চীন থেকে উড়ে এলো ৯৮ ইঞ্চির টেলিভিশন
- প্রধানমন্ত্রী যাবেন তাই এনইসি সম্মেলন কক্ষে টিভি বদল
- সাত লাখ টাকার এই টেলিভিশন কিনতে ৩ কমিটি

৯৮ ইঞ্চির একটি টেলিভিশন। যার দাম সাত লাখ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের জন্য সেটিকে উড়িয়ে আনা হয়েছে সুদূর চীন দেশ থেকে। উদ্দেশ্য, এনইসি সম্মেলন কক্ষে বসানো। যেন প্রধানমন্ত্রী একনেকের বৈঠকে এলে টেলিভিশনটি তার চোখে পড়ে।
ঢাকার শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একটি টেলিভিশন আগেই ছিল। যেটি পরিকল্পনা বিভাগের নাজিয়া-সালমা সম্মেলন কক্ষ থেকে এনে লাগানো হয়েছিল। সেটি দিয়েই কাজ চলছিল। কোনো কারণে টেলিভিশনটির এক কোনা ভেঙে যায়। আর ব্যস, তাতেই অজুহাত মিলে গেল টেলিভিশন কেনার।
বৃহস্পতিবার এনইসি সম্মেলন কক্ষে গিয়ে দেখা গেল, কক্ষের প্রবেশ পথের বাম দিকের দেয়ালে নতুন টেলিভিশনটি লাগানো হয়েছে। একনেক বৈঠকে সভাপতিত্ব করার সময় যেটি প্রধানমন্ত্রীর চোখেও পড়ার কথা নয়। কিন্তু গত ৬ এপ্রিল তিনি পরিকল্পনা কমিশনে একনেক সভায় যোগ দেবেন, তাই তড়িঘড়ি করে টেলিভিশনটি বদলানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেন কোনাভাঙা টেলিভিশন প্রধানমন্ত্রীর চোখে পড়াও নিষেধ। অথচ সেদিনের বৈঠকটি একনেকে হয়ই-নি, হয়েছে সচিবালয়ে।
অথচ সেই পুরনো টেলিভিশনটি দিব্যি চলছে, সেটিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে নাজিয়া-সালমা সম্মেলন কক্ষে।
চলমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সরকার যেখানে সবদিকে ব্যয় সাশ্রয়ের পথে হাঁটছে, সেখানে উল্টো চিত্র পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। এখন প্রশ্ন হলো, অপ্রয়োজনে কেন এই কেনাকাটা?
অবশ্য অপ্রয়োজন বলে মনে করেনি পরিকল্পনা কমিশনের নিড অ্যাসেসমেন্ট কমিটি। তাদের সুপারিশেই তো কোনাভাঙা টিভি বদলে এসেছে ঝাঁ চকচকে নতুনটি।
জানা গেল, টেলিভিশন কিনতে করা হয়েছিল নিড অ্যাসেসমেন্ট কমিটি ও ক্রয় কমিটি। এমনকি বোকাবাক্সটি বুঝে নিতেও নাকি করা হয়েছিল একটি কমিটি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) গোলাম মোছাদ্দেক আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা সব ধরনের নিয়ম মেনে ইজিপিতে টেন্ডারের মাধ্যমে সরকারি সংস্থা টেলিফোন শিল্প সংস্থা (টেশিস) থেকে এটা কিনেছি। প্রায় সাত লাখ টাকা দাম পড়েছে। দুই দফায় দাম কমিয়ে বাজার যাচাই করে তার পরই কেনা হয়েছে।’
সংকটের এই সময়ে এমন বিলাসী কেনাকাটার কেন প্রয়োজন পড়ল, সে প্রশ্ন রাখি তার কাছে।
জবাবে তিনিই জানালেন, টেলিভিশন কেনার জন্য কমিটি করা হয়েছিল। কমিটির সদস্যরাই নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে কেনা প্রয়োজন।
এই অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সদস্যদের নাম জানতে চাইলে তিনি বললেন, পরিকল্পনা বিভাগের সিনিয়র সিস্টেম অ্যানালিস্ট ও এসডিপি প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মো. তমিজ উদ্দিন আহমেদ এবং মেইনটেন্যান্স শাখার রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী মো. মইনুল হাসান।
তবে নিড অ্যাসেসমেন্ট কমিটির সদস্য হিসেবে যাদের নাম বলা হলো তারা অবশ্য জানালেন ভিন্ন কথা। বললেন, এ বিষয়ে নাকি তারা কিছুই জানেন না।
তমিজ উদ্দিন আহমেদ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি কোনো কমিটির সদস্য নই। এমনকি টিভি কেনার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। মইনুল হাসান জানতে পারেন।’
অবশ্য কিছু নাকি জানেন না মইনুল হাসানও। তার দাবি, কত টাকায় টিভি কেনা হয়েছে, তা জানাতে পারবেন গোলাম মোছাদ্দেক।
নানা হাত ঘুরে জানা গেল কেনাকাটার দায়িত্ব পালন করেছেন প্রশাসন বিভাগের সাধারণ শাখার উপসচিব মোহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস। তার কাছে সাত লাখা কম, কারণ এর আগে নাকি আরও বেশি দামে টিভি কেনা হতো।
রুহুল কুদ্দুস বললেন, ‘আগে যারা এমন টিভি কিনেছিলেন সেগুলো ১৪ লাখ টাকা দাম ছিল। আমরা তো প্রায় সাত লাখ টাকায় কিনেছি। এজন্য কোনো কমিশন নেওয়া হয়নি, দুর্নীতি হয়নি এক টাকারও।’
সরকার যখন নানাভাবে ব্যয় কমানোর কথা বলছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও অতিথিদের আপ্যায়নে কাটছাঁট করা হচ্ছে মাছ-মাংস। সেখানে তার চোখে পড়বে কি পড়বে না— এমন স্থানে লাগানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশন কিনছে সাত লাখ টাকার টেলিভিশন।
এ বিষয়ে কথা হয় পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক সচিব মামুন-আল-রশীদের সঙ্গে। বৈশ্বিক এ পরিস্থিতিতে এমন বিলাসী ব্যয় মোটেও উচিত হয়নি বলে মত তার।
তিনি বললেন, ‘কর্মকর্তাদের টিভি কেনার আগ্রহের পেছনে কমিশন বাণিজ্য বা অন্য কোনো লাভ থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ বিষয়ে দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। যাতে সামনের দিনে এ ধরনের বাহুল্য ব্যয় বন্ধ করা যায়।’
সংকটের সময় এমন বিলাসী ব্যয়ের বিষয়টিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই, যোগ করলেন তিনি।

