রথম পাইকারি তেলের দামে সর্বোচ্চ সীমা বেঁধে দেওয়ার নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এই স্থিতাবস্থার মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই গত ২৭ মার্চ তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় সিউল। আন্তর্জাতিক বাজারে আকাশচুম্বী দামের সঙ্গে পাল্লা দিতে প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৭ টাকা, ডিজেল ১৫৬ টাকা এবং কেরোসিন ১২৪ টাকা করা হয়েছে।

দামের এই দ্রুত পরিবর্তন থেকে স্পষ্ট মূল্যসীমা নির্ধারণ করে সাময়িকভাবে স্বস্তি দেওয়া গেলেও বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ঠেকানো সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত দেশটিকে তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আরও স্থিতিশীল জ্বালানি উৎসের দিকে যেতেই হবে।

দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় তেল ব্যবহারকারী দেশ। বৈশ্বিক ব্যবহারের প্রায় ২.৫ শতাংশ হয় দেশটিতে। তাদের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১২৫ মিলিয়ন টন। দেশটির জ্বালানি উৎসের ৯০ শতাংশই আসে বিদেশ থেকে। এর বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল। কাঠামোগতভাবেই দেশটি এমন এক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে যা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তাদের হাতে নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য তেলের নেশা কাটানো কঠিন, কারণ পেট্রকেমিক্যাল থেকে শুরু করে প্রধান রপ্তানি পণ্য— সবকিছুতেই এই জ্বালানির ব্যবহার মিশে আছে। তবে পদক্ষেপ নেওয়ার সবচেয়ে সহজ জায়গাটি হলো পরিবহন খাত, যেখানে মোট তেলের ২৬.৪ শতাংশ ব্যবহৃত হয় এবং এই খাতটিই পিছিয়ে।

জটিল কারখানার তুলনায় পরিবহন খাতে চালকরা সরাসরি ও প্রতিদিন বিপুল তেল ব্যবহার করেন। ফলে তেলের চাহিদা গোড়া থেকে কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) রূপান্তর। কিন্তু ঠিক এই জায়গাটিতেই অগ্রগতি থমকে আছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির মাত্র ৩ শতাংশ সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক। দেশটির অটোমোবাইল বাজারে হুন্দাই (জেনেসিসসহ) ও কিয়ার মতো দেশীয় কোম্পানিগুলোর আধিপত্য ৯৫ শতাংশের বেশি। তাদের ব্যবসায়িক কৌশলই আসলে নির্ধারণ করে ইভিতে রূপান্তর কতটা দ্রুত হবে। এখন পর্যন্ত তারা দ্রুত ইলেকট্রিক মডেলে যাওয়ার চেয়ে হাইব্রিড গাড়ির দিকেই বেশি নজর দিয়েছে।

বৈদ্যুতিক গাড়িতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করতে হলে অপর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো, গাড়ির উচ্চমূল্য ও অসংলগ্ন সরকারি নীতির মতো বাধা পরিকল্পিতভাবে দূর করতে হবে। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরের এলাকাগুলোয় ব্যক্তিগত গাড়ি ইভিতে রূপান্তরই তেলের চাহিদা কমানোর একমাত্র পথ।

ইতিহাস বলে, আজকের মতো তেল সংকট অনেক সময় মোড় পরিবর্তনের সুযোগ হয়ে আসে। সত্তরের দশকের তেল সংকট টয়োটা, নিসান বা হোন্ডার মতো জাপানি কোম্পানিগুলোকে জ্বালানি সাশ্রয়ী গাড়ি তৈরির মাধ্যমে বিশ্ববাজার দখলে সাহায্য করেছিল। বর্তমানে চীনও ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে একই কাজ করছে এবং তারা ইতিমধ্যে অনেকটা এগিয়ে গেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জন্যও এখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তেলের বাড়তি দাম ইতিমধ্যে মানুষকে ইলেকট্রিক গাড়ির দিকে ঝুঁকতে উৎসাহিত করছে, যা চালকদের তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকে বাঁচাবে। চীন ও নরওয়ের মতো দেশগুলো ইরান সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়ায় অতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কারণ তাদের পরিবহনের বড় অংশ পেট্রল বা ডিজেলের বদলে বিদ্যুতে চলে।

এই সংকট বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বিপর্যয় আনলেও ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতাদের জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করেছে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এশিয়া জুড়ে বিওয়াইডি বা ভিনফাস্টের শোরুমগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে। তেলচালিত গাড়ি বদলে ইলেকট্রিক গাড়ি নিতে চাইছেন ক্রেতারা। কোরিয়ান নির্মাতারা যদি এই সুযোগ নিতে দেরি করে, তবে তারা বাজার হারাবে।

তবে এই পরিবর্তন শুধু ক্রেতাদের ওপর ছেড়ে দিলে হবে না; সরকার ও গাড়ি নির্মাতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সরকার কার্বন নিঃসরণ কমানোর দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য ঠিক করলেও তেলের ট্যাক্স কমানোর মতো সাময়িক নীতিগুলো আসলে বড় পরিবর্তনকে বাধাগ্রস্ত করছে। একে 'প্রশাসনিক জড়তা' বলা যেতে পারে, যা ইলেকট্রিক গাড়িতে রূপান্তরের পথে অন্তরায়।


এখন যা প্রয়োজন তা হলো— তেলচালিত ইঞ্জিন বন্ধ করার একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা; বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য শক্তিশালী ও স্থায়ী প্রণোদনা দেওয়া; চার্জিং নেটওয়ার্ক দ্রুত বাড়ানো ও গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো।

সংকট সাধারণত সাধারণ সময়ে আড়ালে থাকা দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। তেলের ওপর দক্ষিণ কোরিয়ার এই নির্ভরতা এখন আর তাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়— এটি একটি সরাসরি ও ব্যয়বহুল বাস্তবতা। প্রশ্ন এখন এটা নয় যে দেশটি তেলের ব্যবহার ছাড়বে কি না, বরং প্রশ্ন হলো তারা দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে পারবে কিনা।

এটি কেবল তেলের দামের বিষয় নয় বরং আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও শিল্পক্ষেত্রে নেতৃত্বের লড়াই। আর এই তিন ক্ষেত্রেই দক্ষিণ কোরিয়া বর্তমানে খুব ধীরে চলছে।

লেখক: গ্রিনপিস ইস্ট এশিয়া, সিউলের জলবায়ু ও জ্বালানি আন্দোলনকর্মী

    শেয়ার করুন: