বিশ্বব্যাংক
২০২৬ সাল নাগাদ বিশ্বে পণ্যর দাম বাড়বে ২৩ শতাংশ
- ৩২ শতাংশ দাম বাড়তে পারে জ্বালানির

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্ব জুড়ে চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। সর্বশেষ অক্টোবরে প্রকাশিত ‘কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক’ এ সতর্ক বার্তা দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
জ্বালানির দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কারণ তেলের মজুদ কমছে। পাশাপাশি শস্য রপ্তানিতে বিঘ্ন এবং এল নিনোর প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতি আরও ঘাটবে। যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে চলেছে।
উচ্চমূল্যের এ চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা প্যাকেজ প্রস্তুত করেছে বিশ্বব্যাংক। যা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও ঋণগ্রস্ত স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে সুরক্ষা দিতে কাজ করবে।
বিশ্বব্যাংকের পরিচালক ও উপ-প্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, ‘পণ্য বাজারগুলো একসঙ্গে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছে। উচ্চ জ্বালানি খরচ এবং বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে চলেছে, যা মূল্যস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত চরম দরিদ্র মানুষদের রক্ষা করা এবং যেসব স্বল্প আয়ের দেশ এরই মধ্যে ভারী ঋণের বোঝায় জর্জরিত, তাদের পাশে দাঁড়ানো।’
টানা তিন বছর কমার পর ২০২৬ সালে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা পরে ২০২৭ সালে কিছুটা কমবে। ২০২৫ সালে ব্যারেলপ্রতি ৬৯ ডলারের ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল ২০২৬ সালে গড়ে ৯১ ডলারে উন্নীত হতে পারে এবং পরে ২০২৭ সালে তা কমে ৭৯ ডলারে নামতে পারে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক।
এ ছাড়া সংঘাতের কারণে শস্য সরবরাহ ব্যাহত হওয়া, এল নিনোর প্রভাবে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং জ্বালানি ও সারের চড়া দামের কারণে কৃষিকাজের খরচ বেড়ে যাওয়ায় ২০২৬ এবং ২০২৭ সালে খাদ্যপণ্যের দাম যথাক্রমে ১০ শতাংশ ও ৭ শতাংশ অর্থাৎ মোট ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সার্বিকভাবে, চলতি বছর পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়লেও ২০২৭ সালে তা ৭ শতাংশ কমবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এ ঝুঁকিগুলো যদি একসঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তবে ২০২৭ সালে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং খাদ্যপণ্যের দাম মূল প্রাক্কলনের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে, যা এমনকি ২০২২ সালের মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
এদিকে ইউরিয়ার দামের প্রাথমিক উল্লম্ফন কিছুটা কমে যাওয়ার পর, ২০২৬ সালে সারের দাম ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে এবং পরে ২০২৭ সালে তা আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসবে।
বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে যে, বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর পর থেকে অর্থনৈতিক বা বাজার সংকটের সময়ে পণ্যের দামের অস্থিরতার মধ্যকার পারস্পরিক সংযোগ আরও বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। সাধারণত শিল্পখাতে ব্যবহৃত ধাতুগুলো অন্য পণ্য খাতে সবচেয়ে বেশি অস্থিরতা ছড়িয়ে দেয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর পর তেলের দামের প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এদিকে উচ্চমূল্যের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশগুলোকে সহযোগিতা করার জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ২৫ বিলিয়ন ডলারের প্রাক-বিন্যস্ত অর্থায়নসহ বিদ্যমান বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ৫০-৬০ বিলিয়ন ডলার জোগান দিবে। এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী শক্তিশালী করা, রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং ফার্ম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যমূলধন ও তারল্য সহায়তা নিশ্চিত করতে পারে।
একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অর্থায়ন ও জ্ঞানভিত্তিক সেবার পাশাপাশি বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও সহজ করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এর ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তরুণ প্রজন্মের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি এবং বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপ অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে সংঘাত বিশ্বের জ্বালানি উৎপাদন ও ব্যবহারের ধরনে পরিবর্তন আনতে বাধ্য করছে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর গত চার দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এবারই বৈশ্বিক তেল সরবরাহ সবচেয়ে বড় অর্থাৎ ৫ দশমিক ২ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ২০২০ ও ১৯৮০ সালের পর রেকর্ড অনুযায়ী তৃতীয় সর্বোচ্চ পতন হিসেবে তেলের ব্যবহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। সরবরাহ সংকটের কারণে উচ্চ মূল্য চাহিদা সীমিত করে দিচ্ছে এবং বিশেষ করে চীনে বিদ্যুতায়নের ফলে তেলের ব্যবহার কমে আসছে। তা সত্ত্বেও, উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় তেল মজুদ থেকে আরও বেশি পরিমাণে তেল তুলে ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা বাজারকে যেকোনো নতুন সংকটের মুখে আরও বেশি অরক্ষিত করে তুলছে।




