ফ্রান্সে বাংলাদেশিরাই কেন নিজ দেশের মানুষকে এড়িয়ে চলে?

প্রতীকী ছবি
বিদেশের মাটিতে নিজের দেশের মানুষকেই সাধারণত সবচেয়ে কাছের মনে হয়। একই ভাষা, সংস্কৃতি ও দেশের পরিচয় নতুন অভিবাসীদের মধ্যে নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি করে। তবে ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে এর বিপরীত একটি বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। অনেক বাংলাদেশি এখন নিজের দেশের মানুষের সঙ্গেই দূরত্ব বজায় রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন।
গত কয়েক দশকে ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটি বড় হয়েছে। প্যারিস, কান, নিস, লিয়ঁ, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসা, চাকরি ও নানা পেশায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন বাংলাদেশিরা। প্রবাসী সংগঠনগুলোর ধারণা, ফ্রান্সে বাংলাদেশি ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা এক লাখের বেশি।
এই কমিউনিটিতে সাফল্যের পাশাপাশি কিছু অস্বস্তিকর অভিযোগও রয়েছে। নতুন অভিবাসীদের সহযোগিতার নামে সুযোগ নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে অসন্তোষ, ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব এবং পারস্পরিক আস্থার সংকট নিয়ে কথা বলছেন অনেকে।
ফ্রান্সে নতুন আসা বাংলাদেশিদের জন্য নিজের দেশের মানুষই সাধারণত প্রথম ভরসা। ফরাসি ভাষা, আইন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে পরিচিত না থাকায় কাজ, বাসা কিংবা প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য তারা পরিচিত বাংলাদেশিদের ওপর নির্ভর করেন।
তবে কিছু অভিবাসীর অভিযোগ, এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেন। বিশেষ করে ভাষা ও প্রশাসনিক নিয়ম সম্পর্কে যাদের ধারণা কম, তারা সমস্যায় পড়লেও অনেক সময় প্রতিবাদ করতে পারেন না।
কান শহরের বাসিন্দা ‘আরিফ’ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘বিদেশে এসে প্রথমে নিজের দেশের মানুষকেই বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু কিছু অভিজ্ঞতার পর অনেকে আর আগের মতো সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে চান না।’
তার ভাষ্য, নতুন অভিবাসীদের কাজ, বাসা কিংবা কাগজপত্রের জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে কেউ সমস্যায় পড়লে চাকরি বা অন্যান্য সুযোগ হারানোর ভয়ে অনেক সময় চুপ থাকতে বাধ্য হন।
ফ্রান্সে বাংলাদেশি মালিকানাধীন দোকান, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক মালিক দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। তবে কিছু কর্মীর অভিযোগ, কোথাও কোথাও দীর্ঘ সময় কাজ করানো, অতিরিক্ত শ্রমের হিসাব পরিষ্কার না থাকা, ছুটি পেতে সমস্যা এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাংলাদেশি কর্মী বলেন, ‘অনেকেই দেশে পরিবার রেখে এখানে আসে। চাকরি চলে যাওয়ার ভয়ে তারা সব কথা বলতে পারে না।’
অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও বলে আসছে, ভাষাগত সমস্যা, আইনি জ্ঞানের অভাব এবং অনিশ্চিত অবস্থায় থাকা অভিবাসীরা শোষণের ঝুঁকিতে থাকেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তথ্যের অভাব, ভাষাগত বাধা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দুর্বল অবস্থানে থাকা অভিবাসীরা অনেক সময় নিজেদের অধিকার দাবি করতে পিছিয়ে যান।
তবে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করেন, কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে পুরো কমিউনিটিকে বিচার করা ঠিক নয়। তাদের মতে, ফ্রান্সে ব্যবসা পরিচালনায় ভাড়া, কর ও কর্মচারীদের খরচসহ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসবের মধ্যেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিয়ম মেনে কাজ করার চেষ্টা করেন।
ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়েও কিছু বাংলাদেশি ক্রেতার অসন্তোষ রয়েছে। কয়েকজনের অভিযোগ, কিছু দোকানে পণ্যের দাম, হিসাব ও রসিদ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
প্যারিসের বাসিন্দা ‘মাহমুদ’ (ছদ্মনাম) বলেন, ‘নিজের দেশের দোকানে গেলে ভাষার সুবিধা পাওয়া যায়। কিন্তু দাম বা হিসাব নিয়ে সমস্যা হলে মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়।’
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। কমিউনিটির অনেকেই এখন আয়, ব্যবসা, পারিবারিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত পরিকল্পনা অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে আলোচনা করতে চান না। অতীতের খারাপ অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক প্রতিযোগিতা, ভুল বোঝাবুঝি এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
একজন প্রবাসী বলেন, ‘আগে মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়াত। এখন অনেকেই মনে করেন, বেশি ঘনিষ্ঠ হলে পরে সমস্যা হতে পারে।’
সাংবাদিক মোমিন আনসারী বলেন, ‘প্রবাসে একটি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বাস। যখন সেই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যায়, তখন একই দেশের মানুষও একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়।’
তার মতে, স্বদেশি পরিচয় মানুষের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরির কথা। তবে সেই পরিচয় কখনো অন্যায়, অসততা কিংবা কারও অধিকার ক্ষুণ্ন করার কারণ হতে পারে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে শুধু ব্যক্তিগত আচরণ নয়; অভিবাসনের চাপ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, আইনি জ্ঞানের অভাব এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতাও ভূমিকা রাখছে।
তবে পুরো কমিউনিটির চিত্র নেতিবাচক নয়। বহু বাংলাদেশি উদ্যোক্তা নতুন অভিবাসীদের সহযোগিতা করছেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছেন এবং সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন একজন বাংলাদেশি আরেকজন বাংলাদেশির ওপর আগের মতো আস্থা রাখতে পারছেন না?
প্রবাসে সফলতা শুধু অর্থ উপার্জনের বিষয় নয়। একটি শক্তিশালী কমিউনিটি গড়ে ওঠে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস ও সহযোগিতার ভিত্তিতে। ফ্রান্সের বাংলাদেশি কমিউনিটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সেই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা।






