কে জানত এক মাস হওয়ার আগেই ছাড়তে হবে বাড়িটি!
- মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ

সদ্য পদত্যাগ করা পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের সরকারি বাসভবন। ছবি— আগামীর সময়
রবিবার সকাল ১০টা বেজে ১০ মিনিট। রাজধানীর বেইলি রোডের সুবিশাল সুরম্য পার্বত্য কমপ্লেক্সের সামনে সুনসান নীরবতা। গেটে দাঁড়ানো প্রহরী মারুফ হোসেনের কাছে জেনে নিয়ে সামনে পা বাড়ালাম। গন্তব্য— সদ্য পদত্যাগ করা পার্বত্যমন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের সরকারি বাসভবন। মাত্র ৭ দিন আগে তিনি পদত্যাগ করেছেন।
বাড়ির প্রবেশপথেই দেখা গেল জেলা মৎসজীবী দলের আহ্বায়ক নুরুল আলম বাছাকে। গত মঙ্গলবার দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের প্রতিবাদে রাঙামাটি শহরের রিজার্ভ বাজারে বিক্ষোভ সমাবেশে ‘উল্টাপাল্টা বক্তব্য’ দিয়ে এরই মধ্যে জেলা বিএনপি থেকে কারণ দর্শানো নোটিস পেয়েছেন।
মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বের হয়ে যাচ্ছিলেন নুরুল আলম বাছা। জানালেন, তার বক্তব্য বিকৃত করে তাকেই ভিকটিম বানানো হচ্ছে। সেই বেদনার কথাই জানাতে এসেছিলেন সাবেক মন্ত্রীর কাছে।
বাসার নিচতলায় যে রুমে দর্শনার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মন্ত্রী, সেখানেই প্রথম দেখা হলো তার (সাবেক মন্ত্রী) সঙ্গে। চেয়ারে বসেছিলেন দীপেন দেওয়ান। পাশের সোফায় তার স্ত্রী মৈত্রী চাকমা। আন্তরিক কুশল বিনিময়ের পর সাবেক হয়ে যাওয়া দীপেন দেওয়ান শুরু করলেন কথা। কখনো আবেগে কাঁপছিলেন, কখনো ক্ষোভে ফুঁসছিলেন, কখনো যেন ভিজে আসছিল চোখ।
আগামীর সময়ের সব প্রতিবেদনই পড়েছেন— জানালেন এ কথা। প্রশংসা করলেন প্রতিবেদনের। বললেন বহু কিছুই। তবে সতর্ক করলেন— কোনো কিছুই প্রকাশ করা যাবে না। সংবাদমাধ্যমের পরিভাষায় যাকে বলে ‘অফ দ্য রেকর্ড’। এভাবে আটকে দিলেন চাঞ্চল্যকর পদত্যাগের প্রকৃত সত্য।
আলোচনার ফাঁকে আপ্যায়নও চলল যথারীতি। এরই মধ্যে রাঙামাটি থেকে এসেছেন দীপেনের রাজনীতির অন্যতম দুই সিপাহশালার। জেলা বিএনপির দুই সহসভাপতি সাইফুল ইসলাম ভুট্টো এবং সাইফুল ইসলাম পনির। এদের সঙ্গে দীপেন দেওয়ানের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কর্মী আলী আশরাফও আছেন।
হাসি-ঠাট্টা, আত্মসমালোচনায় কেটে যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা। নিজের স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা, কী করতে চেয়েছিলেন, অপূর্ণতার কথা বললেন। বাকিরাও জানালেন নিজেদের প্রত্যাশা, স্বপ্নভঙ্গের কথা। একই সঙ্গে দল ও দলীয়প্রধানের নেতৃত্বের প্রতি নিজের আস্থা ও অবিচল থাকার কথা শোনালেন সবাইকে।
সতর্ক করলেন— কোনো কিছুই প্রকাশ করা যাবে না। সংবাদমাধ্যমের পরিভাষায় যাকে বলে ‘অফ দ্য রেকর্ড’। এভাবে আটকে দিলেন চাঞ্চল্যকর পদত্যাগের প্রকৃত সত্য।
একপর্যায়ে মন্ত্রিপত্নী মৈত্রী চাকমা এই প্রতিবেদককে ঘুরিয়ে দেখালেন বাড়ির নিচতলা, দোতলা। নান্দনিক এই বাড়িতে উঠেছিলেন গত মাসের ১৮ তারিখ। নিজে পছন্দমতো কিছু কাজও করিয়েছেন। দোতলার বারান্দায় বসার জন্য বানিয়েছেন একটি চমৎকার চিলেকোঠা। কে জানত এক মাস হওয়ার আগেই ছাড়তে হবে বাড়িটি!
জানালেন, বাড়ি ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাসা খুঁজছেন ন্যাম ভবনের এমপি হোস্টেলে। পেলেই যেকোনো দিন সেখানে উঠবেন, আর এখন থেকে বেশিরভাগ সময় রাঙামাটিতেই থাকবেন, যোগ করেন মৈত্রী চাকমা।
সাবেক মন্ত্রীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার সময়ই কথা হলো তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মী আলী আশরাফের সঙ্গে। বলছিলেন, ‘আপনি তো কখনো আসেননি। গত ১ জুন পদত্যাগের আগে আসলে মানুষের ভিড়ে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা বা কথা বলাই অসম্ভব হতো। সব সময় মানুষ আর নেতাকর্মীদের ভিড় থাকত। এখন সুনসান নীরবতা! যেন সবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে!’
পার্বত্য কমপ্লেক্সের নিরাপত্তা প্রহরী মারুফ হোসেন বললেন, ‘স্যার অমায়িক মানুষ, আমার সাথেও সুন্দর করে কথা বলতেন। স্যারের সরকারি গাড়ি, পুলিশ প্রটোকল নেই। স্যার হয়তো যেকোনো সময় চলে যাবেন। আগে প্রচুর মানুষ আসত, এখন তেমন কেউ আসে না।’
রাজধানীর বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাবের পাশে নান্দনিক পার্বত্য কমপ্লেক্স। বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও পছন্দে নির্মিত নয়নাভিরাম এই কমপ্লেক্স তৈরির জমি নিয়েও তুমুল বিরোধিতা ছিল আমলাদের একটি বড় অংশের। তবুও বিগত সরকারের প্রবল আগ্রহে ২০১৬ সালে ১০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় এই কমপ্লেক্স।
এখানে একাধিক হলরুম, পার্বত্যমন্ত্রী ও আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যানের জন্য পৃথক বাংলোসহ আছে একাধিক রেস্টহাউস। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানসহ পাহাড় থেকে আসা যেকোনো মানুষ উঠতে পারেন এখানে। সচরাচর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের ভিড়ে সব সময় মুখর থাকে এই কমপ্লেক্স, যা এখন নীরব। অথচ মাত্র সাত দিন আগেও তিন জেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটি এখনো এখানেই আছেন। শুধু নেই তার পদ আর পতাকা। তাতেই যেন বদলে গেছে পুরো দৃশ্যপট!





