আধিপত্যের লড়াইয়ে বাড়ছে প্রাণহানি
- দেড় বছরে রাজনৈতিক সংঘর্ষে নিহত ১৫৭, আহত ৭ হাজার ৩৮১
- চলতি বছরের ছয় মাসে ৮৩০ সহিংস ঘটনায় প্রাণ গেছে ৫৬ জনের
- মতাদর্শ নয়—আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও দলীয় কোন্দলই সহিংসতার মূল চালিকাশক্তি

ছবি: এআই
রাজনৈতিক সহিংসতার চরিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। মতাদর্শ বা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের পরিবর্তে এখন স্থানীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই সহিংসতার প্রধান উৎস হয়ে উঠছে। এর ফলে রাজনৈতিক কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও হামলা, গুলি ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন।
মানবাধিকার সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্টদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দেড় বছরে দেশে অন্তত ৭৪৮টি রাজনৈতিক সংঘর্ষে ১৫৭ জন নিহত এবং ৭ হাজার ৩৮১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৮৬ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাদের বড় অংশই দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের শিকার।
চলতি বছরেও পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতার ৮৩০টি ঘটনায় ৫৬ জন নিহত এবং ৫ হাজার ২৪৬ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে ঘটনার সংখ্যা ছিল ৫২৯টি। যদিও সে সময় নিহতের সংখ্যা ছিল ৭৯ জন।
এইচআরএসএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের রাজনৈতিক সহিংসতার ৬৭৩টি ঘটনা, অর্থাৎ প্রায় ৮১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তঃকোন্দলের ২৭৩টি ঘটনায় ৩১ জন নিহত এবং ২ হাজার ৯২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষের ২৯০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১০ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৫২ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগ সংঘর্ষের ৭৭টি ঘটনায় সাতজন নিহত এবং ৪৬৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক সংঘর্ষেও কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন।
দলীয় কোন্দলের ধারাবাহিকতা
চলতি মাসেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। গত মঙ্গলবার রাজধানীর সবুজবাগে পূর্বশত্রুতার জেরে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী মো. পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর কয়েক দিন আগে কাফরুল থানা বিএনপির সদস্যসচিব মো. হাফিজুল ইসলাম বাবুকে কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় এলোপাতাড়ি গুলিতে আহত হন এক সবজি বিক্রেতা ও এক পথচারী। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আসন্ন কাউন্সিলর নির্বাচন, জমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
এর আগে ৮ জুলাই মিরপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সিজুকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা অস্ত্রসহ এক সন্দেহভাজনকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। গুলিবিদ্ধ হলেও তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
গত ৯ জুন বাগেরহাটের ফকিরহাটে ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আহত হন স্থানীয় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল্লাহ মোড়ল। এর এক দিন আগে রাজধানীর মৌচাক এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ছুরিকাঘাতে নিহত হন স্বেচ্ছাসেবক দলনেতা বিল্লাল হোসেন। ওই ঘটনায় যাদের নাম এসেছে, তাদের যুবদলের নেতাকর্মী হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
পরিসংখ্যানে সহিংসতার বিস্তার
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বলছে, গত দেড় বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৫৭ জনের মধ্যে ৮৬ জনই বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। গত বছর রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হন ১০২ জন এবং আহত হন ৪ হাজার ৭৪৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৭০ জন ছিলেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী। শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ১৯২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত এবং অন্তত ২ হাজার ৩৮০ জন আহত হন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৬৩৬ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ৭৯টি ঘটনায় ১৪ জন নিহত এবং ৭৪৫ জন আহত হন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দুষ্কৃতকারীদের হামলার অন্তত ৬৪টি ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৮ জন নিহত এবং ৯০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে শতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। দলীয় কোন্দলকে কেন্দ্র করে ৯ শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
অস্ত্রের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১ মে থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ২৪৪টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ হাজার ৩১৭ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৮৮টি ম্যাগাজিন, ৪৩টি হাতবোমা এবং সোয়া ২ কেজি গানপাউডার উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে অবৈধ অস্ত্রধারী ৬২৫ জন এবং চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী ১ হাজার ১৯১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা রুট এবং থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া থেকে অবৈধ অস্ত্রের চালান দেশে প্রবেশ করছে। এসব চালানের মূল্য পরিশোধ করা হচ্ছে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আনা অস্ত্রের একটি অংশ এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে বলেও তথ্য রয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বললেন, গত ১ মে থেকে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চলছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকা কিছু দুর্বৃত্ত দেশে ফিরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
‘আধিপত্যের রাজনীতি সংঘাত বাড়াচ্ছে’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে স্থানীয় পর্যায়ে পদ, প্রভাব ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিরোধও রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সংঘাতে রূপ নেয়। তার মতে, আধিপত্য বিস্তার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতকে আরও তীব্র করছে। এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে সরকার ও রাজনৈতিক দলকে পৃথক রাখা, সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।
র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) কর্নেল ইফতেখার আহমেদ বললেন, র্যাব রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধকেই বিবেচনায় নেয়। তাদের কাছে অপরাধী কেবল অপরাধী।






