ট্রেন চালাতে অনীহা ভারতের
- ঢাকার ৩ চিঠি, একটিরও জবাব দেয়নি দিল্লি
- ২৩ মাস ধরে বন্ধ আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেসের চলাচল
- দুবার পিছিয়ে অনিশ্চয়তায় আন্তঃসরকার বৈঠক

চলছে না বাংলাদেশ-ভারত যাত্রীবাহী ট্রেন। না চলার সময়টা ঠেকেছে ২৩ মাসে। এর মধ্যে ঘটেছে অনেক কিছুই। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে দেখা দিয়েছে কূটনৈতিক টানাপড়েন। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেকটাই স্বাভাবিক। ঢাকায় ভারতীয় ভিসা কেন্দ্রও সচল হয়েছে। প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট ভিসা চালুর ঘোষণা দিয়েছে ভারত।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছেন, আগামী রবিবার থেকেই এ কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। এটাকে দুই দেশের সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ভিসা জটিলতার গতি তো হলো, এখন দুই দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেন কবে চালু হবে? সাম্প্রতিককালে অন্তত তিনবার ট্রেন চালু করার তাগাদাসহ দিল্লিকে চিঠি পাঠিয়েছে ঢাকা। কিন্তু তার সুবাদে ট্রেন চালানো বহু দূর, একটি চিঠিরও জবাব পর্যন্ত আসেনি ভারত থেকে।
অন্যদিকে প্রতি বছর যে বাংলাদেশ-ভারত আন্তঃসরকার রেলওয়ে বৈঠক হয়, সেটিও থেমে আছে। বাংলাদেশের ভাবনা ছিল, ওই বৈঠকে ট্রেন চলাচলের বিষয়টি তুলে ধরে একটা সুরাহা করা যাবে। কিন্তু বৈঠক না হওয়ায় সেই পথও বন্ধ। যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বিষয়ে সর্বশেষ অগ্রগতির খোঁজ নিতে গিয়ে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী তিনটি আন্তঃদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনও বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস আবারও চালু করতে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কথা জানিয়ে ভারত ট্রেনগুলো চালাতে রাজি হচ্ছে না বলে জানা গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে।
এসব বিষয় নিয়ে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের ট্রাফিক বাণিজ্যিক শাখার উচ্চপদস্থ দুই কর্মকর্তার সঙ্গে (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) কথা হয়েছে আগামীর সময়ের। তাদের ভাষ্য— ‘ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড মনে করে, বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রেন চালিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ভারতের খুব বেশি লাভ হয় এমন নয়। এটিকে সম্প্রীতির বন্ধন হিসেবে প্রতীকী রূপে বিবেচনা করা হয়। দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার সেই সম্প্রীতির বন্ধনকে এখনো আগের উচ্চতায় দেখছে না, তাই হয়তো যাত্রীবাহী ট্রেনও চালু হচ্ছে না।’
ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের এক কর্মকর্তা বললেন, ‘পণ্যবাহী ট্রেন চলছে, বাস চলছে, বিমানেও যাত্রী পরিবহন হচ্ছে। তাহলে ট্রেন কেন চলবে না! এটি পুরোপুরি কেন্দ্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে। আমরাও চাই ট্রেন চলুক কিন্তু সরকারের সবুজসংকেত না পেলে কোনো আলোচনাই সফল হবে না।’
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি শুধু বললেন, ‘ট্রেন চালাতে আমাদের পুরো প্রস্তুতি রয়েছে। একাধিকবার চিঠিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দুই দেশ এক জায়গায় সম্মত না হলে ট্রেন চলবে কী করে?’ আন্তঃসরকার বৈঠক কেন বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে তার বক্তব্য, ‘দুই দেশের কনভিনিয়েন্ট টাইমে বৈঠক হবে।’
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, ট্রেন চালাতে কূটনৈতিক আলোচনার কোনো বিকল্প নেই। দুই দেশের নাগরিকদের জন্যই এটি গুরুত্বপূর্ণ। আন্তঃদেশীয় ট্রেন শুধু যাত্রী পরিবহনের বাহন নয়, দুই দেশের বন্ধনেরও প্রতীক। ট্রেন চালু করতে যেসব জায়গায় প্রতিবন্ধকতা আছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করতে হবে। তবে লক্ষণীয় বিষয়, ট্রেন চালু করতে বাংলাদেশের একাধিক উদ্যোগ দেখা গেলেও ভারতের দিক থেকে সেটি দেখা যাচ্ছে না। ট্রেন চালু করতে হলে তাদেরও উদ্যোগী হওয়া দরকার।
দুবার পিছিয়ে অনিশ্চিত বৈঠক: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় রেল যোগাযোগব্যবস্থা-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে গত মার্চে ৩৮তম ‘ইন্টার-গভর্নমেন্ট রেলওয়ে মিটিং’ (আইজিআরএম) হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। সম্ভাবনা ছিল চলতি জুনে হওয়ার। সেটিও হয়নি। তবে আইজিআরএমের প্রস্তুতিমূলক সভা হয়েছে দুবার।
