সচিবদের মন্ত্রিপরিষদের চিঠি
সরকারি কর্তারাই মানছেন না জাতীয় পতাকা বিধি
- ব্যবহারের অধিকারী নন— এমন অনেকে প্রদর্শন করছেন পতাকা
- বজায় রাখা হচ্ছে না জাতীয় পতাকার সঠিক আকার অনুপাত ও রঙ

সংগৃহীত ছবি
সরকারি অফিস বা সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানেই মানা হচ্ছে না জাতীয় পতাকা-সংক্রান্ত আদেশ ও বিধিমালা। জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অধিকারী বা যোগ্য নন– এমন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকে সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে নিজ চেয়ারের পেছনে বা টেবিলের ওপরে প্রদর্শন করছেন পতাকা। এসব ক্ষেত্রে বজায় রাখা হচ্ছে না জাতীয় পতাকার সঠিক আকার, অনুপাত ও রঙ। এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ অধীন দপ্তর ও সাংবিধানিক বা স্বশাসিত সংস্থাকে নির্দেশনা দিতে সচিবদের চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
আগামীর সময়কে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিব। তবে গণমাধ্যমে নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি তারা। এরই মধ্যে নিজ মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও জানালেন। তারা প্রায় অভিন্ন সুরে আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকে মার্চ ও ডিসেম্বর মাসে অফিসের ডেস্কে, মোটরবাইকে, সোফা বা টেবিলে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করে থাকেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন করে জুলাই-আগস্ট মাসেও এর প্রবণতা বাড়ছে। যেহেতু বিষয়টির সঙ্গে সাধারণ মানুষের আবেগ জড়িত, তাই অনেক সময় দেখেও না দেখার ভান করতে হয়। এখন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশা করি সবাই মেনে চলবেন।’
জানা গেছে, সরকারি ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের নির্দেশনা দিয়ে গত ১১ অক্টোবর সব সচিবকে চিঠি দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এতে বলা হয়, সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে— সরকারি ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কিছুসংখ্যক কর্মকর্তা বা ব্যক্তি জাতীয় পতাকা ব্যবহারের অধিকারী বা যোগ্য নন; কিন্তু অফিস কক্ষে চেয়ার বা সোফার পেছনে খুঁটিতে খাড়াভাবে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন করছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২ অনুযায়ী মোটরগাড়ি, জলযান ও বিমান ব্যতীত শুধু সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত জাতীয় পতাকা প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। কিন্তু কিছু অফিসে সার্বক্ষণিকভাবে জাতীয় পতাকা ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া সঠিক আকার, অনুপাত ও রঙ বজায় না রেখে জাতীয় পতাকাকে অফিস কক্ষের অভ্যন্তরে সজ্জা, অলংকরণ বা ব্যক্তিগত অথবা দাপ্তরিক পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশ জাতীয় সংগীত, পতাকা এবং প্রতীক আদেশ, ১৯৭২ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পতাকা বিধিমালা, ১৯৭২-এর প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। এই অবস্থায় জাতীয় পতাকার প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণসহ অধীন দপ্তর ও সাংবিধানিক বা স্বশাসিত সংস্থাকে নির্দেশনা প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হলো।
যে কারণে এই নির্দেশনা
এর আগে গত ২৫ আগস্ট সরকারি দপ্তর ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত চেয়ার ও সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন বা উত্তোলন কিংবা ব্যবহার আইনি বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা খতিয়ে দেখতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের প্রতি এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন। বিচার বিভাগীয় একজন কর্মকর্তা, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন প্রতিনিধির সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে ৬০ দিনের মধ্যে ওই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে বলে ওইদিন জানিয়েছেন রিট আবেদনকারীর আইনজীবী এইচ এম সানজীদ সিদ্দিকী।
সরকারি দপ্তর ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তাদের চেয়ার ও সোফার পেছনে জাতীয় পতাকা প্রদর্শন বা উত্তোলন কিংবা ব্যবহার ১৯৭২ সালের জাতীয় সংগীত, পতাকা ও প্রতীক আদেশ এবং পতাকা বিধিমালার পরিপন্থী দাবি করে ঢাকার আদালতের আইনজীবী মো. শরীফ সরকার গত ২০ আগস্ট রিটটি করেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী সানজীদ সিদ্দিকী। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খান জিয়াউর রহমান।
রিট আবেদনকারীপক্ষ জানায়, সরকারি দপ্তর ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কর্মকর্তা যারা পতাকা ব্যবহার বা প্রদর্শনের আইনগত অধিকার রাখেন না, তাদের চেয়ার ও সোফার পাশে কিংবা পেছনে পতাকা ব্যবহার কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে। ১৯৭২ সালের পতাকা বিধিমালায় জাতীয় পতাকার মর্যাদা, ভাবমূর্তি ও সম্মান রক্ষার কথা বলা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন আইনজীবী সানজীদ সিদ্দিকী। তিনি বলছিলেন, ‘১৯৭২ সালের বিধিমালায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ভবন, ১৫ শ্রেণির ব্যক্তির বাসস্থান এবং আট শ্রেণির ব্যক্তির গাড়িতে পতাকা ব্যবহার করা যাবে। এর বাইরে কেউ ব্যবহার করতে পারেন না। ১৫ পদমর্যাদার ব্যক্তির বাসস্থানের মধ্যে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার ও মন্ত্রী-উপমন্ত্রীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিধিমালায় অফিস কক্ষের ভেতরে পতাকা প্রদর্শন বা ব্যবহারের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।’



