৩৬ ডিগ্রিতেই হাঁসফাঁস
- রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তাপপ্রবাহ

সংগৃহীত ছবি
বৃহস্পতিবার দুপুর। ঘড়ির কাঁটা তখন ১টা ছুঁইছুঁই। রাজধানীর ওপর যেন আগুন ঝরাচ্ছে সূর্য। আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে ঢাকার তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলেও বাস্তবে গরমের অনুভূতি যেন আরও তীব্র। রাস্তায় বের হলেই শরীরে লাগছে উত্তপ্ত বাতাসের ঝাপটা। আর্দ্রতা আর তাপের দাপটে চারপাশে তৈরি হয়েছে কেমন যেন গুমোট পরিবেশ। নগরজীবন যেন হাঁসফাঁস করছে প্রচণ্ড গরমে।
সকাল থেকেই রাজধানীর আকাশে ছিল রোদের দাপট। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে চাইছেন না অনেকেই। কিন্তু জীবিকার তাগিদে কিংবা জরুরি কাজে বের হতে হচ্ছে যাদের, তাদের কপালে ঘাম আর মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ফুটপাতের চায়ের দোকান, ব্যস্ত সড়ক, গণপরিবহন কিংবা মেট্রো স্টেশন— সবখানেই এক আলোচনা, কবে মিলবে এই অসহনীয় গরম থেকে স্বস্তি।
টানা তাপপ্রবাহ ও ভ্যাপসা আবহাওয়ার প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। জ্বর, ডায়রিয়া ও তাপজনিত নানা সমস্যায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হাসপাতালগুলোয়। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক এবং খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ। দিনভর গরমের সঙ্গে লড়াই করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই।
এর মধ্যে কোনো দেখা নেই বৃষ্টিরও। আকাশে মেঘের আনাগোনা থাকলেও মিলছে না স্বস্তির বৃষ্টি। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি স্থায়ী হবে না খুব বেশি দিন। কয়েক দিনের মধ্যেই আবহাওয়ায় মিলতে পারে পরিবর্তনের আভাস।
আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় দ্রুত শুকাতে পারে না মানুষের শরীর থেকে নির্গত ঘাম। এর ফলে অনুভূত তাপমাত্রা প্রকৃত তাপমাত্রার তুলনায় ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি মনে হয় এবং সৃষ্টি করে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল এখন তাপপ্রবাহের কবলে। বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ। আগামী কয়েক দিনও এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানালেন, আগামীকাল থেকে কিছু এলাকায় আবহাওয়ায় দেখা যেতে পারে সামান্য পরিবর্তন। তবে কোথাও কোথাও বৃষ্টির কারণে কিছুটা স্বস্তি মিললেও সার্বিকভাবে গরমের তীব্রতা পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা নেই আগামী তিন থেকে চার দিন।
‘বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায়। পাশাপাশি বরিশাল বিভাগ এবং ঢাকা বিভাগের কিছু অংশেও তাপপ্রবাহের প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের অনেক এলাকায় তুলনামূলক কম তাপমাত্রা বিরাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে,’— যোগ করলেন তিনি।
সাধারণত জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে বর্ষা পুরোপুরি সক্রিয় বা ‘সেট’ হয়ে যায় উল্লেখ করলেন এই আবহাওয়াবিদ। এবারও দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ বর্ষা প্রতিষ্ঠিত হলে তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসবে এবং বর্তমানে যে তীব্র গরম অনুভূত হচ্ছে, তা অনেকটাই কমে যাবে— এমনটাই আশ্বস্ত করলেন তিনি।
বজলুর রশিদের ভাষ্য, ‘বাংলাদেশে জুন মাসের তুলনায় জুলাই ও আগস্টে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। তবে চলতি বছরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে জুন মাসে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত এবং বেশি তাপমাত্রার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর প্রভাব এরই মধ্যে তাপপ্রবাহের মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে।’
বজলুর রশিদের মতে, বর্ষা সক্রিয় হওয়ার পর অন্তত জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ এলাকায় সহনীয় পর্যায়ে থাকতে পারে তাপমাত্রা। তবে মাসের শেষ দিকে আবারও সম্ভাবনা রয়েছে তাপমাত্রা বাড়ার। সে ক্ষেত্রে জুনের শেষ ভাগে আরেক দফা বয়ে যেতে পারে তাপপ্রবাহ। চলতি মাসে আরও এক থেকে দুটি তাপপ্রবাহের স্পেল দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যেই আগামী পাঁচ দিন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে পারে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশ বিস্তৃত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তর বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত এবং আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু অগ্রসর হতে পারে টেকনাফ উপকূল পর্যন্ত।
আগামীকাল শুক্রবার থেকে বাড়বে বৃষ্টিপাতের বিস্তার। রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক এলাকায় সম্ভাবনা রয়েছে বজ্রসহ বৃষ্টির। কোথাও কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণও। ফলে চলমান তাপপ্রবাহ কিছু এলাকায় প্রশমিত হওয়ার সঙ্গে রয়েছে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমার সম্ভাবনাও।
৬ জুন দেশের অধিকাংশ বিভাগে অব্যাহত থাকবে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির প্রবণতা। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও হতে পারে ভারী বর্ষণ। এদিনও সামান্য হ্রাস পেতে পারে তাপমাত্রা।
৭ ও ৮ জুন বৃষ্টিপাত আরও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রংপুর, ময়মনসিংহ, ঢাকা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বেশিরভাগ এলাকায় হতে পারে বজ্রসহ বৃষ্টি। কোথাও কোথাও রয়েছে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা। তবে এ সময়ে তাপমাত্রা মোটামুটি অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী পাঁচ দিন ক্রমেই বাড়বে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটতে পারে বজ্রপাত ও ভারী বর্ষণের ঘটনা। পাশাপাশি বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্যের কারণে গরমজনিত অস্বস্তিও কিছুটা বজায় থাকতে পারে।




