জাতিসংঘের প্রতিবেদন
যেভাবে বাংলাদেশিদের ইউক্রেন যুদ্ধে বাধ্য করছে রাশিয়া

চলতি বছরের ৫ মার্চ পর্যন্ত ইউক্রেন যুদ্ধে গিয়ে ছয়জন নিহত ও নিখোঁজ অন্তত ৩১ জন—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।ছবি সংগৃহীত
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দিতে বাংলাদেশিসহ ২৯টি দেশের নাগরিকদের প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। বেসামরিক চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় নেওয়া, সেখানে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা এবং পরে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর একটি সমন্বিত পদ্ধতির তথ্য উঠে এসেছে কমিশনের প্রতিবেদনে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য তৈরি প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের শিকার ব্যক্তিদের উৎস দেশগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে কমিশন বলেছে, সংগৃহীত প্রমাণ অনুযায়ী রুশ কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন দেশের নিয়োগকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে মানবপাচারের মাধ্যমে লোকজনকে সামরিক বাহিনীতে নিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন ৪৮টি দেশের নাগরিকদের নিয়োগসংক্রান্ত তথ্য পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ২৯টি দেশের নাগরিকদের ক্ষেত্রে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে রুশ সশস্ত্র বাহিনীতে নিয়োগের প্রমাণ পেয়েছে। তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়া রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, ঘানা, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তানসহ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণা বা জবরদস্তির শিকার ব্যক্তিরা সবাই পুরুষ। তাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য এবং সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষ। তাঁদের আর্থিক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হতো।
চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে যুদ্ধক্ষেত্র
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি নাগরিকদের অনেককে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, পরিচিত ব্যক্তি কিংবা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ায় নেওয়া হয়। তাঁদের সামনে নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালক, মেকানিক, ইলেকট্রিশিয়ান, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, মেরামতকর্মী ও প্রযুক্তিবিদ হিসেবে কাজের প্রস্তাব দেওয়া হতো। কোথাও কোথাও আকর্ষণীয় বেতন, আবাসন, রুশ নাগরিকত্ব এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল।
কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিয়োগকারী এজেন্টরা নিজেদের বৈধ বা সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দিত। চাকরির প্রস্তাব বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখানো হতো। এরপর ভিসা, বিমানের টিকিট এবং ভ্রমণসংক্রান্ত অন্যান্য ব্যবস্থা করে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এজেন্টরা নিয়োগপ্রত্যাশীদের সঙ্গে রাশিয়ায়ও যেত। নিয়োগপ্রার্থীদের অনেকে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্য; তাদের অনেকের শিক্ষা কম, কর্মসংস্থানের অভাব কিংবা আর্থিক সংকট রয়েছে। ফলে বিদেশে ভালো চাকরির আশ্বাস তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হওয়াটা ছিল স্বাভাবিক।
কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যেত। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেককে সেখানে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হতো। চুক্তিগুলো রুশ ভাষায় লেখা থাকায় ভাষাটি না-জানা নিয়োগপ্রার্থীদের পক্ষে শর্ত বোঝা সম্ভব হতো না। অনেকের মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট ও অন্যান্য পরিচয়পত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশিদের ভিসার তথ্যও প্রতিবেদনে
বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি রয়েছে প্রতিবেদনের ৪৯ নম্বর অনুচ্ছেদে। সেখানে কমিশন জানিয়েছে, বাংলাদেশি নিয়োগপ্রার্থীদের জন্য রাশিয়ার বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণের উল্লেখসহ ব্যবসায়িক ভিসার কপি তারা পেয়েছে। অর্থাৎ, অন্তত কিছু নিয়োগপ্রার্থীর ভ্রমণসংক্রান্ত নথিতে তাদের রাশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্য হিসেবে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে কাজের বিষয়টি দেখানো হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এক ভুক্তভোগীর স্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি জানান, তার স্বামীর পাসপোর্ট নিয়ে তাকে চুক্তির বিভিন্ন জায়গায় স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছিল। চুক্তিটি ছিল শুধু রুশ ভাষায়।
ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার স্বামী প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছিলেন এবং তাঁর সামনে কার্যত কোনো বিকল্প ছিল না।
