কঠিন পরীক্ষার সামনে শাহজালাল বিমানবন্দর
- আইকাওর অডিট
- নিরাপত্তায় সমন্বয় সংকট, কার্গো ঝুঁকি ও জনবল ঘাটতি
- তৃতীয় টার্মিনালেও স্বস্তি নেই, বদলাতে হবে পুরো চিত্র

সংগৃহীত ছবি
আর দুদিন পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর— তা জানতে অডিট চালাবে আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও)। ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে এই পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা অডিট।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজারো যাত্রীর যাতায়াত, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ওঠানামা আর বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন হয়।
আট বছর পর অনুষ্ঠেয় আইকাওর অডিট ঘিরে প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে বলে দাবি করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। নিজেদের ব্যবস্থাপনা যাচাই, নতুন প্রযুক্তি স্থাপন, প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তুতির এ চিত্রের আড়ালে এখনো রয়ে গেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রশিক্ষিত স্থায়ী জনবলের সংকট, কার্গো নিরাপত্তা, কাস্টমসের ধীরগতির কার্যক্রম এবং যাত্রীসেবার মান নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। ফলে এবারের অডিটে শুধু আধুনিক অবকাঠামো নয়, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার বাস্তব সক্ষমতাই বড় পরীক্ষার মুখে পড়তে যাচ্ছে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলমের মতে, অডিটের আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কাজের পরিধি সুনির্দিষ্ট করা এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। তার ভাষায়, বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা তদন্ত কমিটি গঠনেই শেষ হলে চলবে না; তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক ও পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা একই প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৮ সালের আইকাওর অডিটেও বিষয়টি পর্যবেক্ষণে এসেছিল।
আট বছর পর নতুন মূল্যায়ন
বাংলাদেশে সর্বশেষ আইকাওর পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা অডিট হয়েছিল ২০১৮ সালে। ওই মূল্যায়নে বাংলাদেশ প্রায় ৬৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ কার্যকারিতা অর্জন করেছিল। এবার সেই অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এজন্য বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে কর্মশালা, নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নয়ন, ই-গেট চালু এবং নতুন টার্মিনালকেন্দ্রিক প্রস্তুতির পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন চলছে।
সিভিল অ্যাভিয়েশনের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমোডর মো. আসিফ ইকবাল বলেছেন, গত বছরের নভেম্বর থেকেই অডিটের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। এখন নিজেদের ব্যবস্থাপনা নিজেরাই নিরীক্ষা করছেন তারা। গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান আইকাওর ডিএফপি অডিট করেছে, যেখানে শাহজালাল বিমানবন্দর ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এবারের আইকাওর অডিটে ২০১৮ সালের তুলনায় অনেক ভালো ফল অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন এই কর্মকর্তা।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তুতির কাগুজে অগ্রগতি আর বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আইকাও শুধু নতুন টার্মিনাল, স্ক্যানার কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের হিসাব করে না। নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, দায়িত্ব বণ্টন কতটা স্পষ্ট, কর্মীরা কতটা প্রশিক্ষিত এবং নিয়মকানুন বাস্তবে কতটা অনুসরণ করা হচ্ছে— এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়।
নিরাপত্তার দায়িত্ব অনেকের, সমন্বয়ের প্রশ্ন
শাহজালাল বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বেবিচক, এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), বিমান বাহিনী, কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। কিন্তু এতগুলো সংস্থার উপস্থিতি সত্ত্বেও দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট সীমারেখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো সংকটের মুহূর্তে কোন সংস্থা সিদ্ধান্ত নেবে, কার দায়িত্ব কোথায় শেষ হবে এবং অন্য সংস্থার সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় হবে— এসব বিষয়ে অস্পষ্টতা থাকলে নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হতে পারে। আইকাওর মূল্যায়নে তাই শুধু নিরাপত্তাকর্মীর সংখ্যা নয়, পুরো ব্যবস্থাপনার সমন্বিত সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্থায়ী জনবলের সংকট, প্রশিক্ষণেও ঘাটতি
বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার একটি বড় অংশ ডেপুটেশনে আসা সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল। এতে জনবল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে প্রশিক্ষিত স্থায়ী বেসামরিক জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা যাচাই এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তার প্রশ্নে যাত্রীদের সঙ্গে কর্মীদের আচরণও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। যাত্রী হয়রানি, অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিলম্ব কিংবা সংকটের সময় দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা বিমানবন্দরের সামগ্রিক সেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই নিরাপত্তার পাশাপাশি যাত্রীসেবার মান, কর্মীদের আচরণ এবং জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও গুরুত্ব পাবে।
কার্গো ভিলেজের আগুন এখনো সতর্কবার্তা
২০২৫ সালের অক্টোবরে শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে। ওই ঘটনায় কয়েক ঘণ্টা কার্গো কার্যক্রম বন্ধ থাকে এবং বিমান চলাচলেও প্রভাব পড়ে। তদন্তে বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ঘটনাটি অগ্নিনিরাপত্তা, কার্গো ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনার পর তদন্তের পাশাপাশি সুপারিশ বাস্তবায়ন, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা শুধু যাত্রী ও উড়োজাহাজের সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; পণ্য পরিবহন, গুদাম ব্যবস্থাপনা এবং অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কাস্টমসে প্রযুক্তির ঘাটতি, ভোগান্তিতে যাত্রী
বিমানবন্দরের কাস্টমস কার্যক্রমের একটি অংশ এখনো পুরোপুরি ডিজিটাল না হওয়ায় কোথাও কোথাও ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে পণ্য খালাসে সময় বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের ভোগান্তি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও এয়ারলাইনসের তথ্যব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন নজরদারি জোরদার করা সম্ভব, অন্যদিকে যাত্রী ও পণ্য ব্যবস্থাপনাও দ্রুত করা যাবে।
তৃতীয় টার্মিনাল আধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত হলেও পুরনো টার্মিনালগুলোতে একই মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা আরেকটি চ্যালেঞ্জ। পুরো বিমানবন্দরের নিরাপত্তা মূল্যায়নে একটি অংশের আধুনিকায়ন যথেষ্ট নয়। পুরনো স্থাপনাগুলোয়ও উন্নত স্ক্যানার, স্বয়ংক্রিয় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটের পথেও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা
আইকাওর এবারের অডিট বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ফল আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণ, কার্গো পরিবহন, বৈদেশিক বাণিজ্য ও পর্যটন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিপরীতে, নিরাপত্তাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি ধরা পড়লে তা সংশোধনে বাড়তি উদ্যোগ নিতে হতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে সরাসরি ফ্লাইট চালুর ক্ষেত্রে এবারের অডিটই শেষ কথা নয়। কাজী ওয়াহিদ উল আলমের মতে, আইকাওর মূল্যায়ন এক্ষেত্রে সহায়ক হলেও ২০২৭ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফএএ) পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ গুরুত্বপূর্ণ হবে। শুধু বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার মাধ্যমে নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালু নিশ্চিত করা সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।
সম্প্রতি বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে চলতি বছরের অক্টোবরে নিরাপত্তা নিরীক্ষা এবং ২০২৭ সালের অক্টোবরে আরও বিস্তৃত বিমান চলাচল নিরাপত্তা নিরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। পরবর্তী নিরীক্ষায় সফল হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক ফ্লাইট চালুর লক্ষ্যে এফএএর ক্যাটাগরি-১ মর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, বিমান চলাচল খাতের উন্নয়নে ৪২ বছর পর আইন ও বিধিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যাত্রী হয়রানি কমানো, লাগেজ দ্রুত সরবরাহ এবং কার্গো ব্যবস্থাপনা উন্নত করার বিষয়েও কাজ চলছে। তার দাবি, বডিক্যাম ব্যবহার ও দ্রুত কার্গো ব্যবস্থাপনার ফলে লাগেজ পাওয়ার সময় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা থেকে কমে ৪০ মিনিটের মধ্যে এসেছে।



