বিএফআইইউর প্রতিবেদন
পাচার হওয়া ৮০ হাজার কোটি টাকা গোয়েন্দা জালে, ৪০০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান শনাক্ত
- অনুসন্ধানে সিআইডি দুদক, এনবিআরসহ সরকারের সাত সংস্থা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এবার পাচার হওয়া ৮০ হাজার কোটি টাকা ঢুকেছে গোয়েন্দা জালে। শনাক্ত হয়েছে এর সঙ্গে জড়িত ৪০০ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান। এ টাকা ফেরাতে এরই মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শেষ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। একই ঘটনায় অনুসন্ধানে নেমেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ (এনবিআর) সরকারের আরও সাতটি প্রতিষ্ঠান। বিএফআইইউর সর্বশেষ প্রতিবেদনে (গত জুন পর্যন্ত) উঠে এসেছে এসব তথ্য।
এর আগে প্রথম দফায় ১০টি বড় শিল্প গ্রুপ ও শেখ হাসিনাসহ তার পরিবারের সদস্যদের পাচার করা ৭৬ হাজার কোটি টাকা উদ্ধারে চূড়ান্তভাবে তদন্ত শেষ হয়েছে। এখন চলছে মামলার প্রস্তুতি। এ ছাড়া আরও ৪২টি খেলাপি প্রতিষ্ঠানের পাচার করা প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা ফেরাতে প্রাথমিক তদন্ত শেষে অধিকতর তদন্ত শুরু হয়েছে।
সূত্রের ভাষ্য, পাচারের ৮০ হাজার কোটি টাকার সিংহভাগই পাচার হয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সান ফ্রান্সিসকো, পানামা ও পাপুয়া নিউগিনি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এসব দেশে এরই মধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া পাচারের একটি অংশ দেশেই রয়েছে। এক্ষেত্রে জড়িত ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এ টাকা বিদেশে পাঠানো না হলেও সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে এগুলো আইন অনুযায়ী পাচার হিসেবে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বিএফআইইউ।
সমন্বিত যৌথ টাস্কফোর্স কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাচারের সঙ্গে জড়িত ৪০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ উদ্ধারে পুরোদমে কাজ করছে এজেন্সিগুলো। তাদের হিসাবে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। অনেকের হিসাব এরই মধ্যে অবরুদ্ধ কিংবা জব্দ করা হয়েছে। তদন্তের জন্য কোনো কোনো হিসাব জব্দের মেয়াদ দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে। অন্তত ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। ব্যক্তির মধ্যে অধিকাংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা, সাবেক আমলা এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাসহ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ব্যবসায়ী রয়েছেন।
বিএফআইইউর প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন আগামীর সময়কে বলেছেন, ১০ বড় গ্রুপ এবং হাসিনা পরিবারের মামলা দ্রুত সময়ে করা হবে। আর ৪২টি গ্রুপের অর্থ উদ্ধারে বিদেশে ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। আরও কয়েকশ গ্রুপ এবং ব্যক্তির হিসাবে জাল পাতা হয়েছে। নির্ধারিত ছক অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়নশীল দেশ থেকে যে অর্থ পাচার হয়, হিসাব বলছে তার মাত্র ১ শতাংশ ফেরত আনতে পারে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো। আর সেটাও ফেরত আনতে গড়ে সাত-আট বছর লাগে বা তারও বেশি। বাংলাদেশও মাত্র একবার ফেরত আনতে পেরেছিল সিঙ্গাপুর থেকে। তাতে ঠিক সাত বছর লেগেছিল। ফলে ফেরত আনা এক জটিল প্রক্রিয়া। যেসব দেশে পাচার হয়, সেখানে পাচারের অর্থের সুরক্ষা দেওয়া হয়। এ কারণে কানাডা, মালয়েশিয়া, দুবাই, সিঙ্গাপুর— তারা তো এ পাচার বিষয়ে কথাই বলতে চায় না।
তিনি আরও বললেন, ‘আমাদের এখান থেকে পাচার হয়েছে সেটা তো আমাদের ফল্ট, কিন্তু যেসব দেশ পাচারের অর্থের সুরক্ষা দেয় তাদের ব্যাপারে আমাদের কথা বলা প্রয়োজন। তাদের কনভিন্স করা দরকার, তারা যাতে সুরক্ষা না দেয়। ল ফার্মগুলো পাচার করা অর্থ বিদেশে বৈধ বিনিয়োগ বা বৈধ করার পথ দেখায়। এখন তারাই আবার পাচারের টাকা ফেরত আনার জন্য কাজ করে।’
এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেলের (সিআইসি) অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, অস্ট্রিয়া, ডমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, মাল্টা, সেন্ট লুসিয়া ও তুরস্কের সাতটি শহরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পাচার হওয়া সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, সরকার বদলের পর ফ্রিজ করা হিসাবের পরিধি ছয় শতাধিক ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান এবং ৯ হাজারের বেশি ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়।
৮০ হাজার কোটি টাকা পাচারের নেপথ্যে যারা
জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন— কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমু, দীপু মনি, আসাদুজ্জামান খান কামাল, নসরুল হামিদ বিপু, মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, শামীম ওসমান, ছায়েদুর রহমান, লিয়াকত সিকদার, হাছান মাহমুদ, আসাদুজ্জামান নূর, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদ, রুখমিলা জামান, এ এইচ এম মোস্তফা কামাল, টিপু মুনশি, জুনাইদ আহমেদ পলক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, গাজী মো. মোজাম্মেল হক, মো. তাজুল ইসলাম, আ ফ ম রুহুল হক, মহীউদ্দীন খান আলমগীর, এ কে এম বাহাউদ্দিন বাহার, মমতাজ বেগম, বিপ্লব কুমার সরকার। এ ছাড়া আছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, সাবেক বিএসইসির চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম, ওবায়দুল্লাহ আল মাসুদ (রূপালী ব্যাংক সাবেক এমডি), চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, পারভেজ তমাল, মোহাম্মদ আদনান ইমাম, নাফিসা কামাল (ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক)।
জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— এশিয়াটিক টকিং পয়েন্ট কমিউনিকেশনস লিমিটেড, অপটিমাম সার্ভিস লিমিটেড, ইউনিভার্সাল ফাইন্যান্সিয়াল সলিউশনস, এশিয়াটিক টিএমএস, ব্ল্যাকবোর্ড স্ট্র্যাটেজিজ, কুকি জার, স্টেনসিল বাংলাদেশ, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান এসপিসি ওয়ার্ল্ড এক্সপ্রেস, ২৪ টিকিট, আকাশ নীল, ই-অরেঞ্জ, আলিশা মার্ট, আলিফ ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং লিমিটেড, দালাল প্লাস ডটকম, ধামাকা, আনন্দের বাজার, অ্যামাস বিডি, ওয়ালমার্ট, রিং আইডি বিডি লিমিটেড, থলে ডটকম ও অ্যামাস বিডি।



