অর্থমন্ত্রী
জ্বালানি সংকট নিরসনে অন্তত ২ বছর লাগবে

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট দূর করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক জায়গায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তবে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে সরকার হাত গুটিয়ে বসে নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানালেন, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে জ্বালানি খাতের একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্পষ্ট নীতিমালা ঘোষণা করা হবে, যাতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা তাদের ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক পরিকল্পনা সঠিকভাবে নিতে পারেন।
আজ রবিবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে এক সভায় বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের প্রকৃতচিত্র তুলে ধরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী। এটি আয়োজন করে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম)।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতিকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবাই বিদ্যুৎ ও গ্যাস নিয়ে উদ্বেগের কথা বলছেন। আমরা সত্যিই এক ধরনের কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, এই সংকট আমরা অতীত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। দুর্ভাগ্যবশত, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিষয়গুলো এমন নয় যে চাইলেই ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে অলৌকিকভাবে সমাধান করে ফেলা যাবে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য সর্বনিম্ন দুই বছর সময় প্রয়োজন এবং আমরা এই সংকট দূর করতেই দিনরাত লড়াই করে যাচ্ছি।
শিল্পকারখানায় গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ঋণ পরিশোধে তৈরি হওয়া জটিলতা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বললেন, আমাদের হাতে তো কোনো জাদু নেই যে আমরা হঠাৎ করে মুহূর্তের মধ্যে দ্রুত গ্যাস ফিরিয়ে আনব। দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন মিথ্যা আশ্বাস দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না। কারণ গ্যাস পাওয়ার প্রক্রিয়াটি রাতারাতি সম্ভব নয়। নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে গ্যাস পেতে সর্বনিম্ন দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগবেই।
জ্বালানি জোগানের বিকল্প হিসেবে সরকার এখন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীসহ অন্যান্য সম্ভাব্য স্থানে ‘ওপেন-পিট’ বা উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের দিকে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের সামনে আর দ্বিতীয় কোনো বিকল্প পথ খোলা নেই। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের দেশীয় সম্পদ কাজে লাগাতেই হবে।’
বিদ্যুৎ খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, কাগজে-কলমে যে পরিসংখ্যান দেখানো হয়, বাস্তবে বিদ্যুৎ পাওয়ার সক্ষমতা তার চেয়ে অনেক কম। প্রচুর উৎপাদনের কথা বলা হলেও মূল সমস্যা দেখা দিয়েছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোয়। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ এবং দেশীয় কয়লার সমন্বয়ে একটি বাস্তবসম্মত ‘পাওয়ার মিক্স’ গঠন করছে।
আংশিক বা খণ্ড খণ্ড পদক্ষেপ না নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণের কথা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বললেন, আংশিক কথা বলে ব্যবসায়ীদের বিভ্রান্ত করার কোনো অর্থ হয় না। দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে যে নতুন জ্বালানি নীতি আসবে, তা দেখে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারবেন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পেতে ঠিক কত দিন সময় লাগবে এবং সেই অনুযায়ী তারা ব্যবসার রূপরেখা তৈরি করতে পারবেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে অ্যামচেমের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল বলেন, বাংলাদেশে উদীয়মান প্রযুক্তি, ডিজিটাল উদ্ভাবন ও পরিষেবা খাতসহ বহু সম্ভাবনাময় সেক্টরে মার্কিন বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর ভালো সুযোগ রয়েছে। তবে এই সুযোগকে দীর্ঘমেয়াদি আস্থায় রূপান্তর করতে হলে শুধু নতুন নীতি বা আইন প্রণয়ন করলেই চলবে না; সেগুলোর ধারাবাহিকতা ও পূর্বানুমানযোগ্য বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনিক ও নিয়ন্ত্রক বাধা দূর করার মাধ্যমে সংস্কারগুলোকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দিতে পারলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও মূলধন আকর্ষণের জন্য সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্যে পরিণত হবে।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব উর রহমান বলেন, যেকোনো বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে মূলধনের নিরাপত্তা, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক পরিবেশই মূল অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ যদি নিজস্ব প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে পারে, তবে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় খাতেই বিনিয়োগের গতি ত্বরান্বিত হবে।