তবে প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের মোট সংখ্যা, তাদের সবার পরিচয়, কোন কোন নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান জড়িত ছিল কিংবা কতজন নিহত, নিখোঁজ বা দেশে ফিরেছেন—এসব তথ্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। তাই বাংলাদেশের কতজন নাগরিক এই নিয়োগপ্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন, তা শুধু এই প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
চুক্তিতে সইয়ের পর সম্মুখসারিতে
কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, রাশিয়ায় নেওয়া অনেক বিদেশি নাগরিকের সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। সামরিক বাহিনীতে কাজ করার বিষয়টি তাঁরা আগে জানতেন না বলেও সাক্ষ্য দিয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ রুশ ভাষায় লেখা চুক্তি বুঝতে পারেননি; আবার কেউ সই করতে অস্বীকার করায় ভয়ভীতি বা সহিংসতার হুমকির মুখে পড়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুক্তিতে সইয়ের পর এসব নিয়োগপ্রার্থীকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ইউক্রেনের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। তাদের দিয়ে পরিখা খনন, সামরিক অবস্থান সুরক্ষিত রাখা, খাবার ও পানি সরবরাহ এবং সম্মুখসারিতে আক্রমণ পরিচালনার মতো বিপজ্জনক কাজ করানো হয়েছে। কমিশনের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে নিয়োগপ্রার্থীরা তাদের সহকর্মীদের নিহত হওয়া, আহত হওয়া, নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কিংবা বন্দি হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
কমিশন বলেছে, এভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের বড় অংশ নিহত হয়েছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন বলে সাক্ষ্য পাওয়া গেছে। তবে এই পর্যবেক্ষণকে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মৃত্যুসংখ্যা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
পরিবারের দুশ্চিন্তা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
প্রতিবেদনটিতে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগও তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পর অনেক নিয়োগপ্রার্থীর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাঁদের স্বজনেরা নিয়োগকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়োগকারীরা ফোন নম্বর বন্ধ করে দেন বা পরিবারের সদস্যদের হুমকি দেন।
অনেক পরিবার তাঁদের স্বজন জীবিত আছেন কি না, কোথায় আছেন কিংবা বন্দি হয়েছেন কি না—তা জানতে পারেনি। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা অন্য সেনাসদস্যদের কাছ থেকে মৃত্যুর খবর পেয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং প্রতিশ্রুত অর্থ বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিবারগুলো সমস্যায় পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেই সতর্ক করেছিল ব্র্যাক
রাশিয়ায় চাকরির প্রলোভনে বাংলাদেশিদের যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের একটি গবেষণাতেও এ ধরনের প্রতারণার চিত্র উঠে এসেছিল। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি ওই গবেষণায় বলা হয়, ভালো বেতনের চাকরির আশায় বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় যাওয়ার পর বাংলাদেশিদের সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ ধরনের প্রতারণা বন্ধ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল ব্র্যাক।
এদিকে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে গত তিন বছরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের জন্য নির্ধারিত কোনো পরিসংখ্যান নয়।
মানবপাচার হিসেবে দেখছে জাতিসংঘের কমিশন
প্রতিবেদনের উপসংহারে কমিশন বলেছে, মিথ্যা চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগপ্রার্থীদের দুর্বল আর্থসামাজিক অবস্থার সুযোগ নেওয়া, ভ্রমণের ব্যবস্থা করা, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর জবরদস্তির মাধ্যমে সামরিক চুক্তিতে সই করানো এবং পরে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর ঘটনাগুলো মানবপাচারের মৌলিক উপাদানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কমিশনের মূল্যায়নে, এ প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবন, স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য ও মানবিক আচরণ পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে।
কমিশন রাশিয়াকে প্রতারণা বা জবরদস্তির মাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ বন্ধ করার, মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিদের অবিলম্বে সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার এবং দায়ীদের তদন্ত ও বিচারের সুপারিশ করেছে। যেসব দেশের নাগরিকরা এ প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন, তাদের সরকারকে নিজ নিজ নাগরিকদের ফিরিয়ে আনা, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা, নিয়োগকারী চক্রের বিরুদ্ধে তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম নেওয়ারও সুপারিশ করা হয়েছে।



