আন্দোলনের মাঠ ছাড়ছেন না শ্রমিকরা, কারণ কী

নারায়ণগঞ্জে বিক্ষোভ - মাহফুজ সিহান
তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে চলমান আন্দোলনের মধ্যেই সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকদের একটি প্রধান দাবি পূরণ হলেও আন্দোলনের মাঠ ছাড়ছেন না অনেক শ্রমিক। বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই কোনো না কোনো সহিংসতা হচ্ছে। এই আন্দোলনকে ঘিরে ষড়যন্ত্র ও তৃতীয়পক্ষের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা এবং সরকারের কাছে। সে অনুযায়ী আটক এবং গ্রেপ্তারও চলছে। এরপরও ক্ষান্ত হচ্ছেন না শ্রমিকরা। এর কারণ কী? শ্রমিকনেতাদের কেউ বলছেন, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, ছাঁটাই, নির্যাতন এবং সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তার ওপর দমনপীড়ন, মামলা ও গ্রেপ্তারে শ্রমিকরা আরও ক্ষুব্ধ এবং অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। আবার কারও অভিযোগ, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন পোশাকশিল্পের মালিকরা। তাদের মতে, মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত।
বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ও ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক গণমাধ্যমে বলেছেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সমাধান হওয়া উচিত। এজন্য মজুরি বোর্ডের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।
শ্রমিকদের দুঃখ-কষ্টের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বললেন, সব সমস্যার সমাধান নিয়মতান্ত্রিক পথেই হওয়া উচিত। সরকার গঠিত মজুরি বোর্ডে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দুজন করে প্রতিনিধি এবং সরকারের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। তাই বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর সংশ্লিষ্ট সবার আস্থা রাখা প্রয়োজন।
রপ্তানিমুখী নিটওয়্যার শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর বর্তমান কমিটির নির্বাহী সভাপতি এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বললেন, মজুরি নির্ধারণের জন্য বোর্ড গঠনের পরও আন্দোলনের পেছনের কারণগুলো স্পষ্টভাবে জানা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেছেন, পোশাকশ্রমিকদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে যে অসন্তোষ ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে, তা শ্রমিকদের আন্দোলন নয়। এই আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের সম্পৃক্ততা নেই।
শ্রমিকদের আন্দোলনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বললেন, শ্রমিকদের সঙ্গে তারা নিয়মিত কথা বলছেন। তবে কারখানা থেকে বের হতে না চাওয়া শ্রমিকদেরও অন্য শ্রমিকরা জোর করে বাইরে নিয়ে আসছেন। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মধ্যে কী ঘটছে, তা বোঝা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক কাজী রুহুল আমিন বললেন, মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্ব এবং শ্রমিকদের ওপর নানা ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন, দমনপীড়ন, ছাঁটাই ও বরখাস্তের ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে আগে থেকেই ক্ষোভ জমে ছিল। এই দুটি ক্ষোভ একসঙ্গে পুঞ্জীভূত হয়ে বর্তমান বিক্ষোভে রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে মালিকপক্ষের কিছু দায়িত্বহীন-উসকানিমূলক বক্তব্য ও আচরণ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
কাজী রুহুল আমিন বললেন, বর্তমানে শ্রমিকদের আন্দোলনের মূলত দুটি বিষয় রয়েছে। প্রথমত, শ্রমিকদের ৩০০ টাকা মজুরি বৃদ্ধির দাবি। দ্বিতীয়ত, এর চেয়েও বড় বিষয় হলো শ্রমিকদের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া আস্থার সংকট। ডিসেম্বর থেকে আইন অনুযায়ী মজুরি বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে ডিসেম্বরের বেতন পাওয়ার সময়ই শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি পাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু সরকার এখনো এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়নি।
কাজী রুহুল আমিন বললেন, ‘শ্রমিকদের আন্দোলনে সবসময়ই বিভিন্ন সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও দেশের স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি এখানে যুক্ত হয়েছে বলে আমরা মনে করছি। ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টিও বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত কি না, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’
সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাজেকুজ্জামান রতন বললেন, শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পেছনে নানা ধরনের উপাদান যুক্ত হয়েছে। ফলে চাইলেই আন্দোলনটি হঠাৎ করে থেমে যাবে না। তবে মজুরি বোর্ড গঠনের খবর যখন শ্রমিকদের মধ্যে পৌঁছাবে, তখন শ্রমিকরা বিষয়টি বিবেচনা করবেন। যেহেতু মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে, তাই শ্রমিকপক্ষের প্রস্তাবগুলো নিয়ে বোর্ডে আলোচনা হবে এবং আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি সমাধানের জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বললেন, ‘বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং তারা নানা ধরনের হয়রানি ও চাপের মধ্যে রয়েছেন। পাশাপাশি অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের কাছে একটি বিষয় রহস্যজনক মনে হয়, যখন ৭৮৯ বা ৮০০টি কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং প্রায় ১১ লাখ শ্রমিক রাস্তায় নেমে আসেন, তখন সেই শ্রমিকদের যেকোনোভাবে উত্তেজিত বা প্রভাবিত করা সম্ভব।’ তিনি বললেন, ‘আমরা ষড়যন্ত্র না খুঁজে এর কার্যকারণগুলো দেখতে চাই। আন্দোলনের শুরুতেই শ্রমিকদের আশ্বস্ত করার মতো একটি বক্তব্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া উচিত ছিল।’
তিনি আরও বললেন, ‘দ্বিতীয়ত, যখন একের পর এক কারখানা বন্ধ হতে থাকে, তখন শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কিত শ্রমিক এবং তাদের বিক্ষুব্ধ মানসিকতার মধ্যে নানা ধরনের উপাদান যুক্ত হয়। এসব উপাদান থেকেই কেউ কেউ ষড়যন্ত্রের বিষয় খুঁজে পেতে পারেন। কিন্তু বাইরে থেকে ষড়যন্ত্র খোঁজার আগে শ্রমিকদের আশ্বস্ত করা জরুরি। ১১ থেকে ১২ লাখ শ্রমিককে শুধু বলপ্রয়োগ করে দমন বা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।



