যে ঘোষণার পর আর ফেরার পথ ছিল না

ছবি: আগামীর সময়
এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রাজপথ উত্তপ্ত। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এরই মধ্যে রূপ নিয়েছে রক্তাক্ত সংঘাতে। একের পর এক মৃত্যু, গ্রেপ্তার, গুমের অভিযোগ আর দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে দ্রুত বদলে যাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা। এমন এক সময়ে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে ঘোষণা হয় ‘এক দফা’। সেই ঘোষণার মধ্য দিয়েই পাল্টে যায় আন্দোলনের চরিত্র। দাবি আর শুধু কোটা সংস্কারে সীমাবদ্ধ থাকে না; লক্ষ্য হয়ে ওঠে সরকার পরিবর্তন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য, ৩ আগস্টের ঘোষণাটি ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। কারণ, এর আগে আন্দোলন নির্দিষ্ট কিছু দাবিকে ঘিরে আবর্তিত হলেও ওই দিন নেয় রাজনৈতিক মোড়। কার্যত সেদিনই শেষ হয়ে যায় সংলাপ, সমঝোতা কিংবা আংশিক সমাধানের সম্ভাবনা।
দিনটির শুরু হয়েছিল ভিন্ন এক বার্তা দিয়ে। সকালে গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ‘গণভবনের দরজা তাদের জন্য খোলা।’ কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর শহীদ মিনারে জড়ো হওয়া লাখো মানুষের সামনে সেই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে নাহিদ মাইকে সমবেত ছাত্রজনতার উদ্দেশে বললেন, ‘মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা এক দফা দাবির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি। এক দফাটি হলো, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ এই সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপ।’
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে আমরা খুব দ্রুতই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জন্য সর্বস্তরের নাগরিক, ছাত্রসংগঠন ও সব পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে মিলে সম্মিলিত মোর্চা ঘোষণা করব। সবার সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সবার সামনে হাজির করব জাতীয় রূপরেখা’— রূপ রেখা দিয়েছিলেন তিনি।
নাহিদ বলেছিলেন, ‘শুধু শেখ হাসিনা নন, মন্ত্রিসভাসহ পুরো সরকার পদত্যাগ করতে হবে। এই ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিলোপ করতে হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গঠন করতে চাই, এমন একটি রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করতে চাই, যেখানে আর কখনো কোনো ধরনের স্বৈরতন্ত্র-ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।'
সেদিনের শহীদ মিনার শুধু একটি সমাবেশস্থল নয়, ছিল ক্ষোভ, শোক ও প্রত্যয়ের মিলনমঞ্চ। সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমবেত হন মানুষ। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিল্পী, শ্রমজীবী মানুষসহ নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিক। শহীদ মিনার থেকে দোয়েল চত্বর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা, জগন্নাথ হল মোড় চারদিকে মানুষের ঢল। স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা—‘দফা এক, দাবি এক’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’, ‘জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’।
এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে ছিল টানা কয়েক সপ্তাহের সংঘাতময় সময়। ১ জুলাই শুরু হওয়া আন্দোলন ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর নেয় নতুন মোড়। পরদিন রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার ঘটনা দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয় আন্দোলন। এরপর ধারাবাহিক সংঘর্ষ, প্রাণহানি, গ্রেপ্তার ও দমন-পীড়নের অভিযোগ আন্দোলনকারীদের মধ্যে এই বিশ্বাস জোরালো করে যে, শুধু দাবি আদায়ে আর সংকটের সমাধান হবে না। সামনে চলে আসে রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রশ্ন।
১৯ জুলাই ৯ দফা ঘোষণা করা হলেও পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে ওঠে। আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটক, কর্মসূচি প্রত্যাহারের চাপ এবং রাজপথে উত্তেজনা আন্দোলনের কৌশল পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি করে। ২ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি নতুন স্লোগান—‘৯ দফা বাদ দে, এক দফার ডাক দে।’ পরদিন সেটিই আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ঘোষণায় পরিণত হয়।
এক দফার পাশাপাশি সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচির বিভিন্ন নির্দেশনা তুলে ধরেন আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আন্দোলনের নেতৃত্বের ধারণা ছিল, জনসম্পৃক্ত অসহযোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর এমন চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব, যা রাজনৈতিক সমাধানের পথকে আরও সংকুচিত করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘এক দফার ঘোষণা ছিল আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিণতির প্রকাশ। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত হয় এবং নতুন গতি পায় আন্দোলন।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর আন্দোলনকারীদের কাছে এক দফার ঘোষণা ছিল সময়ের দাবি এবং রাজপথের জনমতের প্রতিফলন। ছাত্র-জনতা সেসময় এক দফার জন্য মুখিয়ে ছিল। কোনো সংলাপে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আমরা ডু অর ডাই পরিস্থিতিতে চলে যাই। এর আগেই সরকার পতনের আন্দোলনে ডুকে গেলেও ওইদিনই ছিল চূড়ান্ত ডাক।
‘ঐতিহাসিক ১ দফা কোনো ব্যক্তির পক্ষ থেকে নয়, কোনো সংগঠনের পক্ষ থেকে নয়, কোনো দলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়নি। সেদিন ১ দফা ঘোষণা করা হয়েছিল বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে। ফলে ১ দফার প্রকৃত ঘোষক হলেন বাংলাদেশের জনগণ, বাংলাদেশের অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা এবং শহীদ ভাইবোনেরা’— ঐতিহাসিক ঘোষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ।







