২০ শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন
পাঁচ বছরের প্রকল্প যাচ্ছে সাড়ে ১২ বছরে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে নেই গতি। পাঁচ বছরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবায়নে সময় লাগছে ১২ বছর ৪ মাস। এতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্যোগ। একই সঙ্গে বাড়ছে প্রকল্পের ব্যয়ও।
এ অবস্থায় প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবটি নিয়ে আগামী ৪ আগস্ট প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বারবার সংশোধনের কারণ নিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘কর্মজীবী মা-বাবাকে নিশ্চিন্তে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দিতে ১০টি জেলায় ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নতুন আঙ্গিকে স্থাপন ও পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী কর্মজীবী নারীদের সন্তানদের দিবাকালীন পরিচর্যা নিশ্চিত করার কথা।’
‘প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে বারবার মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। এখনো এর বাস্তব অগ্রগতি ৬০ শতাংশের নিচে। তুলনামূলক ছোট এই প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ এবং ধারাবাহিক বিলম্বের বিষয়ে আগামী ৪ আগস্টের পিইসি সভায় প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।’—যোগ করেন তিনি।
সূত্র বলছে, প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের মার্চ থেকে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, অর্থাৎ পাঁচ বছর। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় চার দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। এরপরও কাজ শেষ না হওয়ায় তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট সময় লাগবে ১২ বছর ৪ মাস।
এদিকে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে তা বেড়ে হয় ৮৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সর্বশেষ তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবে আরও ২৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ১১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন আগামীর সময়কে জানালেন, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের মতো উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
তিনি বললেন, ‘কোনো প্রকল্পের বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে ব্যয় বাড়ে, এ প্রকল্পেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এতে যেমন সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তেমনি যেসব কর্মজীবী মা-বাবা এ প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তারাও নির্ধারিত সময়ে সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।’
প্রকল্পের আওতায় ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য দিবাকালীন পরিচর্যার ব্যবস্থা করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্যসেবা, শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং প্রারম্ভিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা, গাজীপুর ও রংপুর মেট্রোপলিটনসহ সাতটি জেলা সদরে মোট ২০টি আধুনিক শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত ১২ জন জনবল নিয়োগ, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, ১২টি শিক্ষণীয় কর্নার এবং বয়সভিত্তিক খেলনা ও শিক্ষা উপকরণ রাখার কথা রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রতি বছর ১ হাজার ২০০ শিশুর দিবাকালীন পরিচর্যা, ৪৮০ শিশুর প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা এবং সমসংখ্যক কর্মজীবী নারীর নির্বিঘ্নে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশোধনের কারণ
প্রকল্পটি সংশোধনের কারণ হিসেবে প্রকল্পটি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের ধারাবাহিকতা রাজস্ব বাজেটে বজায় রাখতে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া ৬৩ জন জনবলের পদ সৃজনের প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন। এ কার্যক্রমটি গত জুনের মধ্যে শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বৃদ্ধি প্রয়োজন। এছাড়া বেসরকারি ভবনে স্থাপিত ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে ১৩টি সরকারি ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। অবশিষ্ট ৭টি কেন্দ্র (রংপুর, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার, গাইবান্ধা, নওগাঁ, চাঁদপুর, নোয়াখালী) স্থানান্তরের জন্য সময় প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক কোড সংযোজন করা হয়েছে। যেমন বিশেষ সুবিধা, কমিটির সম্মানী, ও মোটরযান মেরামত কোড।
যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে পিইসি
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিতব্য প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা এবং বারবার সংশোধনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে।
সূত্র জানায়, সম্পূর্ণ সরকারি (জিওবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনীতে ব্যয় ৩৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর (এমটিবিএফ) ছক যথাযথভাবে পূরণ করা হয়নি। এ ছাড়া চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্পটির জন্য মাত্র ১ লাখ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অতিরিক্ত অর্থ কীভাবে সংস্থান বা সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
এ ছাড়া প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বড় অংশ চারটি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সাকুল্য বেতন ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, আউটসোর্সিং ২১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা, খাদ্যসামগ্রী ১৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং অফিস ভবন ভাড়া ১২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এই চার খাতেই মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৭৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ ব্যয়ের প্রস্তাব রয়েছে। এসব ব্যয়ের প্রাক্কলন, হার বা একক মূল্যের ভিত্তি এবং প্যাকেজভিত্তিক বিভাজনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।
যেসব এলাকায় হবে দিবাযত্ন কেন্দ্র
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, টাঙ্গাইল সদর, গাজীপুর ও রংপুর সিটি করপোরেশন এবং গাইবান্ধা, নওগাঁ, নোয়াখালী, চাঁদপুর ও কক্সবাজার পৌরসভায় মোট ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।