গত বছর ৬ অক্টোবর আন্তঃসরকার বৈঠকের আলোচ্য সূচি নিয়ে প্রস্তুতিমূলক সভা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস আবার চালুর বিষয়ে আগের চিঠির ধারাবাহিকতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবারও চিঠি দেওয়ার কথা হয়। যেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলরত যাত্রীবাহী ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীদের অতিরিক্ত মালপত্র পরিবহনের জন্য লাগেজ ভ্যান সংযুক্ত করার বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হবে।
আর রাজশাহী-কলকাতা রুটে ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে অনুমোদন চেয়ে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সরকারকে চিঠি দেবে রেলওয়ে। পরে রাজশাহী-কলকাতা রুটে ট্রেন চালাতে ভারত সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বন্ধ থাকা ট্রেন চালানোর বিষয়েও চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু সেসব চিঠির কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
পরিস্থিতির অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বললেন, ‘মাস-তিনেক হলো চিঠি গেছে। চিঠির জবাব এখনো পাইনি। আপাতত আর চিঠি যাবে এমন পরিস্থিতি দেখছি না। তবে সরকার চাইলে আমরা আবার উদ্যোগ নেব।’
এদিকে জানা গেছে, যাত্রীবাহী মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচলে পদ্মা সেতু ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। এ বিষয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভারতীয় রেলওয়েকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর কথা রেলওয়ের। এ প্রস্তাবে রাতের বেলা ট্রেন পরিচালনার বিষয়টিও উল্লেখ করা হবে। একই সঙ্গে আপ-লাইনে ক্রসওভার তৈরির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি থাকবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যাত্রীবাহী ট্রেন চালানোর বিষয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করে। তবে তাতে তেমন একটা সাড়া দেয়নি ভারত। ওই বছরের ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালন বিভাগের এক চিঠির বিপরীতে পণ্যবাহী ট্রেন চালুর বিষয়ে অনুমতি দেয় ভারত। ওই রাতেই পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলে অনাপত্তি পায় বাংলাদেশ। এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়া রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক চিঠিতে যাত্রীবাহী ট্রেন তিনটি আবার চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়।
বন্ধ করেছিল বাংলাদেশ, চালু করেনি ভারত: ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছাত্র আন্দোলনে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ। এরপর ১২ আগস্ট সারা দেশে ট্রেন চলাচল শুরু হলেও আন্তঃদেশীয় তিন যাত্রীবাহী ট্রেনের চাকা আর ঘোরেনি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আটটি ইন্টারচেঞ্জ থাকলেও পাঁচটি সচল আছে।
এর মধ্যে তিনটি পথে যাত্রীবাহী ট্রেন নিয়মিত চলাচল করত। সর্বশেষ যাত্রায় মিতালী এক্সপ্রেস নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে পৌঁছায় ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই রাতে। ট্রেনটি পরদিন রাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে নিউ জলপাইগুড়ির উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ট্রেনটির যাত্রা করা সম্ভব হয়নি। তারপর দীর্ঘদিন মিতালী এক্সপ্রেসের খালি রেক ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে আটকে ছিল। পরে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তা ভারত সীমান্তে পৌঁছে দেওয়া হয়। মিতালী এক্সপ্রেসের মতোই ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এবং খুলনা-কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী বন্ধন এক্সপ্রেসও এখন পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে এ-সংক্রান্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ কী হতে পারে— এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বললেন, ‘মূল উদ্যোগ নিতে হবে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য আমরা ভূমিকা রাখব। তবে আগের চেষ্টায় ভারত সায় দেয়নি। ফলে এখন এটি শুধু আর ট্রেনের মধ্যে আটকে নেই। দুই দেশের সরকারের চাওয়া-পাওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। ভারত সরকার যে এখনই কিছু চাচ্ছে না, এটি বোঝা যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশ সরকার কী করবে, সেটির ওপর ঠিক করা হবে পরবর্তী উদ্যোগ।’





